প্রিসাইডিং অফিসারের ডায়েরি

কাশ্যপ ভট্টাচার্য   ১৭ই মে , ২০১৮

রাত ১০টা, ডাউন নৈহাটি লোকাল। পানপুর থেকে ঐ ট্রেনে করে ঘরে ফিরছেন দলে দলে ভোটকর্মী। ওদের গত ৪০ ঘণ্টা পরিচয় ছিল প্রিসাইডিং, ফার্স্ট পোলিং, সেকেন্ড পোলিং, থার্ড কিংবা ফোর্থ, ঠিকানা ছিল এক অচেনা, অজানা লোকালয়ের স্কুলঘর, কিংবা ক্লাবঘর, কিংবা খিচুড়ি স্কুল, চানঘর ছিল কুয়োতলা কিংবা টিউবওয়েল — শৌচাগার? প্রশ্নচিহ্ন জবাব হয়নি অনেক জায়গায়। খাদ্য মুড়ি, বিস্কুট, বাদাম, চা — কপাল ভালো হলে ডাল ভাত। ৪০ ঘণ্টার চরম অনিশ্চয়তার শেষে এবারে ফেরা চেনা ছকে। ওদের মতো রাজ্যের পঞ্চায়েত নির্বাচনের কাজে অংশ নেওয়া সব বুথের ভোট কর্মীদের চিত্র বিচিত্র অভিজ্ঞতার লেশমাত্র মিলবে না সরকারি দপ্তরের ঐ প্রিসাইডিং অফিসারের ডায়েরি নামের দুই পাতার জরুরি ফরমটিতে সেখানে শুধুই ‘না’ এর বন্যা, ‘না’ শব্দটা প্রমাণ করবে গণতন্ত্র জীবিত। কিন্তু ১৪ই মে, ২০১৮ গণতন্ত্র খুন হয়ে গেছে। সেই কথার প্রমাণ ঐ ডায়েরিতে নেই। আছে ভোটকর্মীদের হৃদয়ের ডায়েরিতে। সেই ডায়েরিতে আছে বহু বেদনার চিত্র। বহু যন্ত্রণার অলিখিত জবানবন্দি।



একজন বলছেন — মেয়েরা এত গাল দিতে পারে আগে জানতাম না। গ্রাম পঞ্চায়েতের মহিলা প্রার্থী সকাল থেকে শুধু গাল দিয়ে গেল। বিস্তারিত বিবরণীতে প্রকাশ — ধাপে ধাপে প্রার্থী তাঁর জবানবন্দিতে — বিরোধী প্রার্থী তার এজেন্ট, কিছু ভোটার এবং বিকাল পাঁচটার পর সকল ভোটকর্মীদের পরিবারের মেয়েদের দেহ ব্যবসায় নামিয়েছেন, তুলেছেন আবার নামিয়েছেন। শেষে রাত ৮টাতেই পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য এলাকার উন্নয়নের অনুপ্রেরণা হবার নিশ্চয়তা পাবার পর হাসিমুখে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। ঠান্ডা পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করেছেন। এক অঙ্গে এত রূপ দেখে ভোটকর্মীরা কখনও স্মরণ করেছেন রবীন্দ্রনাথকে, কখনও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়কে।



ব্লক বাদু‌ড়িয়া — গ্রাম নারকেলবেড়িয়া — তিতুমীরের গ্রাম — টের পেয়েছেন প্রিসাইডিং অফিসার, আগের রাত থেকে বাঁশ, আমকাঠ, আর বন্দুকের লড়াই, লড়াই বাইরে, ভিতরে তাই নেই কোনও ভোটার। ভোটদানের হার ৯৫ শতাংশ। আসলে ভোট দিয়েছেন একটি দলের জনাচারেক সদস্য। হিসাব করে ব্যালট নিয়েছেন, ভোট দিয়েছেন, আর ভোটকর্মীরা নীরব দর্শক, কারণ তাদের সামনে যারা হাজির তাদের বুথের ভিতরে নিরাপত্তা দিচ্ছে জনাচারেক বন্দুকধারী আর বাইরে শতখানেক বাঁশধারী। বিপরীতে সরকারি কর্মীদের জন্য এক পুলিশ আর এক সিভিক ভলান্টিয়ার, আর তার সুবাদেই তিন বাক্স ভর্তি ব্যালট পেপার আর গ্রামের ভোটার সব নিজেদের ঘরে ঘরে। এই হলো ভোট করানো — রাজনৈতিক অতিসক্রিয়তা।



ব্লক হাবড়া — ২। ভোট নিতে গিয়েছিলেন পঞ্চপাণ্ডব — প্রিসাইডিং সমেত পাঁচজন। পরের দিন কি হতে পারে তার আঁচও পাওয়া যায়নি। বড় মিষ্টি আলাপচারিতা। সকাল থেকে বুথের ভিতরে ও বাইরে অন্য ছবি। প্রথমে উত্তেজনা, কথা কাটাকাটি, ধাক্কাধাক্কি, লাঠালাঠি, দৌড় এবং পালটা দৌড়, বোমার লড়াই। এবারে প্রিসাইডিং অফিসার এস এম এস করলেন টি এল, মানে আইন শৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে। পুলিশ এল, কিছুটা অবস্থা শান্ত হলো। তারপর প্রিসাইডিং-এর মোবাইল ডুব দিল সামনের ডোবায়। এক এক করে বাকিদের মোবাইল কোনোটা মেঝেতে, কোনোটা দেওয়ালে মেরে ভাঙা হলো। অপরাধ পুলিশ ডাকা, প্রাণের দায়ে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সেখানেই ভোট নিয়ে অশোকনগর স্কুলে যখন ভোটকর্মীরা এলেন তখন তাদের শরীরে ও মনে কেবলই স্বস্তি। কি হয়েছে? ফোন গেছে আবারও হবে। প্রাণ তা বেঁচেছে — প্রাণ আছে তাই মান আছে — নেই রাজ্য থেকে নৈরাজ্যে নামিয়ে নিতে নিতে এটাই তো আশার আলো। যুদ্ধ শেষে আপনজন বিয়োগে কাতর পাণ্ডবদের একটাই শান্তি যু্দ্ধ শেষ — আর ডি সি আর সি-তে এসে একালের পঞ্চপাণ্ডবের একটাই স্বস্তি ভোট তো শেষ। যাক না মোবাইল। ওটা আবার হবে।



নাম — বিভা ঘোষ, সামনে দাঁড়িয়ে এক দাড়ি গোঁফওয়ালা ছেলে। উনি বিভা ঘোষের ছেলে। উনি নিজে আসেন না। ছেলে ওনার হয়ে ভোট দেয়। এরপর জয়া ঘোষ - আবারও ছেলে — ইনি জয়ার দাদা। জয়া কলেজে পড়ে। বাচ্চা মেয়ে, ভোট দিতে পারবে না। দাদা দেবে। নাম সন্ধ্যা হালদার — ইনিও ছেলে — সন্ধ্যার স্বামী। বাচ্চা বাড়িতে কাঁদছে — ভোট দিতে এসেছিল। চলে গেছে। স্বামী দেবে। আপত্তি করছেন? আপনার কি? আমাদের এখানে এরকমই হয়। ১৮-৮০ মহিলার ভোট পুরুষরাই দিয়ে দেয়। কখনও মহিলারা ভোট কেন্দ্রে আসেন — অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসেন না। মেয়েরা ভোট দিতে আসলে রান্না কে করবে? আবারও আপত্তি করছেন? আমার স্ত্রীর ভোট মানে তো আমারই ভোট। আমি সেটা দেবই। রাজনৈতিক দলের এজেন্ট বলছেন আমাদের আপত্তি নেই — ৪০ ঘণ্টার জন্য নতুন কোনও গ্রাম বা লোকালয়ে গিয়ে ভোটকর্মীর আর প্রতিবাদের সাহস হয় না।



একটি ছেলে কিংবা একাধিক ছেলে, কখনও সে প্রতাপ কখনও ভূধর, কখন জয়া, কখনও সীমা, কখনও দিলীপ — ৪৫ থেকে ৫০টি চরিত্র বদল কিংবা নাম বদল করে একই মানুষের আনাগোনা — রসিক ভোটকর্মীর মন্তব্য — ‘বাবু তুমি ১০৮টি ভোট দাও — ১০৮টা নাম হবে — আর শ্রীকৃষ্ণ হয়ে যাবে। বিষ্ণুত্ব অর্জনের এ সুযোগ ছেড়ো না।’’ রসিকতার জবাব অশ্রাব্য গালিগালাজ। এটাই গণতান্ত্রিক প্রহসন — দিন শেষে শহীদ গণতন্ত্র, চিকিৎসক ‘উন্নয়ন’ মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তাররা। ডোম বাহুবলী সিং।



শব্দটা সন্দেশ — খবর থেকে হয়ে গেছে মিষ্টি। আগামী দিনে ‘উন্নয়ন’ শব্দটা তার অর্থনৈতিক আমেজ হারিয়ে হয়ে যাবে গুন্ডামি, গাজোয়ারি। অর্থনীতির ছাত্রছাত্রীদের কোনও নতুন শব্দ তৈরি করতে হবে। এই ‘উন্নয়ন’ এর জেরে রাজ্যের ৩৪ শতাংশ বুথে কোনো ভোট হয়নি। কিছু কর্মী বেঁচে গেছেন, বাকিদের বাধ্য হয়ে যেতে হয়। এই যাওয়ার সময় সঙ্গী হয় চিন্তা, উদ্বেগ আর বিরক্তি, কারণ অভিজ্ঞতা কেবলই বিপদের বার্তা দেয়, আর একেবারে অচেনা স্থানে যাবার জন্য যে উৎকণ্ঠা থাকে তা তো চিরপরিচিত। একটি নির্বাচন মানে কমবেশি ৬০০ থেকে ১০০০ লোকের ভোটগ্রহণ — প্রায় ৬৭টি ফরম পূরণ —একটিরও এদিক ওদিক হলে ডি সি আর সি‍‌-তে নিশিযাপন। সব শেষ করে যখন ভোটকর্মীরা ডি সি আর সি-র বাইরে তখন রবীন্দ্রনাথের অচলায়তনের শেষ দৃশ্য। নতুন করে বাঁচার আনন্দে মাতোয়ারা ভোটকর্মীরা।



রাত দশটা। স্থান অশোকনগর স্কুল। দুইজন ভোটকর্মী হাসিতে মগ্ন। কি ব্যাপার? শাসকদল আর তার গোঁজের লড়াই। সকালে শাসকদল ছাপ্পা দিয়েছে, বেলা ১২টায় গোঁজ দলবল নিয়ে হাজির। ব্যালট বাক্স নিয়ে চম্পট। ভোট করতে হয়নি। ফরম পূরণ করতে হয়নি। সন্ধ্যায় ডি সি আর সি-তে এসে হাজিরা দিতে হয়েছে। চলেছে শুনানি — দফায় দফায়, তারপর ছুটি পাবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তাই এত হাসি, এত আমোদ।



নতুন স্থানে, নতুন মানুষ — চেনা অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি, ঠাকুর্দা চাষি, বাবা ভাগে চাষ করান, নিজে দোকানদার, এক ছেলে বি এস এফে চাকরি করে, অন্যজন বি কম পড়ে। বাবার বক্তব্য — ‘‘ছেলেরা কি চাষ করবে? তবে লেখাপড়া শেখালাম কেন?’’ কিন্তু কি কাজ করবে? কাজ কোথায়? হতাশা আছে, সেই হতাশা ঠেলে দিচ্ছে ভুল পথে। এম এ পাশ ছেলে দুষ্কৃতীদের দলে নাম লেখায়। মনে পড়ছিল ২০১১-র আগে এই প্রশ্নের সদর্থক জবাব অনুসন্ধানের জন্য, কাজের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করার জন্য যখন চেষ্টা চলেছে তখনই নেই রাজ্য বানানোর তাগিদে নৈরাজ্য ঘা দিয়েছে। আর আজ নৈরাজ্যের অপরিসীম অন্ধকারে নিমজ্জিত রাজ্য। অভিজ্ঞতা দেওয়া নেওয়ার এই চিত্রও রয়েছে হৃদয়ের ডায়েরিতে।



নদীয়ার নাকাশিপাড়া ব্লক — গ্রামসভায় প্রার্থী আপন ভাগনে বউ। মামা এসেছেন ভোট দিতে। ভোট তো হয়ে গেছে সকালেই। প্রতিবাদী মামাকে শান্ত করতে উদ্যত ভাগনে। সে সময় মামাকে লক্ষ্য করে বাঁশের আঘাত। নিমেষে রক্তাপ্লুত মামা—মাথায় তিনটে স্টিচ নিয়ে মামা রাস্তায়—রাত ৭টা—প্রিসাইডিং সহ সকলে ফেরার জন্য ম্যাটাডোরে উঠবেন। মামার প্রশ্ন—তাহলে এবারে আর আমাকে আপনারা ভোট দিতে দিলেন না? জবাবহীন প্রিসাইডিং অফিসার।



নদীয়ার রানাঘাট ব্লক-১। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গ্রাম। গত বিধানসভা নির্বাচনেও সরকারি দল গ্রামে বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। বুথে সকাল থেকে হাজির বিরোধী দলের এজেন্ট। নানা অনিয়মের প্রতিবাদ হচ্ছে। উত্তেজনা বাড়ছে। সকাল ৯টা। একদল ভোটার ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত ভোট দেওয়া শেষ—এবারে তাদের লক্ষ্য সেই এজেন্ট। চারজন ঠান্ডা মাথায় কোনও উত্তেজনা না দেখিয়ে বেধড়ক মারতে মারতে এজেন্টকে নিয়ে যাচ্ছেন। এক প্রিসাইডিং ছুটে গেছেন—ধাক্কা খেয়ে মাটিতে। প্রতিবাদী ভোটকর্মীরা সামান্যসময় ভোট বন্ধ রাখলেও পরে উপরওয়ালাদের নির্দেশে ঐ যন্ত্রণা নীরবে হজম করে বাড়ি ফিরেছেন। পুলিশ সেক্টরের পরামর্শ—‘‘স্যার স্রোতের উলটোদিকে যাবেন না। বিপদ হলে আমরা রক্ষা করতে পারব না।’’ এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচন ঐতিহাসিক হয়ে রইল হোমগার্ড, সিভিক ভলান্টিয়ার দিয়ে প্রশাসনিক সুরক্ষার জন্য যা নিঃসন্দেহে বিঘ্নিত করল গোটা ভোট প্রক্রিয়া।



কোনও চরিত্র কাল্পনিক নয় — নয় কোনও ঘটনাও। হাবড়ার গ্রামের এক বুথ, ৮৬ বছরের নিভাননী এসেছেন নাতির কো‍‌লে চড়ে। এসেছেন ৭৮ বছরের লক্ষ্মীমণি—সম্পর্কে ননদ বৌদি; দেখা চার বছর পর। দুজনেই নানা রোগে আক্রান্ত। গৃহবন্দি, ভোটকেন্দ্র দুজনকে মিলিয়েছে, এসেছে চোখের জল, আলিঙ্গন—বাইরে বসে দু-চারটে কথা—একরাশ পরিতৃপ্তি। এসব ঘটনা আগে ছিল নিয়মিত। ভোট মানে ছিল মিলনমেলা—আড্ডা—এখন ভোট মানে রক্ত, হিংসা, হানাহানি। তবুও বিকল্প ধরার এই পরিতৃপ্তির ছবিও রয়ে গেল আসল প্রিসাই‍‌ডিং অফিসারের ডায়েরিতে।



গণতন্ত্র খুন হয়েছে। সেটা সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেছেন ভোটকর্মীরা। যন্ত্রণা সেটা সরকারিভাবে জানালে হাজারো ঝক্কি। কাজেই গোপনে নিজেদের হাতে গায়ে গণতন্ত্রের দেহ থেকে বেরিয়ে আসা রক্ত মুছে আবারও আরেকটা নির্বাচনের ডিউটি করার দুঃস্বপ্ন দেখার শুরু। সেই সঙ্গে এই অন্ধকার থেকে বের হবার বিকল্প পথের দিশা খোঁজার চেষ্টা শুরু। শুরুতো করতেই হবে—কারণ অন্ধকার শেষ কথা বলে না।

=============================

সকাল থেকে বুথের ভিতরে ও বাইরে অন্য ছবি। প্রথমে উত্তেজনা, কথা কাটাকাটি, ধাক্কাধাক্কি, লাঠালাঠি, দৌড় এবং পালটা দৌড়, বোমার লড়াই। এবারে প্রিসাইডিং অফিসার এস এম এস করলেন টি এল, মানে আইন শৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে। পুলিশ এল, কিছুটা অবস্থা শান্ত হলো। তারপর প্রিসাইডিং-এর মোবাইল ডুব দিল সামনের ডোবায়। এক এক করে বাকিদের মোবাইল কোনোটা মেঝেতে, কোনোটা দেওয়ালে মেরে ভাঙা হলো। অপরাধ পুলিশ ডাকা,

Featured Posts

Advertisement