লোয়ার মৃত্যুরহস্যই
তদন্তের আরজি খারিজ!

  ২০শে এপ্রিল , ২০১৮

নয়াদিল্লি, ১৯শে এপ্রিল — ইঙ্গিত ছিলো আগেই। আশঙ্কামতোই বিচারক বি এইচ লোয়ার রহস্যজনক মৃত্যুর নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি বৃহস্পতিবার খারিজ করে দিলো প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের সেই সুপরিচিত বেঞ্চ। দেশজুড়ে চাঞ্চল্যসৃষ্টিকারী সোহরাবুদ্দিন ভুয়ো সঙ্ঘর্ষ মামলা চলাকালীন সংশ্লিষ্ট এজলাসের সি বি আই বিচারক লোয়ার আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তো সুপ্রিম কোর্ট মানেই নি, বরং এই দাবি তুলেছেন যাঁরা তাঁদের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ আক্রমণাত্মক মন্তব্যও করেছেন বেঞ্চের তিন বিচারপতি। কার্যত কোন কার্যকরী তদন্ত ছাড়াই কেন্দ্রের শাসকদলকে প্রবল স্বস্তি দিয়ে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ এদিন ঘোষণা করে দিয়েছে, ‘বিশেষ সি বি আই বিচারক লোয়ার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিলো। বিচারব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করার উদ্দেশ্য নিয়েই এই মৃত্যুর স্বাধীন তদন্তের দাবি তোলা হয়েছে। অত্যন্ত হালকাভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আবেদন পেশ করা হয়েছে সর্বোচ্চ আদালতে।’ একইসঙ্গে বেঞ্চের তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণা, ‘আজকের রায়ের পরে বিচারক লোয়ার মৃত্যুরহস্য নিয়ে যাবতীয় মামলা শেষ করে দেওয়া হলো।’

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের এই রায়ে স্বাভাবিকভাবেই দেশের বিভিন্ন মহলে যুগপৎ বিষ্ময় এবং ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। আলোড়ন তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যেও। অসন্তোষের সুরে কংগ্রেস বলেছে, ‘ভারতের ইতিহাসে দুঃখের দিন আজ। বিচারক লোয়ার মৃত্যু ঠিক কিভাবে, কোন পরিস্থিতিতে হয়েছিলো, তা জানতে চান ভারতবাসী।’ বিচারকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ফের ‘অবিলম্বে নিরপেক্ষ এবং ন্যায্য তদন্তের’ দাবিও তুলেছে কংগ্রেস। পাশাপাশি হায়দরাবাদে সি পি আই (এম)-র ২২তম কংগ্রেসের মাঝেই সাংবাদিকদের কাছে পার্টির সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেছেন, বিচারপতি লোয়ার মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি সুপ্রিম কোর্টের যেভাবে অগ্রাহ্য করলো তা খুবই ‘দুঃখজনক’। ইয়েচুরি মন্তব্য করেন, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে দায়ের হওয়া আবেদন খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট সেগুলিকে ‘কেচ্ছা-মূলক’ (স্ক্যান্ডালাস) বলেছে। আমরা এর সঙ্গে একমত নই। ন্যায়বিচার দেওয়ার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানের কাছে এমন মন্তব্য দুঃখজনক। আমরা মনে করি সুপ্রিম কোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে এই রায়ের পর্যালোচনা হওয়া উচিত, যাতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। যাবতীয় তথ্য ও হাইকোর্টের পূর্ববর্তী রায় থেকে এটা স্পষ্ট যে বিচারপতি লোয়ার মৃত্যুর ঘটনার উপযুক্ত তদন্ত দরকার।

তবে বিচারক লোয়ার মৃত্যুর ঘটনায় শাসকদল বি জে পি এবং তাদের সভাপতি অমিত শাহের ভূমিকা সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকায় এদিনের রায়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে তারা। প্রধান বিচারপতির রায় ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বি জে পি-র বিভিন্ন নেতা শুধু একযোগে সন্তোষ প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হননি, কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলির উদ্দেশে কটাক্ষও ছুঁড়তে শুরু করেন। তাঁরা বলেন, ‘বি জে পি সভাপতি অমিত শাহের চরিত্র হননের উদ্দেশ্য নিয়ে এই মৃত্যুরহস্যের তদন্ত দাবি করা হচ্ছিলো।’ সর্বোচ্চ আদালতে একগুচ্ছ আবেদন পেশের পেছনে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর ‘অদৃশ্য হাত’ কাজ করেছে বলেও অভিযোগ করেছে বি জে পি। এর জবাবে কংগ্রেসের মুখপাত্র রণদীপ সূরযেওয়ালা ফের পালটা বলেছেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরেও বিচারক লোয়ার মৃত্যুরহস্য নিয়ে উত্তর-না-পাওয়া অনেকগুলি প্রশ্ন থেকে গেলো। সুপ্রিম কোর্টের প্রত্যক্ষ তদারকিতে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমেই একদিন-না-একদিন প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হবে।’

প্রসঙ্গত, ২০০৫সালের নভেম্বরে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শাসনাধীন গুজরাটে সোহরাবুদ্দিন শেখ, তাঁর স্ত্রী কৌসর বাঈ এবং তাঁদের সহযোগী তুলসীরাম প্রজাপতিকে ভুয়ো সঙ্ঘর্ষের অজুহাত দেখিয়ে আসলে একতরফাভাবে খুন করা হয়েছিলো বলে জোরালো অভিযোগ ওঠে। চাঞ্চল্যকর এই মামলায় ঘটনার চক্রী হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছিলেন বি জে পি-র বর্তমান সভাপতি অমিত শাহ, রাজস্থানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুলাবচাঁদ কাটারিয়া, রাজস্থানের ব্যবসায়ী বিমল পাটনি, গুজরাটের প্রাক্তন পুলিশ প্রধান পি সি পান্ডে-সহ আরো বেশ কয়েকজন পুলিশকর্তা। মামলাটি চলছিলো তদানীন্তন বিশেষ সি বি আই বিচারক লোয়ার এজলাসে। সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়েই ২০১৪সালের ১লা ডিসেম্বর নাগপুরে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে আচমকা মারা যান বিচারক লোয়া। ‘হৃদরোগে’ তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে সরকারিভাবে জানানো হলেও, তা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি বিভিন্ন মহলের। বিচারক লোয়ার আকস্মিক মৃত্যুর পরে নিযুক্ত বিচারক লক্ষ্যণীয়ভাবে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অমিত শাহ-সহ বিভিন্ন অভিযুক্তকে মামলা থেকে ‘বেকসুর মুক্তি’ দিয়ে দেন। এহেন ঘটনাপরম্পরায় সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়। কয়েকজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে এই মামলা অবশ্য মুম্বাইয়ে স্থানান্তর করে চলতে থাকে।

গত বছরের নভেম্বরে বিচারক লোয়ার বোন এই মৃত্যু নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ্যে সন্দেহ প্রকাশ করায় মৃত্যুরহস্য-বিতর্কে কার্যত ঘৃতাহুতি হয়। ঘটনাপরম্পরা উল্লেখ করে তাঁর দাদার মৃত্যুর সঙ্গে সোহরাবুদ্দিন শেখ ভুয়ো সঙ্ঘর্ষ মামলার যোগ রয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। এর পরেই প্রবল চাপে পড়ে যায় কেন্দ্রের শাসকদল বি জে পি। অভিযোগ, তৎক্ষণাৎ বহুগুণ বেড়ে যায় সত্য আড়াল করার যাবতীয় তৎপরতা। গত ১৪ই জানুয়ারি বিচারক লোয়ার পুত্র মুম্বাইয়ে ‘আমার বাবার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে’ বলে যে ঘোষণা করেন, তার পেছনেও শাসকদলের সুসংগঠিত পরিকল্পনা রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যেই বিচারক লোয়ার নাগপুর যাত্রার সহযাত্রী মুম্বাইয়ের চার বিচারকও এই মৃত্যুকে ‘স্বাভাবিক’ বলে বিবৃতি দেন।

মুম্বাইয়ের এই চার বিচারকের বিবৃতিকেই যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে এদিন প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র, বিচারপতি এ এম খানউইলকর এবং ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের বেঞ্চ বলেছে, ‘এই চার বিচারকের বক্তব্য অবিশ্বাস করার কোন যুক্তি থাকতে পারেনা। এঁদের বিবৃতিকে বিশ্বাসযোগ্য, যথার্থ এবং সত্য বলেই মনে করছি আমরা।’ প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের এহেন পর্যবেক্ষণ নিয়ে পরে একাধিক প্রশ্ন উঠলেও, এদিন বিচারপতিরা উলটে আবেদনকারীদের কৌঁসুলি দুষ্মন্ত দাভে, ইন্দিরা জয়সিং, প্রশান্ত ভূষণের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কড়া মন্তব্য প্রয়োগ করেন। স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ না দিয়ে বরং বেঞ্চের বিচারপতিরা ঘোষণা করে দেন, বিচারক লোয়ার মৃত্যুর ঘটনায় অস্বাভাবিক কিছুই নেই। তাই সি বি আই অথবা অন্য কোন সংস্থার মাধ্যমে আর কোন তদন্তের প্রয়োজন নেই। মুম্বাই হাইকোর্টের বিচারপতিদের বিবৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলায় কার্যত ভর্ৎসনার ভাষায় আবেদনকারীদের উদ্দেশে বেঞ্চ বলে, বিচারব্যবস্থার বদনাম করার উদ্দেশ্য নিয়েই এসব প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আক্রমণের ইচ্ছা নিয়েই এমন সব আবেদন পেশ করা হয়। আসলে রাজনৈতিক শত্রুতা থেকে এই মামলা করেছেন আবেদনকারীরা।

সুপ্রিম কোর্টের অভ্যন্তরে মামলার দায়িত্ব বন্টন-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের ভূমিকায় প্রকাশ্য অসন্তোষ জানিয়ে কিছুদিন আগেই কার্যত ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা করেছিলেন সর্বোচ্চ আদালতেরই চার সুপরিচিত প্রবীণতম বিচারপতি। গত ১২ই জানুয়ারি নয়াদিল্লিতে বেনজিরভাবে প্রকাশ্য সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে বিচারপতি জে চেলমেশ্বর, বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, বিচারপতি এম বি লোকুর এবং বিচারপতি কুরিয়েন যোশেফ প্রধান বিচারপতির কাজের ধারা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন। সুগভীর তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যে তাঁরা বলেছিলেন, একের পর এক বিভিন্ন স্পর্শকাতর এবং অতি-গুরুত্বপূর্ণ মামলা পছন্দমতো বেঞ্চে পাঠানো হচ্ছে! বিচারব্যবস্থায় নিরপেক্ষতার মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই নিয়েই প্রবীণতম বিচারপতিদের মামলা শোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলেও ইঙ্গিত দেন তাঁরা। এই প্রসঙ্গে সেদিন তাঁরা যে মামলাগুলির কথা উল্লেখ করেছিলেন, তার মধ্যে বিচারক লোয়ার মৃত্যুরহস্যের তদন্তের দাবির এই মামলাটিও ছিলো! ফলে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের এদিনের রায় ভারতীয় বিচারব্যবস্থা নিয়ে আবারো আরেকদফা প্রশ্ন উসকে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement