সাম্প্রদায়িক শক্তি জেতেনি

  ১৬ই মে , ২০১৮

কর্ণাটকে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী অনেক লম্বা চওড়া ভাষণ দিয়েছেন। বি জে পি-র সভাপতি অমিত শাহ সব রাজ্যের দলীয় নেতাদের সভায় জানিয়ে দিয়েছেন কর্ণাটকে বি জে পি ক্ষমতায় আসছে নিশ্চিতভাবেই। এমনকি তিনি এটাও বলেছেন তারা সবচেয়ে কম হলেও ১৩০টি আসন পাবেন। তার আগে নির্বাচনের প্রচারের সময় শাহ বলেছিলেন দক্ষিণ ভারত জয়ের পথে কর্ণাটকই হবে বি জে পি-র গেটওয়ে। বি জে পি-র মুখ্যমন্ত্রী পদের দাবিদার দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ইয়েদুরাপ্পা জয় সম্পর্কে এতটাই নিশ্চিত যে গণনার আগেই শপথ নেবার দিন ঠিক করেছিলেন এবং অনুষ্ঠানের জন্য স্টেডিয়ামেরও বন্দোবস্ত করে ফেলেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কর্ণাটকের মানুষ তাঁদের প্রত্যাশা ও সব আয়োজনে জল ঢেলে দিলেন। সরকার গড়ার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা কংগ্রেস বা বি জে পি কেউই পায়নি। শেষ পর্যন্ত ত্রিশঙ্কু অবস্থাতেই থিতু হয়েছে ভোটের ফল।

কর্ণাটকের নির্বাচনী রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য এখানে কোনও সরকারই এক দফার বেশি সরকারে থাকে না। সেই ধারাকে ধরে নিয়েই বি জে পি জয় সম্পর্কে বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিল। অপরদিকে কংগ্রেসও ধরে নিয়েছিল সেই ধারা এবার বদলে যাবে। বাস্তবে কারও প্রত্যাশাই পূর্ণ হয়নি। তবে এই জয়-পরাজয় এবং ক্ষমতা দখলের মরিয়া লড়াইয়ের সাধারণ গণ্ডির মধ্যে এই নির্বাচনকে আটকে রাখা যাবে না। এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে ভীষণভাবে বিবেচ্য। আগামী বছর লোকসভা নির্বাচনের আগে কর্ণাটকে ক্ষমতাসীন কংগ্রেসকে হারিয়ে ক্ষমতা দখল বি জে পি-র পক্ষে ভীষণভাবে জরুরি ছিল। এরপরই হবে রাজস্থান, মধ্য প্রদেশসহ কয়েকটি বি জে পি শাসিত রাজ্যে নির্বাচন। সেখানে ইতিমধ্যেই যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তাতে বি জে পি-র পক্ষে স্বস্তিতে থাকার কোনও কারণ নেই। মোদীকে দেখিয়ে বাজিমাত করার মতো ভাবমূর্তিও আর অবশিষ্ট নেই। চার বছরে মোদীর চাকচিক্য অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। চমক আর মনভোলানো প্রতিশ্রুতির ধোঁকাবাজি মানুষ ধরতে শুরু করেছেন। উন্নয়নের জয়ঢাক কার্যত অকেজো। মোদী ঘোষিত একটি প্রকল্পও নেই যা সাফল্যের আলো দেখাতে পেরেছে। প্রতিক্ষেত্রেই ব্যর্থতার নজির। কালো টাকা উদ্ধার হয়নি। প্রত্যেক মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ করে টাকা আসেনি। বছরে ২ কোটি দূরের কথা ২ লক্ষ চাকরিও হয়নি। কৃষিতে ভয়াবহ অবস্থা। ফসলের দাম না পাওয়ার যন্ত্রণা বেড়েছে বই কমেনি। ফলে আত্মহত্যার স্রোত প্রসারিত হয়েছে। নোট বন্দি এবং জি এস টি-র ধাক্কায় লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদক ও বাণিজ্য সংস্থা হয় বন্ধ হয়ে গেছে অথবা ধুঁকতে ধুঁকতে টিকে আছে। এইসব অসংগঠিত ক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ হারিয়েছেন।

শিল্পে কোনও বিনিয়োগ নেই। সরকারি বিনিয়োগও তলানিতে। প্রধানমন্ত্রী শুধু দেশ-বিদেশ ঘুরে বক্তৃতার ফোয়ারা ছোটাচ্ছেন। জিনিসপত্রের দাম বেড়েই যাচ্ছে। দেশের ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা ভয়াবহ সংকটে। সুদের হার কমে মানুষের আমানত থেকে আয়ের রাস্তাও বন্ধ। পেট্রোপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। অন্যদিকে বিদেশিপুঁজির জন্য দেশের দরজা একটার পর একটা খুলে যাচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা চলে যাচ্ছে বেসরকারি হাতে। মানুষের আয়ের নিরাপত্তা বলে আর কিছু থাকছে না। এমন অবস্থায় ক্ষোভ বাড়ছে সব অংশের মধ্যে। বি জে পি জানে এর মোকাবিলার সাধ্য তাদের নেই। তাই হিন্দুত্ব দিয়ে, ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক হিংসা ও বিদ্বেষ দিয়ে মানুষকে ভাগ করতে চাইছে। সংখ্যালঘুদের ওপর, দলিতদের ওপর, নারীদের ওপর অত্যাচার বাড়ছে। অন্ধত্ব, কুসংস্কার, ধর্মীয় মৌলবাদে মদত দেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলার চূড়ান্ত অবনতি হচ্ছে বি জে পি শাসিত সব রাজ্যে। দুর্নীতি ছড়াচ্ছে নতুন করে।

কর্ণাটকে ভোটে এই বাস্তবতা অস্বীকৃত হয়নি। তাই মানুষ বি জে পি-কে ক্ষমতায় বসাননি। হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ক্ষমতার অলিন্দ থেকে দূরে রাখতে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শক্তির দায়িত্ব এই অবস্থায় অনেক বেড়ে গেছে। কংগ্রেস এবং জে ডি (এস) নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সরকার গঠন করলে বি জে পি-র মতো ভয়ংকর শক্তিকে কোণঠাসা করা সহজ হবে। কর্ণাটকে বি জে পি-কে দূরে সরানো হলে আগামী নির্বাচনেও মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা যাবে, যা আগামী লোকসভা নির্বাচনে মোদী সরকারের পতনের ক্ষেত্রে অন্যতম মানসিক অস্ত্র হিসাবে কাজ করবে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement