পাহারায় সশস্ত্র দুষ্কৃতী,
পুলিশ কর্তারা ফাঁকা বুথে
চলছে একটানা ‘রোল কল’

মণিরুল হক   ১৭ই মে , ২০১৮

উলুবেড়িয়া : ১৬ই মে— পুরো গ্রাম শুনশান। কোথাও কোনও লোকজন চোখে পড়ছে না। বাইক নিয়ে বুথের কাছে পৌঁছালাম। গুদার প্রাথমিক স্কুলের বুথের সামনে পুলিশ চোখে পড়ল। আর বেশ কিছু মানুষের জটলা দেখলাম। বাইক স্ট্যান্ড করে বুথের সামনে এগিয়ে যেতেই চক্ষু চড়কগাছ। এ কী ভোট!

বাইরে থেকে শব্দ কানে আসছে। ভোটারবিহীন বুথে ভোটকর্মী ভোটার লিস্ট ধরে নাম ডাকছেন। আর তারপর সেই নাম ধরে ব্যালট এনে ছাপ দিয়ে ফেলা হচ্ছে বাক্সে। এ যেন ফাঁকা ক্লাসে ‘রোল কল’। বুথের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ভীষ্মচাঁদ ঠাকুর, উলুবেড়িয়ার এস ডি পি ও রানা মুখার্জি ও উলুবেড়িয়া থানার আই সি শুভ্রজিত মজুমদার। সাথে কয়েকশো পুলিশ ও র‌্যাফ।

দূর থেকে সাধারণ মানুষের জটলা বলে যেটা ভেবেছিলাম সেটা আসলে গুন্ডাদের ভিড় ছিল। কারোর হাতে বন্দুক, কেউ খোলা তরোয়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশের সামনে ওইভাবে দাঁড়াতে দেখে তাজ্জব হয়ে গেলাম।

বুথের কাছে যেতে এরপর পিস্তল হাতে এগিয়ে এল একজন। বলল, ‘কোনও ছবি তোলা যাবে না, ক্যামেরা ব্যাগে ঢোকা’। পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তারাও সায় দিল তাদের কথায়। বলল, ‘বুথের ছবি তুলে বেকার কি হবে’। ভেতরে তখন চলছে দেদার ছাপ্পা। তৃণমূল জেলা পরিষদের প্রার্থী অজয় মণ্ডল ভেতরে বসে আছেন। দেদার ছাপ্পা দিচ্ছে দুই যুবক। আর প্রিসাইডিং অফিসার ফাঁকা ক্লাসে ‘রোল কল’ করেই চলেছেন।

‘হাত ঘষো বারে বারে, ফ্যানা তোলো মন ভরে’। উলুবেড়িয়া ১নং ব্লকের বহিরা গ্রাম পঞ্চায়েতের গুদার প্রাথমিক স্কুলের দেওয়ালে লেখা শিশুদের উদ্দেশ্যে শিক্ষনীয় বার্তা। শিশুদের এই বার্তাকেই সারাদিন ধরে অক্ষরে অক্ষরে পালন করল তৃণমূল। তবে নিজেদের মতো করে। ‘হাত ঘষো বারে বারে, ভোট দাও মন ভরে’।

উলুবেড়িয়ার গুদার প্রাথমিক স্কুলের ৫০ নম্বর বুথ। সোমবার ভোটের দিন তৃণমূলের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে গ্রামবাসীরা। বিকালে এই বুথে ভোট লুট করতে আসে তৃণমূল দুষ্কৃতীরা। গ্রামবাসীদের সাথে বিরাট সংঘর্ষ হয়। গ্রামবাসীদের প্রবল প্রতিরোধে বুথ ছেড়ে পালায় তৃণমূলীরা। কিন্তু যাওয়ার আগে ব্যালট বাক্সগুলি ভেঙে দিয়ে যায়। ফলে এই বুথে পুনরায় নির্বাচন ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। বুধবার ছিল এই বুথের নির্বাচন। সকাল থেকে বুথ দখলের চেষ্টা করে আশপাশ থেকে জড়ো হওয়া তৃণমূল দুষ্কৃতীরা। তাদের সকলেরই হাতে ছিল বোমা ও রিভলভার। দুই পক্ষের মারামারিতে কয়েকজন আহত হয়। বাড়ি ও দোকান ঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এরই মাঝে গ্রামবাসীরা বহিরাগত এক তৃণমূল দুষ্কৃতীকে ধরে ফেলে। পরে পুলিশ এসে ঘটনাস্থল থেকে গ্রামবাসীদের ফাঁকা করে দিলেও বুথের দখল নেয় দুষ্কৃতীরা। কিন্তু বহিরাগত তৃণমূল দুষ্কৃতী থাকে গ্রামবাসীদের দখলে।

গ্রামবাসীদের গোপন ডেরায় ধৃত তৃণমূল দুষ্কৃতী পুলক ঘোড়ুই জানিয়েছে, ভোট শুরু হওয়ার পর থেকেই বুথ দখলের ছক কষা হয়েছিল। সেই কারণে বিভিন্ন জায়গা থেকে বোমা ও পিস্তল নিয়ে দুষ্কৃতীদের জড়ো করে তৃণমূল। কাদের কথায় এখানে এসেছে ? এই প্রশ্নের উত্তরে সে তৃণমূলনেতা পুলক রায়, আব্বাসউদ্দিন খাঁ ও আকবর শেখের নাম নেয়।

পুনর্নির্বাচনের একই চিত্র দেখা গেল জেলার বেশিরভাগ ব্লকেই। উলুবেড়িয়া ১নং ব্লকের ৯টি বুথের সব জায়গায় বিরোধী এজেন্টকে বসতে দেওয়া হলো না। ভোটার শূন্য বুথে দাপিয়ে বেড়ালো তৃণমূলীরা। উলুবেড়িয়া ২নং ব্লকের ৯টি মধ্যে ৭টিতে মোটামুটি ভোট হলো স্বাভাবিক। ২টিতে বিরোধী এজেন্ট বসতে পারেনি। বাগনান ১নং ব্লকের ২টি বুথেও একই চিত্র। বাগনান ২নং ব্লকের বীরকুলে বিরোধীশূন্য গ্রামে শুধু ভোট দিল তৃণমূলীরা। শ্যামপুর ১নং ব্লকের ৫টি বুথের ৪টিতে হলো দেদার ছাপ্পা। আমতা ২নং ও পাঁচলার ১টি বুথে ভোট মোটামুটি শান্তিপূর্ণ।

অন্যদিকে, মঙ্গলবার রাতে বাগনানের নওপাড়ায় দিনমজুর বরজাহান মল্লিকের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় তৃণমূল। আগুনে ভস্মীভূত হয় গোটা বাড়ি। সোমবার এই বুথে ভোট লুট করতে বাধা পায় তৃণমূল।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement