দ্বিতীয় নোটবন্দি?

  ২০শে এপ্রিল , ২০১৮

দেড় বছর আগের নোটবন্দির বিভীষিকাময় স্মৃতিকে জাগিয়ে ফের নগদের আকাল দেখা দিয়েছে দেশের প্রায় অর্ধেক রাজ্যে। এই রাজ্যগুলিতে বেশির ভাগ এ টি এম-ই প্রায় নগদশূন্য। এমনকি ব্যাঙ্ক থেকেও চাহিদামতো নগদ টাকা তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের। দুতিন মাস আগে অন্ধ্র প্রদেশ ও তেলেঙ্গানায় এই নগদ সমস্যা দেখা দিলেও ক্রমে তা ছড়িয়েছে অন্য রাজ্যগুলিতেও। পশ্চিমবঙ্গেও অনেক জায়গায় এ টি এম-এর টাকা মিল‍‌ছে না। এইভাবে চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হবে এবং তারা আরও বেশি বেশি করে টাকা তোলার জন্য ব্যাঙ্ক এবং এ টি এমে লাইন দেবেন। তখন সমস্যা মহামারীর আকার নিয়ে ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশে। যেমনটা হয়েছিল নোটবন্দির পর। আশ্চর্যের বিষয় দুতিন মাস আগে সমস্যার শুরু হলেও সরকার তেমন কোনও গুরুত্ব দেয়নি। জোড়াতালি দিয়ে সমস্যাকে চেপে যাওয়ার চেষ্টা করে। অন্য রাজ্যে নগদের জোগান কমিয়ে সমস্যাকবলিত রাজ্যে জোগান বাড়ানো হয়। তাতে অন্য রাজ্যগুলিতেও জোগান কমে যাওয়ায় জোগানের অভাব দেখা দেয়। দ্রুত নগদ সংকট ছড়িয়ে পড়ে দেশের অর্ধেকের বেশি জায়গায়।

কেন এমন ঘটনা ঘটল তার স্পষ্ট কোনও ব্যাখ্যা সরকারের তরফে মিলছে না। দায়সারাভাবে বলার চেষ্টা হচ্ছে কয়েকটি রাজ্যে আচমকা নগদের চাহিদা অস্বাভাবিক বেড়ে যাবার ফলে এমনটা ঘটেছে। কিন্তু কি কারণে চাহিদা বেড়েছে সে সম্পর্কেও সরকার নীরব। সরকারি নীরবতা ও শিথিলতার ফাঁকে নানা মহল থেকে উঠে আসছে নানান মত। প্রথমত, নোটবন্দির আগে বাজারে চালু নগদ টাকার সমপরিমাণ টাকা এখন বাজারে চালু আছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে প্রতিনিয়তই নগদের চাহিদা বৃদ্ধির কথা। সরকারের অনুমান বর্তমানে বাজারে নগদের চাহিদা আছে ২২/২৩ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু আছে ১৮ লক্ষ কোটি টাকার মতো। সরকার পরিকল্পনা করেই চাহিদার থেকে কম টাকা সরবরাহ করছে মানুষকে ক্যাশলেস লেনদেনে বাধ্য করাতে। তাছাড়া বৃহৎ ও মাঝারি সংস্থার প্রতি সরকারের বাড়তি দায়বদ্ধতার কারণে ক্যাশলেসে আগ্রহ বেশি। ফলে মার খাচ্ছে ছোট ও ক্ষুদ্র শিল্প ব্যবস্থা এবং কৃষি। দ্বিতীয়ত, বলা হচ্ছে নতুন ২০০০ টাকার নোট ব্যাপক হারে মজুত হচ্ছে বলে বাজারে ২০০০ টাকার নোট কমে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো কারা এই বড় মূল্যের নোট মজুত করছে? সাধারণ মানুষের সামর্থ্য নেই বেশি টাকা মজুত করার। তাছাড়া করবেই বা কেন? তবে কি কালো টাকার কারবারিরা অতিসক্রিয় হয়ে উঠেছে? নরেন্দ্র মোদীর নোটবন্দির কল্যাণে কালো টাকার মালিকরা তাদের সব টাকা সাদা করে নিয়েছেন। এবার নতুন করে ফের দ্বিগুণ উৎসাহে কালো টাকা মজুত শুরু করেছেন।

তৃতীয়ত, নোটবন্দির পর থেকে ব্যাঙ্ক শিল্প নিয়ে মোদী সরকার যেসব পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে তাতে ব্যাঙ্ক নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আস্থার ভিত টলতে শুরু করেছে। মোদী সরকার যেভাবে ধাপে ধাপে পুনর্গঠনের নামে ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণের পথ প্রশস্ত করছে তাতে মানুষ ব্যাঙ্কে টাকা রাখার ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তায় পড়ছেন। তাছাড়া সুদের হার কমিয়ে দেওয়া, অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম ব্যালান্স বাড়ানো এবং তা না থাকলে জরিমানা আদায়, পদে পদে পরিষেবা চার্জ ইত্যাদির ফলে ব্যাঙ্কে টাকা রেখে আর বিশেষ লাভ হচ্ছে না। উলটে এফ আর ডি আই বিল এনে সাধারণের আমানত ফেরতের গ্যারান্টিই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, শিল্পপতি-ব্যবসায়ীরা লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে হাপিস করে দিলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বর্তমানে ব্যাঙ্কগুলির প্রায় ১২ লক্ষ কোটি টাকা অনাদায়ী ঋণ। বেশিটাই বৃহৎ শিল্পপতিদের কাছে। এই টাকা ফেরতের সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই অবস্থায় ব্যাঙ্কগুলি গভীর সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ব্যাঙ্কের ওপর আস্থা রাখতে দ্বিধাবোধ করছেন। তাই অনেক রাজ্যেই দেখা যাচ্ছে মানুষ স্থায়ী আমানত ভেঙেও টাকা তুলে নিচ্ছেন। অর্থাৎ মোদী সরকারের নীতি ও কার্যকলাপ ব্যাঙ্ক শিল্পে সংকট ডেকে এনেছে। এখন সংকটগ্রস্ত ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা হ্রাস পেতে শুরু করেছে। ফলে মানুষ বে‍‌শি বেশি করে নগদ টাকা নিজেদের হাতে রাখতে চাইছেন। আর সরকার নগদের জোগান কমিয়ে সংকটকে প্রসারিত করার ব্যবস্থা করছে। লক্ষ্য : প্রকারান্তরে বড়লোকদের, কর্পোরেট মালিকদের এবং কালো টাকার মালিকদের সুবিধা করে দেওয়া।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement