মজুরি বকেয়া, তৃণমূলী প্রধানকে
ঘিরে বিক্ষোভ করে শ্রমিকরা!

তৃণমূল- বি জে পি দুই পঞ্চায়েতের হালই একই, গ্রামে নেই কাজ

চিরন্তন পাড়ুই   ১৭ই এপ্রিল , ২০১৮

হাওড়া : ১৬ই এপ্রিল- ৬নং জাতীয় সড়ক দিয়ে গেলেই দেখা মেলে জাতীয় সড়কের দুপাশ জুড়ে ধুলাগড়ে একের পর কারখানা ও গোডাউন।শ্রমিক মহল্লা, দারিদ্র, ক্ষোভ, শোষণের সব চিত্রই মিলবে এখানে।

তবে কয়েকদিন আগেই যে দৃশ্য রচিত হয়েছিল, তা অনায়াসে এরাজ্যে শাসক দলের আয়না হয়ে উঠতে পারে। তৃণমূল কাদের পক্ষে? তৃণমূল কাদের দল? তাও স্পষ্ট হয়েছিল এখানেই।

কারখানা-গোডাউনের মজদুরদের কাজ দেন ঠিকাদার।দিনের পর দিন বিনা মজুরিতে ওভারটাইমের চাপে অসুস্থ হয়ে পড়েও কাজ ছেড়ে দিতে হয়েছে অনেককেই। সেদিন জাতীয় সড়কের ধারে কেস প্রস্তুতকারী একটি কারখানা ও গোডাউনের মজদুররা ঘিরে ফেলেছিল সাঁকরাইলে তৃণমূলী পরিচালিত কান্দুয়া গ্রাম পঞ্চায়েত। কিন্তু কেন? মজুরি বাড়ানোর দাবি নিয়ে কারখানা মালিকের কাছে না গিয়ে তৃণমূল পঞ্চায়েত প্রধানের কাছে যেতে হলো কেন শ্রমিকদের? পঞ্চায়েত প্রধানের কাছে গিয়েই মজুরি বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভে শামিল হয়েছিলেন ঠিকা শ্রমিকরা।মালিকের কাছে দাবিপত্র পেশ না করে তৃণমূলী প্রধানের কাছেই তা দেন শ্রমিকরা। বিক্ষোভরত এক শ্রমিকের কথায়, ‘ আমরা তো খালি চোখেই দেখতে পাই মালিকের সঙ্গে তৃণমূলের নেতাদের কী সম্পর্ক? তাদের কথাতেই তো চলে সব। তাই বাধ্য হয়ে পঞ্চায়েতের প্রধানের কাছে গিয়েছিলাম আমরা’।

শ্রমিক মহল্লায় মালিকের বন্ধু মমতা ব্যানার্জির দল। মজুরি বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভও তাই মমতা ব্যানার্জির দলকে ঘিরেই।

কান্দুয়ার প্রদীপ দাস ২০১৬ সালে কাজ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ‘মজদুরির টাকাটা ঠিকমত বাড়ছিল না। পরে জানতে পারি ঠিকাদার ও শাসক তৃণমূলের মাতব্বরদের পকেটে মজদুরদের মজুরি চলে যায়। কাজ ছেড়ে এখন কলকাতার এক উকিলের কাছে কাজ করি। উকিলের চিঠি কয়েকঘণ্টা পৌঁছে দেওয়ার পর কারখানার গোডাউনের থেকে বেশি মজুরি মেলে।’ তাঁর কথায়, ‘আসলে সবই গুঁড়োর সম্পর্ক। তাইতো কান্দুয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানকে ঘিরে ধরতেই কাজ হলো।’

৬নং জাতীয় সড়কের ধারে কারখানা ও গোডাউনগুলিতে সরাসরি কোম্পানির খাস শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কাজ করতে হয়। ঠিকা শ্রমিকদের সেই বারো ঘণ্টাই কাজ করতে হয়। কোনও ছুটি নেই। ছুটি নিলেই ছাঁটাই! বারো ঘণ্টা কাজের শেষে মেলে ১৭৫ থেকে ২৭০ টাকা।কান্দুয়ার নব কুমার নস্কর দুমাস হলো বেকার। জানালেন, শরীর খারাপ হলেও কাজ কামাই করা যাবে না। কোনও অসুবিধাই শোনে না ঠিকাদার। একেই ১২ঘণ্টার কাজ। তারপর ওভারটাইম। শরীর খারাপ করায় কয়েকদিন কাজে যেতে না পারায় আর কাজ মেলেনি। বাধ্য হয়ে জরির কাজ করছি ঘরে।

কান্দুয়ায় মানুষের কাছে স্পষ্ট কারা শ্রমিকদের পাশে আর কারা মালিকের পাশে। বামপন্থীদের পক্ষে রবিবার কান্দুয়ার দেওয়াল লিখনে তাই দেখা গেল মুটিয়া মজদুর বিদ্যাসাগর কাঞ্জি, হরেকেষ্ট মণ্ডলদের। দেওয়াল লিখতে কেন বেরিয়েছেন? উত্তরে বিদ্যাসাগর কাঞ্জি বলে উঠলেন, খেটে খাওয়া মানুষের এলাকা। বোঝাতে হয়না, অভিজ্ঞতাই যথেষ্ঠ।পাশেই মানিকপুর গ্রাম পঞ্চায়েত। তা চালায় বি জে পি। সাঁকরাইল পঞ্চায়েত সমিতি চালায় তৃণমূল ।

সাতসকালে ময়নাদ্দিন মল্লিক কাজে গেছেন।পাশের ঘরের যুবক মইদুল মল্লিকের কাজ জোটেনি। তাই সে বাড়িতে রয়েছে। ময়নাদ্দিন, মইদুল দুইজনেই সেলাই-এর কাজ করেন। সাঁকরাইল ব্লকের মানিকপুরের নস্করপাড়ার কাঁঠালতলায় বাড়ি ময়নাদ্দিন ও মইদুলদের। ময়নাদ্দিনের স্ত্রী জানান, আগে রোজগার ভালো ছিল। মাস গেলে পাঁচ হাজার টাকা রোজগার হতো দর্জির কাজে গিয়ে। এখন সেলাই কাজ রোজ থাকে না। মোদী সরকারের নোট কাণ্ড ও জি এস টি-র জন্য সেলাই-এর কাজে ইনকাম নেই। স্বামী বাড়ি ফিরলে রান্না চাপবে।’ ময়নাদ্দিনের স্ত্রী দিলওয়ারা কথাগুলি বলে চলেন। মেয়েটা উঠোনে বসে। বাবা আসলে রান্না চাপবে, কচি পেটের খিদে মিটবে।

ভাগীরথীর পাড় ঘেঁষা মানিকপুর। ১০০দিনের কাজ মেলে না। পঞ্চায়েত বলে ব্লকের কথা। ব্লকে গেলে পঞ্চায়েতে পাঠিয়ে দেয়। কোথায় মিলবে স্থায়ী কাজ কেউ বলতে পারে না।

মানিকপুরের নস্করপাড়ার কাঁঠালতলা বস্তিতে স্বামী, মেয়েকে নিয়ে সংসার গৃহবধূ দিলওয়ারা মল্লিকের। মেয়ে সুনয়না নবম শ্রেণিতে পড়ে। ভাগীরথী দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। কিন্তু, দিনবদল হয়নি দিলওয়ারাদের।

মানিকপুর মসজিদ লাইন বস্তিতে দেখা হলো অখিল আনসারির সঙ্গে। পঞ্চাশ বছরের অখিল আনসারি ডেল্টা জুট মিলে মেকানিক্সের কাজ করেন। বলছিলেন মিল মালিকের ও রাজ্য সরকারের কীর্তি। তৃণমূল সরকার আসার পর থেকেই ডেল্টা জুট মিলের শ্রমিকদের কাজ হারাতে হয়। মিলের তিনটি ইউনিট চালু ছিল। প্রধান ইউনিটটির নাম ডেল্টা লিমিটেড। এছাড়াও আরও দুটি ইউনিট চালু ছিল। তৃণমূল সরকার ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ডেল্টা জুট মিল নিয়ে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক ডেকে মালিকের তিনটি ইউনিটকে একসাথে সংযুক্ত করার প্রস্তাবকে সম্মতি দিয়ে ছাঁটাই নীতির হাতকেই শক্ত করে। মেলেনা কোনও সুযোগ, ই এস আই-র সুবিধাও পাওয়া যায় না। পি এফ-র ট্রাস্টি বোর্ডের নির্বাচনও বছরের পর বছর বন্ধ। পি এফ-র সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। মিল কার্যত ধুঁকছে, শ্রমিকের সংখ্যাও কমছে। স্থানীয়দের কথায়, তাই হারিয়ে গেছে মিলের নাম। নাম বদলে এখন সবাই বলে ‘পোড়া মিল’!

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement