১৬ই মে-র ধর্মঘটের পঞ্চাশ বর্ষপূর্তি: শিক্ষা ও প্রাসঙ্গিকতা

প্রণব চট্টোপাধ্যায়   ১৬ই মে , ২০১৮

রাজ্য সরকারি কর্মচারী আন্দোলনের ইতিহা‍‌সে আট দফা দাবির ভিত্তিতে সংগঠিত ১৯৬৮ সালের ১৬ই মে একদিনের প্রতীকী ধর্মঘট এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন হিসাবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। অর্ধশতবর্ষ পূর্বে সংগঠিত এই ধর্মঘটের শিক্ষা ও প্রাসঙ্গিকতা এখনও বিদ্যমান। এই ধর্মঘটের প্রেক্ষিত, দাবিদাওয়ার তাৎপর্য, কর্মচারীদের অংশগ্রহণ, সরকারি স্তরে প্রশাসনিক আক্রমণ এবং সমকালীন রাজ্য পরিস্থিতিতে এই ধর্মঘটের প্রভাব ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই প্রশাসনের অভ্যন্তরে একমাত্র গণতান্ত্রিক শক্তি এবং রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের একমাত্র প্রতিনিধিত্বমূলক সংগঠন রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটি এই দিনটিকে স্মরণে রেখে রাজ্যব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

(এক)

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন এই ধর্মঘটের তৎকালীন প্রেক্ষাপট, সাংগঠনিক এবং রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই ছিল দারুণ গুরুত্বপূর্ণ যা ধর্মঘটের সাফল্যকে নিশ্চিত করতে অনুঘটকের কাজ করেছে। এছাড়া পশ্চিমবাংলার কর্মচারী আন্দোলনের বিকাশধারার কতকগুলি বৈশিষ্ট্য ছিল যা বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। একথা সকলেরই জানা যে, ঊনবিংশ শতাব্দীজুড়ে বাংলাদেশে সমাজ সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন বিশেষত রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, মধুসূদন দত্ত, দীনবন্ধু মিত্র প্রমুখ। এঁদের প্রায় সকলেই ছিলেন সরকারি কর্মচারী। মধ্যবিত্ত সমাজ হিসাবে গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় সমাজ সংস্কার আন্দোলনের প্রভাব ছিল বিপুল। কারণ এই আন্দোলনে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক। এছাড়া মধ্যবিত্ত সমাজ‍‌ গঠনের প্রক্রিয়ায় ইংরেজি শিক্ষানীতির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৩৫ সালের লর্ড মেকলের ‘এডুকেশন মিনিট্‌স’ এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। সমাজ সংস্কার আন্দোলনে সংবাদপত্রের প্রভাবও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

এককথায় বলা চলে যে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শিক্ষার প্রসার, দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে চর্চা-গবেষণার জন্য বিদ্বৎসভার প্রতিষ্ঠা, সংবাদপত্র প্রকাশ, সৃজনশীল সাহিত্য সৃষ্টি প্রভৃতির মধ্য দিয়ে বাংলার মধ্যবিত্ত স্বতন্ত্র ও স্বাধীন সত্তা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে এবং রেনেসাঁ ও রিফর্মেশন আন্দোলনে পুরোধা হয়ে ওঠে। এর সীমাবদ্ধতা ছিল; কিন্তু শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে একে খাটো করে দেখা যেমন উচিত নয়, তেমনই অতিরঞ্জিত আকারে প্রকাশ করাও ঠিক হবে না।

স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষ পর্বে বি‍‌শেষত ত্রিশ ও চল্লিশের অর্থনৈতিক মহামন্দা, তৎকালীন সময়ে শ্রমিক-কৃষক-কর্মচারীদের সংগ্রাম প্রভৃতির মধ্য দিয়ে সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মানসিকতা, চাকরিরত মধ্যবিত্তদের মধ্যে জন্ম নিয়েছিল। এই সময় যৌথ আন্দোলনেরও সূত্রপাত ঘটে। উদাহরণস্বরূপ বলা চলে যে, ১৯৪৬ সালের ২৯শে জুলাই ডাক তার বিভাগে কর্মচারীদের আন্দোলনের সমর্থনে বঙ্গীয় প্রাদেশিক ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (বি পি টি ইউ সি)-এর আহ্বানে বাংলা ও আসামের ছাত্ররা হরতালের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সামনে পিকেটিং করে। সমগ্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-আধা সরকারি অফিস, ব্যাঙ্ক-বিমা-রেল বন্ধ ছিল। অর্থাৎ ডাক-তার কর্মচারীদের ধর্মঘটের সমর্থনে সেদিন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়েই মধ্যবিত্ত কর্মচারী সংগঠনগুলি চেতনার ক্ষেত্রে খানিকটা অগ্রসর হতে পেরেছিল।

(দুই)

স্বাধীনতার পর খাদ্যশস্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, ছিন্নমূল উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন প্রভৃতি দাবিতে ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো (১) উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের দাবিতে আন্দোলন; (২) ১৯৫৩ সালে ট্রামভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন; (৩) ১৯৫৪ সালে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন ও এই আন্দোলনের শীর্ষে অনুষ্ঠিত কলকাতা উত্তর-পশ্চিম লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বামপন্থী প্রার্থী মোহিত মৈত্রর জয়; (৪) ১৯৫৯ সালের ৩১শে আগস্ট খাদ্যের দাবিতে কলকাতায় সংগঠিত কৃষকদের সমাবেশে পুলিশের লাঠিচার্জ ও ৮১ জন কৃষকের মৃত্যু; (৫) গোয়া মুক্তি আন্দোলন; (৬) বন্দিমুক্তি ও ব্যক্তি স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন; (৭) ইন্দো-চীনের জনগণের মুক্তি সংগ্রামের সমর্থনে প্রথমে ফরাসি সাম্রাজ্যবাদ ও পরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ছাত্রবিক্ষোভ ও আন্দোলন; (৮) ১৯৬৬ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি খাদ্য ও কেরোসিনের দাবিতে বসিরহাটে ছাত্র মিছিলে পুলিশের গুলি, নুরুল ইসলামের মৃত্যু এবং একই বছরে মার্চ মাসে কৃষ্ণনগরে পুলিশের গুলিতে ছাত্র আনন্দ হাইতের মৃত্যু প্রভৃতি ঘটনা।

স্বাধীনতার পর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকজুড়ে যেমন বিভিন্ন স্তরের গণআন্দোলনগুলি সংগঠিত হয় তেমনই এই আন্দোলনের পরিবেশে তৈরি হয় একাধিক সংগঠন। এই সময় অর্থাৎ পঞ্চাশের দশক থেকেই গড়ে উঠতে শুরু করে ব্যাঙ্ক, বিমা, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের সর্বভারতীয় ও রাজ্যস্তরের সংগঠনগুলি। ১৯৫১ সালে গঠিত হয় সারা ভারত বিমা কর্মচারী সমিতি। সম্মেলন থেকে গৃহীত দাবিসনদের প্রথম দাবিটিই ছিল বিমা ব্যবসার জাতীয়করণ। এই পর্বেই অর্থাৎ ১৯৫৩-৫৪ সালে খাদ্যদপ্তরে ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে যে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার পথ ধরেই আত্মপ্রকাশ করে রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটি।

এই সময় মধ্যবিত্ত কর্মচারী শিক্ষকদের বেশ কিছু আন্দোলন সংগঠিত হয়। ১৯৫৪ সালে মাধ্যমিক শিক্ষকদের অবস্থান ও অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি আন্দোলন। জননেতা জ্যোতি বসুসহ বিভিন্ন বামপন্থী নেতা এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৬০ সালে দ্বিতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের ছয়দিনব্যাপী ধর্মঘট সংগঠিত হয়। ১৯৫৬ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর রাজ্য কর্মচারীদের ২০টি সমিতি ২৫ টাকা বিশেষ ভাতার দাবিতে ২৫ হাজারের বেশি কর্মচারী সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়ের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। সরকার দুটাকা মহার্ঘভাতা মঞ্জুর করলে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়।

১৯৬২ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম রাজ্য সম্মেলনের মধ্য দিয়ে রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটির আত্মপ্রকাশের পর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন হলো ১৯৬৬ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর গণছুটির কর্মসূচি। এই কর্মসূচিতে যে সমস্ত দাবি উত্থাপিত হয় তা হলো খাদ্য সংকটের অবসান ও দ্রব্যমূল্য হ্রাস, মহার্ঘভাতার ফরমুলা প্রবর্তন, মূল্যবৃদ্ধির কারচুপি বন্ধ, বরখাস্ত কর্মীদের পুনর্বহাল প্রভৃতি। এই কর্মসূচি ব্যাপকভাবে সাফল্যমণ্ডিত হয়।

(তিন)

গণছুটির কর্মসূচির বিপুল সাফল্য, ১৯৬৭ সালে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন ও রাজ্য কর্মচারীদের জন্য বেতন কমিশন গঠন ও মহার্ঘভাতা প্রদান প্রভৃতি দাবি পূরণের প্রভাবে কর্মচারী আন্দোলন ও সংগঠন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু ১৯৬৭ সালের ২১শে নভেম্বর প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটায় রাজ্যের শ্রমিক-কৃষক-কর্মচারীসহ সমস্ত অংশের জনগণের উপর ব্যাপক আক্রমণ নেমে আসে।

কিন্তু কর্মচারী সমাজ মাথা পেতে এই আক্রমণ মেনে নেয়নি। এই আক্রমণের বিরুদ্ধে এবং প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে অর্জিত সুযোগসুবিধাগুলি রক্ষার লক্ষ্যে সংগ্রাম গড়ে ওঠে। এই সংগ্রামের শীর্ষে অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬৮ সালের ১৬ই মে-র ধর্মঘট।

এই ধর্মঘট ঠিক পূর্বপরিকল্পিত ছিল না। বরং বলা চলে যে, রাজ্য সরকার এই ধর্মঘট কর্মচারীদের উপর চাপিয়ে দেয়। রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটির ডাকে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এই পর্বে ৩০শে মার্চ ’৬৮ রাজ্যপালের সাথে সংগঠনের প্রতিনিধিদের বৈঠক ব্যর্থ হয়। এরপর সংগ্রামকে আরও উন্নত স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য ঘোষিত হয় ‘বিক্ষোভ সপ্তাহ’। এই বিক্ষোভ সপ্তাহের শেষে ২৭-২৮শে এপ্রিল ঘোষিত হয় মহকুমা স্তর পর্যন্ত গণঅবস্থানের কর্মসূচি।

বিক্ষোভ সপ্তাহের কর্মসূচিতে হাজার হাজার কর্মচারীদের অংশগ্রহণ ও তাদের জঙ্গী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ দেখে রাজ্যপাল ও তার আমলাবাহিনী এবং রাজভবনে জন্ম নেওয়া কংগ্রেসের ‘ফেডারেশন’ ওয়ালারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। অবস্থানের ন্যায় ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সর্বজনস্বীকৃত ‘ফর্ম’কে কলকাতায় নিষিদ্ধ করা হলো। এমনকি কুখ্যাত ‘সার্ভিস কন্ডাক্ট রুলস্‌’-এর অবৈধ সংযোজনী এনে কর্মচারীদের প্রকাশ্য বিক্ষোভ প্রদর্শনের অধিকার খর্ব করা হলো। এমনকি হুমকি দেওয়া হয় যে বিক্ষোভ প্রদর্শনে অংশগ্রহণ করলে পুলিশি নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হবে।

কিন্তু সমস্তরকম সরকারি হুমকি ও রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে কলকাতায় প্রায় ৫০ হাজার কর্মচারীদের দৃপ্ত মিছিল এসপ্ল্যানেড ইস্টে উপস্থিত হয়ে দেখলেন বিশাল এক পুলিশবাহিনী কর্মচারীদের উপর আক্রমণ চালানোর জন্য লাঠি-বন্দুক-কাঁদানে গ্যাস নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে। এতদ্‌সত্ত্বেও প্রায় দুঘণ্টা ধরে কর্মচারীরা পুলিশি জুলুমের বিরুদ্ধে তুমুল বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে নেতৃত্ব এই মিছিল শহীদ মিনারে নিয়ে যায় এবং সেখানে অনুষ্ঠিত বিশাল সমাবেশে ঘোষিত হয় আট দফা দাবিতে ১৬ই মে-র ধর্মঘট।

এই ধর্মঘটের দাবিদাওয়ার মধ্যে ছিল বেতন কমিশনের ব্যয়সাপেক্ষ কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘভাতা প্রদান, সার্ভিস কন্ডাক্ট রুলস্‌ বাতিল, বরখাস্ত কর্মীদের পুনর্বহাল, ছাঁটাই ও অটোমেশন বন্ধ প্রভৃতি। সারা রাজ্যে সর্বত্রই এই ধর্মঘট ব্যাপকভাবে সফল হয়। সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে দু-একটি অঞ্চলে ধর্মঘটের প্রত্যাশিত সাফল্য পাওয়া যায়নি।

এই ধর্মঘটকে বানচাল করতে ব্যাপক সন্ত্রাস সৃষ্টি করা হয়। ধর্মঘটের পূর্বে মুখ্যসচিবের পক্ষ থেকে ঘন ঘন ‘হুমকি সার্কুলার’ দেওয়া হয়। ধর্মঘটের দিন ১৩১জন কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ লক-আপে একাধিক কর্মীর উপর নির্যাতন চলে এবং জড়িয়ে দেওয়া হয় মিথ্যা মামলায়। বেতন কাটা, চাকরিছেদ, ছুটি না মঞ্জুরসহ একাধিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গৃহীত হয়।

কিন্তু কর্মচারীরা এই আক্রমণের সামনে মাথা নত করার পরিবর্তে প্রতিরোধ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। যেখানেই প্রশাসনিক আক্রমণ, সেখানেই কাজ বন্ধ করে কর্মচারী সমাজ বিক্ষোভ দেখালেন। এর ফলে কলকাতা ও জেলার অফিসগুলি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। কর্মচারীদের এই সংগ্রামী মেজাজের কাছে নতি স্বীকার করে কর্তৃপক্ষ অনেক ক্ষেত্রে শাস্তির আদেশ প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। যেমন ১৬ই মে ধর্মঘটে অংশগ্রহণে যাঁদের বেতন কাটা হয়, তা প্রত্যর্পণের আদেশ প্রকাশিত হয়। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন ১৬ই মে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের সংবাদপত্র ‘জনসেবক’-এর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত ন্যক্কারজনক।

(চার)

১৬ই মে-র ধর্মঘটের পর পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত। এই সময়কালে রাজ্য পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। রাজ্যে বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনে জীবন-জীবিকা, গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আক্রান্ত। ১৯৬৮-র ধর্মঘটের পর ১৯৬৯ সালে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রতিষ্ঠা, ১৯৭০-৭৭-এর সন্ত্রাস, ১৯৭৭ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকার এবং ২০১১ সাল থেকে রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার গঠিত হয়েছে। এই সমগ্র পর্বের ঘটনাবলি পর্যালোচনা করলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। প্রথমত রাজ্যের গণআন্দোলনের উত্থান-পতনের সাথে মধ্যবিত্ত রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের আন্দোলন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাজ্যের গণআন্দোলনের তরঙ্গশীর্ষে সাফল্যমণ্ডিত হয়েছে কর্মচারী আন্দোলন এবং অর্জিত হয়েছে তাদের দাবিদাওয়া। দ্বিতীয়ত অনুকূল এবং প্রতিকূল রাজ্য রাজনীতিও প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে রাজ্য কর্মচারীদের দাবিদাওয়া অর্জনে সহায়ক বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা চলে যে, ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৭, ১৯৭০-৭৭-এর কংগ্রেসী শাসন এবং বিগত সাত বছরের তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনে রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা সর্বাধিক বঞ্চিত এবং উৎপীড়িত হয়েছে। অন্যদিকে দু-দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকার এবং ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারের শাসনকালে ধর্মঘটের অধিকারসহ পূর্ণ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার যেমন অর্জিত হয়েছে, তেমনই কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘভাতা প্রদান, বেতন কমিশনের সুপারিশ গ্রহণ, অনিয়মিত কর্মচারীদের নিয়মিতকরণ, মৃত কর্মচারীর পোষ্যের চাকরি, উন্নত ধরনের অবসরকালীন সুযোগসুবিধা অর্জন প্রভৃতির ন্যায় দাবি অর্জিত হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বলা যায় রাজ্য কর্মচারীদের ধর্মঘট, গণছুটির ন্যায় সংগ্রামের কর্মসূচিগুলির অন্তিম লক্ষ্য হলো রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ও তা কর্মচারী তথা জনগণের পক্ষে নিয়ে আসা। ১৯৬৬ সালের গণছুটির পর ১৯৬৭ সালের প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার এবং ১৯৬৮ সালের গণছুটির পর দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন কোনও কাকতালীয় বিষয় ছিল না। সুতরাং বর্তমান রাজ্যের শ্বাসরোধকারী পরিস্থিতির পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ধর্মঘটসহ উন্নত ধরনের সংগ্রামী কর্মসূচি প্রয়োজন। ১৯৬৮ সালের ১৬ই মে-র ধর্মঘট এই শিক্ষাই দেয়।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement