মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণেও
বেকসুর খালাস অসীমানন্দ

  ১৭ই এপ্রিল , ২০১৮

হায়দরাবাদ: ১৬ই এপ্রিল— আজমেঢ় দরগায় সন্ত্রাসবাদী হামলার মতোই মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণ-কাণ্ডেও বেকসুর মুক্তি দেওয়া হলো কট্টর হিন্দুত্ববাদী স্বামী অসীমানন্দকে। তার সঙ্গেই ওই বিস্ফোরণের ঘটনায় ধৃত আরও চার জনকেও সোমবার যাবতীয় অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ রেহাই দিল হায়দরবাদের বিশেষ এন আই এ আদালত। তারা হলো দেবেন্দ্র গুপ্ত, লোকেশ শর্মা, ভরত মোহনলাল রতেশ্বর ওরফে ভরত ভাই এবং রাজেন্দ্র চৌধুরি। রায়ের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বিশেষ এন আই এ আদালতের বিচারপতি কে রবীন্দর রেড্ডি বলেছেন, তদন্তকারী সংস্থা এন আই এ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনও একটি অভিযোগও প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনই জানিয়েছেন অসীমানন্দের কৌঁসুলি জে পি শর্মা। সাংবাদিকদের এদিন এই রায় জানতে হয়েছে শর্মা এবং সংশ্লিষ্ট মামলায় যুক্ত অন্য আইনজীবীদের কাছ থেকেই। কারণ, এ‍ই গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় ঘোষণার সময়ে সংবাদ মাধ্যমকে এজলাসে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এদিন এই রায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশেষ এন আই এ আদালতের বিচারপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন কে রবীন্দর রেড্ডি। সূত্রের খবর, ব্যক্তিগত কারণেই এই ইস্তফা বলে তিনি পদত্যাগ পত্রে জানিয়েছেন। তবে যেভাবে তিনি মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণ-কাণ্ডে রায় দেওয়ার পরেই দায়িত্ব ছেড়েছেন, তাতে প্রশ্ন উঠেছে, এই রায়ের ক্ষেত্রে তিনি কোনও চাপের মুখে পড়েছিলেন কি না। উঠে এসেছে বিচারপতি লোয়ার রহস্যজনক মৃত্যুর কথাও, ভুয়ো সংঘর্ষে সোহরাবুদ্দিনকে খুন করার মামলায় বি জে পি সভাপতি অমিত শাহ অন্যতম অভিযুক্ত হওয়ায় নির্দিষ্ট রায় দেওয়ার জন্য যাঁর উপর প্রবল চাপ তৈরি করা হয়েছিল।

হায়দরাবাদের চারশো বছরেরও বেশি প্রাচীন মক্কা মসজিদে এই বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল এগারো বছর আগে, ২০০৭ সালের ১৮ই মে। দিনটি ছিল শুক্রবার। জুম্মাবারের নমাজ পড়তে সেদিন ওই মসজিদে বিরাট সংখ্যক মানুষ সমবেত হয়েছিলেন। দূর নিয়ন্ত্রকের সাহায্যে নমাজের পর্বে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। তাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৯ জন, আহত হয়েছিলেন ৫৮ জন। পরে তদন্তে জানা যায়, বিস্ফোরণ ঘটাতে ব্যবহার করা হয়েছিল পাইপ বোমা। সেদিনই পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে ওই মসজিদের আরও দুটি জায়গা থেকে শক্তিশালী বিস্ফোরক পায় এবং সেগুলি নিষ্ক্রিয় করে দেয়। তা না হলে সেদিন আরও বহু প্রাণহানি ঘটতে পারত। এই বিস্ফোরণের জেরে হায়দরাবাদে ছড়িয়ে পড়েছিল দাঙ্গা। তাতে আরও পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছিল। প্রথমে এই বিস্ফোরণ-কাণ্ডের তদন্ত করছিল স্থানীয় পুলিশ। এরপর তদন্তের দায়িত্ব নেয় সি বি আই। ২০১১ সালে তদন্ত হাতে নেয় এন আই এ (ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি)। তদন্তের দা‍‌য়িত্বে থাকার সময়ে সি বি আই সংশ্লিষ্ট মামলায় আদালতে একটি চার্জশিট পেশ করেছিল। এন আই এ দায়িত্বে আসার পরে আদালতে দাখিল করে অতিরিক্ত চার্জশিট। সি বি আই এবং এন আই এ-র তদন্তে এ‍‌ই বিস্ফোরণে যুক্ত থাকার দায়ে ১০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় অসীমানন্দ ওরফে নবকুমার সরকার এবং ৪ জনকে, যারা সবাই সোমবার আদালতের রায়ে ছাড়া পেয়ে গেল। বাকি ৫ জনের মধ্যে দুজন সন্দীপ ভি ডাঙ্গে এবং রামচন্দ্র কালসাঙরে এখনও নিখোঁজ। এক অভিযুক্ত সুনীল যোশী ইতিমধ্যে খুন হয়ে গিয়েছে। আরও দুজনের বিরুদ্ধে এখনও তদন্ত চলছে।

মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণ-কাণ্ডে সোমবারের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে অনভিপ্রেত ঘটনা রুখতে হায়দরাবাদে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শহরের স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলিতে দেড় হাজারের বেশি পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। গোটা শহরে জারি করা হয়েছে সতর্কতা। সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে হায়দরাবাদের বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি চালাচ্ছে পুলিশ। উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিকরা মক্কা মসজিদের এলাকা এবং অন্যান্য অঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখেন। তবে রাত পর্যন্ত হায়দরাবাদ বা তেলেঙ্গানা বা অন্ধ্র প্রদেশের কোনও জায়গা থেকেই কোনও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। অবশ্য সাধারণ মানুষ শান্ত থাকলেও বি জে পি এই রায়কে সামনে রেখে উসকানি ছড়ানোর কাজে নেমে পড়েছে। এ‍‌দিনের রায়ে স্বভাবতই উল্লসিত বি জে পি এবং হিন্দুত্ববাদী শিবির। বি জে পি-র মুখপাত্র সম্বিত পাত্র এদিন নয়াদিল্লিতে বলেছেন, এদিনের রায়ে প্রমাণিত হলো, ভোটের জন্য হিন্দুদের অপমান করার রাজনীতি চালিয়েছিল কংগ্রেস। ‘গৈরিক সন্ত্রাস’ বা ‘হিন্দু সন্ত্রাস’ বলে কিছু নেই বলেও তিনি এদিন দাবি করেছেন। পালটা প্রতিক্রিয়ায় কংগ্রেস নেতা গুলাম নবি আজাদ এদিন বলেছেন, চার বছর আগে কেন্দ্রে বি জে পি-র সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকেই এ‍ই ধরনের একের পর এক মামলায় অভিযুক্তরা ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। তাতে তদন্তকারী সংস্থাগুলির উপরে সাধারণ মানুষের আস্থাই শুধু কমে যাচ্ছে। হায়দরাবাদের সাংসদ এবং এ আই এমন আই এম-এর সভাপতি আসাদুদ্দিন ওয়াইসিও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এই মামলায় ন্যায়বিচার পাওয়া গেল না। এন আই এ মামলায় যথাযথ ভূমিকা পালন করেনি।

প্রসঙ্গত, অসীমানন্দ গত বছরই রেহাই পেয়েছে আজমেঢ় দরগায় সন্ত্রাসবাদী হামলার মামলায়। ২০০৭-এর ১১ই অক্টোবর রমজানের সময়ে ওই বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। ওই বছরেই ঘটেছিল সমঝোতা এক্সপ্রেসে বিস্ফোরণ। তাতেও অন্যতম অভিযুক্ত অসীমানন্দ, যার বিচার এখনও চলছে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, কেন্দ্রে ইউ পি এ ক্ষমতায় থাকার সময়ে ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে মালেগাঁও থেকে মক্কা মসজিদ, সমঝোতা এক্সপ্রেস এবং ফের মালেগাঁওয়ে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটেছে, এই সব কটি সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনাই কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের কাজ বলে তদন্তে উঠেও এসেছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্বে বি জে পি-র নেতৃত্বাধীন এন ডি এ সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকেই সব কটি তদন্তের অভিমুখ ঘুরতে শুরু করে। এ‍ই সব বিস্ফোরণ-কাণ্ডের মামলায় একের পর এক সাক্ষী বিরূপ হতে শুরু করেন, বদলে ফেলতে থাকেন আদালতে দেওয়া তাঁদের আগের জবানবন্দি। তদন্তকারী সংস্থা হিসাবে এন আই-র ভূমিকায়ও পরিবর্তন ঘটতে দেখা যায়। ২০০৮ সালের মালেগাঁও বিস্ফোরণ-কাণ্ডের মামলায় মহারাষ্ট্র সরকারের আইনজীবী রোহিনী সালিয়ান তো ২০১৫ সালের জুনে প্রকাশ্যেই বলে দেন, এন আই-র অফিসাররা তাঁকে এই মামলায় জোরালো সওয়ালে যেতে নিষেধ করেছেন। পরিণতিতে সন্ত্রাসবাদী হামলাগুলিতে অভিযুক্ত কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা প্রথমে একে একে জামিন পেতে থাকে। অসীমানন্দ, সাধ্বী প্রজ্ঞা ঠাকুর, শ্রীকান্ত পুরোহিতদের বিভিন্ন মামলায় বেকসুর রেহাইও মিলে যায়। তবে এদিনের রায় অবশ্যই এ‍‌ই প্রশ্ন তুলে দিল যে, অসীমানন্দরা অপরাধী না হয়ে থাকলে বিস্ফোরণ ঘটাল কে বা কারা।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement