ধাক্কা খেয়ে ক্ষিপ্ত মমতার
মন্তব্য ‘নাটক’

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ১৬ই এপ্রিল— আদালতে ধাক্কা খেয়ে সন্ত্রাসকে এখন নাটক বলে চালাতে চাইছেন মমতা ব্যানার্জি!

১৪তলায় নিজের ঘরে বসে জেনে নিয়েছেন ডিভিসন বেঞ্চের রায়। সেই রায় যে শাসকদল ও সরকারকে কোনোরকম স্বস্তি দেয়নি তা জেনে এদিন নবান্ন ছাড়ার সময় মমতা ব্যানার্জিকে দৃশ্যত ক্ষিপ্ত দেখায়। সাংবাদিকদের কাছে তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল,‘ ‘বিরক্ত লাগে। ৫৮হাজার বুথে তোমরা (বিরোধীরা) ৯০হাজার ক্যান্ডিডেট আছো অলরেডি। তার মধ্যেও তুমি (বিরোধী) সন্ত্রাসের নাটক করছো। সন্ত্রাসের গল্প করছো।’

ভোট প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশের বিরোধিতা করে ডিভিসন বেঞ্চে গিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেননি ডিভিসন বেঞ্চের বিচারপতিরা। উপরন্তু শাসকদলের মামলা ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চেই। যে বেঞ্চ ভোট প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেছে সেখানেই মঙ্গলবার শুনানির জন্য ফেরত যেতে হচ্ছে মমতা ব্যানার্জির দলকে।

নবান্ন ছাড়ার সময় এই প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা তাঁর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মমতা ব্যানার্জি জানান, ‘৫৮হাজার বুথের মধ্যে সমস্ত বি ডি ও-রা কাজ করেছে। এস ডি ও-রা কাজ করেছে। ডি এম কাজ করেছে। আই সি-রা কাজ করেছে। সাধারণ ছেলেমেয়ে পরীক্ষা দিতে দিতে দিতে যাতে ডিস্টার্ব না হয় কো-অপারেশন করেছে। ৫৮হাজার বুথের মধ্যে ৭টা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে আমাদেরই একজন খুন হয়েছে। আর এখন সন্ত্রাসের গল্প করছো।’

ভোট কবে হবে তাই নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করেছিলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী। কোনও সময় না দিয়ে তারপর আকস্মিকভাবে পঞ্চায়েত ভোটের দিন ঘোষণা করে দেয় রাজ্য নির্বাচন কমিশন। দিন ঘোষণার ৪৮ঘন্টার মধ্যেই শুরু হয়ে যায় মনোনয়ন পর্ব। নমিনেশন শুরু হতেই শাসকদল ও পুলিশের তাণ্ডবের নমুনা প্রতিদিন টের পেয়েছে বিরোধীরা। কীভাবে ব্লক অফিস অবরুদ্ধ করে বিরোধীদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছিল তা অস্বীকার করতে পারেনি নির্বাচন কমিশনও। তাই মনোনয়নের দিন বাড়াতে বাধ্য হয় কমিশন। পরে তা শাসকদলের চাপে প্রত্যাহারও হয়ে যায়। রাজ্যের পঞ্চায়েত ভোট গড়ায় আদালতে।

কলকাতা হাইকোর্ট সোমবার পর্যন্ত রাজ্যের পঞ্চায়েত নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশ জারি করে। সিঙ্গল বেঞ্চের রায়ের বিরোধিতা করে হাইকোর্টের ডিভিসন বেঞ্চে মামলা করে শাসকদল ও নির্বাচন কমিশন। এদিন সেই ডিভিসন বেঞ্চই ফিরিয়ে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসকে।

বেজায় ক্ষুব্ধ মমতা ব্যানার্জির সব রাগ গিয়ে পড়ে বিরোধীদের ওপর। মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, ‘ভোট মানে গণতান্ত্রিক অধিকার। তাহলে কোর্টে যাচ্ছ কেন? বিভিন্নরকম পলিটিক্যাল প্রশ্ন তুলে?’ কিন্তু ভোট দেওয়ার অধিকার তো পরের কথা আগে তো ভোটে দাঁড়ানোর অধিকার দিতে হবে, রাজ্যে গত ২রা এপ্রিল থেকে সেই অধিকারই তো বিরোধীরা পায়নি। তার প্রতিবাদেই আদালতে যেতে হয়েছে। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি মনে করেন রাজ্যে কোনও সন্ত্রাসই হয়নি। তাই এদিন নবান্নে তিনি বলেছেন,‘সি পি এম কেন নিজেরা নমিনেশন ফাইল করতে পারেনি। হু টোল্ড দেম নট টু ফাইট? তুমি তোমার পার্টিটাকেই বি জে পি-র কাছে বিক্রি করে দিয়েছো। আর কংগ্রেস নেতাদেরও জিজ্ঞারা করুন, দিল্লিতে তোমরা মিটিং করো আর পার্লামেন্ট চললে, পায়ে ধরে বলো, সরি পায়ে ধরে নয়, রিকোয়েস্ট করো, এসো বাবা একসাথে কাজ করি। আর পার্লামেন্ট শেষ হয়ে যাওয়ার পর তোমার লোকেরা এখানে এসে বি জে পি-র সাথে ঘর করো।’ যদিও কংগ্রেস ও সি পি আই (এম) নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বি জে পি নিয়ে কোনও প্রশ্ন এদিন ছিল না মমতা ব্যানার্জির।

কেন তাঁর দলের মন্ত্রী ও সাংসদ রাজ্য নির্বাচন কমিশনারের কাছে তাঁর নির্দেশ প্রত্যাহার করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন তা নিয়ে অবশ্য কোনও মন্তব্য করেননি মমতা ব্যানার্জি। তবে আদালতে নির্বাচন প্রক্রিয়া পিছিয়ে গেলে এরাজ্যের উন্নয়ন পিছিয়ে যাবে বলে মমতা ব্যানার্জি বিরক্তি প্রকাশ করেন।

এদিন তাঁর কথা থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেছে কখন পঞ্চায়েত নির্বাচন হবে তা মমতা ব্যানার্জি জানতেন। তিনি জানবেন সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশাসনিক সভাকে পরপর দুদিন ব্যবহার করে রাজ্যবাসী ও বিরোধীদের ভোট নিয়ে বিভ্রান্ত করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে যা কোনোভাবেই রুচিসম্মত নয়। গত মার্চ মাসে বোলপুরে প্রশাসনিক সভা করে মমতা ব্যানার্জি বলেছিলেন, জুলাই-আগস্ট মাসে পঞ্চায়েত ভোট হতে পারে। তারপরে তিনি সভা করেছিলেন মেদিনীপুরে। সেখানে তিনি বলেছিলেন, পঞ্চায়েত নির্বাচন হবে দু-তিন মাসের মধ্যে।

এদিন তিনি কী বললেন?

মমতা ব্যানার্জি বলেন,‘ কোর্টের ব্যাপারে আমি কোনও মন্তব্য করি না। কিন্তু একটা প্রশাসনিক ক্যালেন্ডার মেনে এই সমস্ত ডেটগুলো ঠিক করা হয়েছে। এমনকি একসাথে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাও চলেছে। পঞ্চায়েতের নমিনেশনও হয়েছে। ১৫ই মে-র মধ্যে নির্বাচন করে ফেলতে হবে। তারপর এত গরম পড়ে যায় মানুষ পারে না।’ মনোনয়ন কী হয়েছে তা রাজ্যের বিরোধীশূন্য পঞ্চায়েতের দিকে তাকালেও বোঝা যাবে। কিন্তু প্রশাসনিক ক্যালেন্ডার ও পরীক্ষা সূচি মেনে যে পঞ্চায়েত ভোটের দিনক্ষণ ঠিক হয়েছে তা বুঝিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাহলে ভোটের আগে কেন দিনক্ষণ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ালেন খোদ মমতা ব্যানার্জি। বিরোধীদের অভিযোগ, বিরোধীদের বিভ্রান্ত করে অল্প সময়ের মধ্যে পঞ্চায়েত ভোট সেরে ফেলার গোটা চিত্রনাট্য আসলে তিনিই তৈরি করেছেন। তাঁর পরিকল্পনাতেই হাতেকলমে প্রয়োগ করেছেন অনুব্রত মণ্ডলরা।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement