‘লঙ মার্চ’-র সেনারা
কোমর বাঁধছেন ফের

শুদ্ধসত্ত্ব গুপ্ত   ২০শে এপ্রিল , ২০১৮

হায়দরাবাদ : ১৯শে এপ্রিল— আদিবাসী প্রবীণার ক্ষতবিক্ষত পায়ের ছবি নাড়িয়ে দিয়েছিল সারা দেশের বিবেক। নাসিক থেকে মুম্বাই ‘কিষান লঙ মার্চ’ থেকে উঠে আসা ছবি পোস্টার হয়ে ছড়িয়েছিল। লেখা হয়েছিল, ‘আমাদের ভারতমাতা।’ লঙ মার্চের এক মাসের কিছু সময় পর এখন ফের শুরু হয়েছে পথে নামার তোড়জোর। কারণ, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী কথা দিয়েও রাখছেন না। জমির পাট্টা, ঋণ মকুবের সুবিধা হাতে-হাতে পৌঁছাচ্ছে না।

দেশজুড়ে জনমতের তীব্রতায় পিছিয়েছিলেন বি জে পি নেতা মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ। পায়ে পায়ে দুশো কিলোমিটার পথ পেরিয়ে আসা কৃষকদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন ১২ই মার্চ। বিধানসভা ঘিরে রাখার প্রস্তুতি নিয়ে শুরু হয়েছিল মিছিল। মুম্বাই পৌঁছে মনোবল অটুটই ছিল। মুখ্যমন্ত্রী কৃষক প্রতিনিধিদের কাছেই কেবল দাবি মেনে নেওয়ার সম্মতি জানাননি। বিধানসভায় পেশ করেছিলেন লিখিত বক্তব্য। জানিয়েছিলেন মাস ছয়েক সময় নেবে তাঁর সরকার। তবে সব দাবিই প্রয়োগ করা হবে বাস্তবে।

কিন্তু, ‘লঙ মার্চ’-এর দাবি হাতেকলমে প্রয়োগ করা হচ্ছে না। মহামিছিলের অন্যতম প্রধান সংগঠক জীব পাণ্ডু গাভিত জানাচ্ছেন, আদিবাসীদের পাট্টা দেওয়ার কাজ জোরকদমে শুরু হওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। নাসিক জেলার সরগুনা কেন্দ্রের এই সি পি আই (এম) বিধায়ক পার্টি কংগ্রেসে অংশ নিয়ে রয়েছেন হায়দরাবাদে। সি পি আই (এম)-র রাজনৈতিক প্রস্তাবেও কৃষি অর্থনীতির উপর উদারবাদের হামলা ব্যাখ্যা করা হয়েছে সবিস্তারে। ফসলের ন্যায্য দাম থেকে ঋণ মকুবের পক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।

গাভিত জানাচ্ছেন বিধানসভার অধিবেশন এখন চলছে না। আপাতত মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে জানিয়ে রাখবেন কথা না রাখার অভিযোগ। রাজ্যে কৃষক আন্দোলনের আরেক নেতা কিষান গুজ্জর জানালেন, ১লা জুন থেকে ফের নামতে হতে পারে আন্দোলনে। প্রধান দুই দাবি ছিল, আদিবাসী এবং অন্য বাসিন্দাদের জঙ্গল সংলগ্ন এলাকায় জমির পাট্টা দিতে হবে বনাঞ্চল অধিকার আইন মেনে। অন্যদিকে, ঋণ মাফ করতে হবে কৃষকদের। সরকারের ঋণ মকুব কর্মসূচিতে একগুচ্ছ শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল যাতে বাদ পড়ে যান বেশিরভাগ ঋণগ্রস্ত কৃষক। পাশাপাশি রেশন কার্ড দেওয়ার দাবি, বার্ধক্য ভাতার অর্থ বাড়ানোর মতো গ্রামজীবনের গুরুত্বপূর্ণ দাবিও জুড়ে গিয়েছিল আন্দোলনে। সংযুক্ত হয়েছিল সেচের জন্য জলের ব্যবস্থা, সুলভে বিদ্যুতের দাবিও।

মহারাষ্ট্রে আদিবাসী এলাকার কৃষিজীবী মানুষ ঋণ পান না। ঋণগ্রস্ততা তাঁদের বিশেষ নেই। আধিবাসী প্রধান এলাকায় জমির সংকট বেশি। আবার, অন্য এলাকায় ঋণগ্রস্ত কৃষক বেশি। ঋণ না পেলে চাষে টাকা লাগানোর সুযোগ নেই। সার,বীজের মতো চাষের উপকরণের দাম বেড়েই চলেছে। ফলে বাড়ছে চাষের খরচ। এবার ফসল কেনার বেলা সরকার প্রায় নেই। ফলে, সহায়কমূল্যে ফসল বেচতে পারছেন না কৃষকরা। খরচের তুলনায় তা কম। যা আছে তাও মিলছে না। বাজারে আবার ফলনের দাম পড়ে গেলে বা শিলাবৃষ্টিতে ফসল মার গেলেও বিপদ। চাষে লোকসান অবধারিত। তখন দেনা মেটানোর উপায় নেই। এরপর কঠিন সংকটে পড়ে আত্মহত্যা। কৃষকনেতারা বলছেন, সরকারি গাফিলতিতেই কৃষি সংকট বাড়ছে এভাবেই। বাড়ছে কৃষক আত্মহত্যাও।

মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, পাঁচশো-হাজার করে পাট্টা বিলির কাজ শুরু করে দেওয়া হবে। কিন্তু মহারাষ্ট্রের কৃষকনেতারা বলছেন কাজের অগ্রগতি এখনও চোখে পড়ছে না। ঋণ মকুবের জন্য প্রশাসনিক পদক্ষেপও ঢিলেঢালা গতিতে চলছে। এভাবেই চলতে থাকলে ফের রাস্তায় নামা ছাড়া উপায় নেই। ‘লঙ মার্চ’ ঘিরে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হওয়ায় জনমত তৈরি হয়েছিল সন্দেহ নেই। পাশাপাশি, গাভিত বলছেন যে সরকার মৌখিক সম্মতি দিয়েছিল গত দুবছরে একাধিক আন্দোলনের কারণে। ‘লঙ মার্চ’-এর আগে জেলায় জেলায় যৌথভাবে বিভিন্ন কৃষক সংগঠন বিক্ষোভে নেমেছিল। অভিনব কৃষক ধর্মঘটও হয়েছিল মহারাষ্ট্রে। তাছাড়া দেশে যৌথভাবে বিভিন্ন কৃষক সংগঠন একাধিক দাবিতে একজোট হয়েছে। ভূমি অধিকার আন্দোলন নামে মঞ্চ গড়ে উঠেছে। জমি অধিগ্রহণ আইন বদলাতে কেন্দ্রের সরকারের আনা অর্ডিন্যান্স বাতিলের দাবিতে যৌথ কৃষক আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও নিয়েছে।

নাসিক, থানে জেলা থেকে যাঁরা দীর্ঘ পদযাত্রায় হেঁটেছিলেন তাঁরা এখন কী বলছেন? গুজ্জর জানালেন, যাঁরা হাটেননি তাঁরাও এখন এগিয়ে এসে বলছেন পরের বার হলে আমরা আছি। আর যাঁরা হেঁটেছেন তাঁরা বলছেন যে সরকারের উপর থেকে চাপ তুলে নিও না। জমির পাট্টা, ঋণ মাফিতে হেলদোল না দেখালে ফের জোর লাগাও, রাস্তায় নামো।

মহারাষ্ট্র কেবল নয়, পাশের রাজ্য মধ্য প্রদেশের কৃষকনেতারাও বলছেন যে ‘লঙ মার্চ’ একেবারে প্রান্তিক জনতাকেও বুঝিয়েছে যে তাঁরও গুরুত্ব আছে। মধ্য প্রদেশের কৃষকনেতা অশোক তিওয়ারি বলছেন, রাজ্যের বি জে পি সরকারের উপর তীব্র ক্ষোভ রয়েছে কৃষকদের। তার প্রতিফলন পড়েছিল মন্দসৌরে। ‘লঙ মার্চ’-এর পর ২৭-৩১শে মার্চ পদযাত্রা হয়েছে মধ্য প্রদেশেও।

মধ্য প্রদেশে ফসলের দামের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন চালাচ্ছেন কৃষকরা। কিন্তু সেই আন্দোলন বিচ্ছিন্ন ছিল। গত বছর পুলিশের গুলিতে কৃষকদের মৃত্যুর পর সংগঠিত করা গিয়েছে ক্ষোভ। ভূমি অধিকার আন্দোলন দেশজুড়ে যে কৃষক জাঠা করেছে তারও শুরু হয়েছিল মন্দসৌর থেকে। ফের মে-র শেষদিকে বিভিন্ন গণসংগঠন একযোগে নামবে আন্দোলনে।

‘লঙ মার্চ’ অন্যদের উৎসাহ দিয়েছে, সাহসও। এবার নাসিক, থানের মানুষ চাইছেন হাতেকলমে দাবি আদায়।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement