সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দার প্রশ্ন,
‘ভোটের কার্ডখান কি ধুইয়া জল খাইম?’

নিজস্ব সংবাদদাতা   ১৭ই মে , ২০১৮

মাথাভাঙা, ১৬ই মে— সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দারা জীবনের প্রথম পঞ্চায়েত ভোট না দিতে পারার জন্য শাসকদলের বিরুদ্ধেই প্রতারণার অভিযোগ করছেন। ২০১৫সালের ৩১শে জুলাইয়ের পর এবারই প্রথম পঞ্চায়েত ভোট দেবার কথা ছিল পোয়াতুরকুঠি, মশালডাঙা, করলা, ফলনাপুরসহ ৫১ভূখণ্ডে বাস করা নাগরিকদের। ভোটে দাঁড়ানো বা ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে এই নব্য ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে উত্তেজনাও কম কিছু ছিল না। পোয়াতুরকুঠির হাসান আলির বক্তব্য, ভোটের দিন ঘোষণার পরই বদলাচ্ছিল ছবিটা। তৃণমূলের থেকে প্রার্থী  করা হয় সালিনা বিবিকে। আর কারোকে ভোটে দাঁড়াতেই দেওয়া হয়নি পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতির আসনে। ভোট ছিল শুধু জেলাপরিষদের।

প্রথমবারের পঞ্চায়েত ভোটের অভিজ্ঞতা কেমন? জানতে চেয়েছিলাম মাঝবয়সী সেরিনা বিবির কাছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে চাপা গলায় বললেন, বুথে লাইনে দাঁড়িয়ে  ভেতরে ঢোকার পর, একজন কালি লাগিয়ে দিল আঙ্গুলে । আর টিপছাপ নিল। তারপর আমাকে বাড়ি চলে যেতে বলল। এখানে নাকি পঞ্চায়েত ভোট অন্য কেউ দিয়ে দিতে পারে। বলে হাতের আঙুলে কালির ছাপ দেখিয়ে এক মুখ ঘোমটা টেনে দ্রুত চলে গেলেন।

ভোট দেওয়া হয়ে ওঠেনি দিনহাটা, মাথাভাঙা আর হলদিবাড়ি এলাকার অস্থায়ী আবাসনে থাকা বাংলাদেশ থেকে আসা নব্য ভোটারদেরও। কেউ বা ভোটের কালি হাতে লাগাতে পেরেছেন কেউ বা বুথ অবধি যেতেই পারেননি। নব্য ভারতীয়দের জীবনের প্রথম পঞ্চায়েত ভোটটাই লুট করে নিয়েছে শাসকদল। ছিটমহলগুলি ভারতের মানচিত্রের অভ্যন্তরে আসার পর প্রায় ১৫০০০ মানুষের জীবিকার কোন ব্যবস্থাই করেনি সরকার। মেলেনি নিজের জমির কাগজ। আর সেই কারণেই এসব এলাকার বেশিরভাগ যুবক কাজের সন্ধানে চলে যান ভিন রাজ্যে। পঞ্চায়েত ভোট দিতে ফলনাপুরের সুরেশ বর্মণ ও তাঁর তিন বন্ধু কেরালা থেকে ভোট দিতে এসেছিল বাড়িতে। ভোটের দুদিন পর সুরেশ জানাল, ভোট দিতে এসে কোন লাভ হলো না। আমাদের ভোট ওরা দিয়ে দিল। শুধু শুধু কাজ বাদ দিয়ে বাড়ি এসেছিলাম ভোট দিতে। এরপরই পালটা জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা! এটা প্রতারণা নয় কী ? নব্য ভারতীয় যুবক সুরেশের এই প্রশ্নের উত্তর যার দেবার কথা সেই নির্বাচন কমিশনার তো বধির হয়ে বসে শাসকের আনুগত্য পালন করছে।

কোচবিহার জেলার সঙ্গে যুক্ত হওয়া সাবেক ছিটমহলগুলিতে সাধারণ মানুষ ভোট দিতে না পারার যন্ত্রণায় ফুঁসছেন। পাশাপাশি চাপা আতঙ্কও আছে রহমান আলি ও সুলেখা বিবিদের। শাসকদলের লোকেরা বাড়ি এসে হুমকি দিয়ে গেছে, ভোটের বিষয় নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা করলে পঞ্চায়েত থেকে ১০০ দিনের কাজ মিলবে না। তাই ওদের মত অনেকেই জীবনের প্রথম পঞ্চায়েত ভোট লুট হতে দেখেও চুপ করে আছেন। ফলনাপুরের ৭০ পেরিয়ে যাওয়া সুবোধ বর্মণ শুধু বললেন, হামারলার ভোটের কার্ডখান ধরি যাউক সরকার। ভোট যদি দিবার না পাই ভোটের কার্ডখান কি ধুইয়া জল খাইম?

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement