বাজ পড়ে ৮ জনের মৃত্যু

গুমোট কাটিয়ে স্বস্তির বৃষ্টি

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৭ই মে , ২০১৮

কলকাতা, ১৬ই মে— গুমোট গরম কাটিয়ে স্বস্তির বৃষ্টি জেলায় জেলায়। কিন্তু হালকা থেকে ভারী বৃষ্টির মধ্যে দক্ষিণবঙ্গে দেদার পড়তে থাকা বাজে বুধবার অন্তত ৮ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। নদীয়ার চাপড়ায় একসঙ্গে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। বসিরহাট, বাঁকুড়া, হাওড়ায় বজ্রাঘাতে মারা গিয়েছেন চারজন।

প্রবল ঝড়বৃষ্টি থেকে বাদ যায়নি শহর কলকাতা। দুই ২৪পরগনার কিছু বিক্ষিপ্ত এলাকা ছাড়া দক্ষিণবঙ্গের সর্বত্র এদিন ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি হয়েছে। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ প্রায় অন্ধকার হয়ে যায় কলকাতার বিস্তীর্ণ অংশ। সঙ্গে বইতে থাকে ঝোড়ো হাওয়া। এরপরেই শুরু হয় যায় ভারী বৃষ্টি। জেলাতেও অনেকটা তাই। তবে দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় বৃষ্টির সঙ্গে প্রবল ঝড় হয়েছে। রবিবারই দক্ষিণবঙ্গে বর্জ্রাঘাতে অন্তত ১২জনের মৃত্যু হয়েছে।

এদিন অবশ্য সকাল ১০টা নাগাদ আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে জানানো হয়েছিল কয়েকঘণ্টার মধ্যে বজ্রবিদ্যুৎসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা। উপগ্রহ চিত্রে এই ইঙ্গিত পাওয়ার পরেই সতর্কতা বার্তার সঙ্গে একথা জানায় হাওয়া অফিস। ওই পূর্বাভাসে বলা হয় দক্ষিণবঙ্গের কিছু জেলায় ঘণ্টায় ৩০-৪০কিলোমিটার গতিবেগে ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কলকাতা ছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ঝোড়ো হাওয়ার দাপটের কথা বলা হয়। সতর্কতার মধ্যে ছিল হাওড়া, হুগলী, পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪পরগনাসহ রাজ্যে বিভিন্ন এলাকা। হাওয়া অফিসের কথা এদিন অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে। দক্ষিণবঙ্গের কোথাও কোথাও ঘণ্টায় ৪০-৫০কিলোমিটার গতিবেগ পর্যন্ত ঝড় বইতে দেখা গিয়েছে।

কলকাতাতে দেরিতে বৃষ্টি শুরু হলেও এদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি শুরু হয় হাওড়া, হুগলী, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন অংশে। সঙ্গে চলে ঝোড়ো হাওয়া। ওই জেলাগুলির পাশাপাশি পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুরের মতো রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতেও ব্যাপক ঝড়বৃষ্টি হতে দেখা গেছে। বৃহস্পতিবারও গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

নদীয়া, পুরুলিয়া ছাড়াও দুই ২৪ পরগনা, হুগলী, হাওড়ার বেশ কিছু এলাকায় দফায় দফায় বৃষ্টি হয়েছে। শুধু জেলা নয়, শহর কলকাতার বেশ কিছু জায়গাতেও কয়েক মিনিটের ঝড়বৃষ্টিতে বিপত্তি তৈরি হয়েছে। মানিকতলা এলাকায় রাস্তায় গাছ পড়ে বেশ কিছুক্ষণ ব্যাহত ছিল যান চলাচল। তার ছিঁড়ে বিচ্ছিন্ন হয় বিদ্যুৎসংযোগও। পরে প্রশাসনের তরফে গাছ কেটে রাস্তা পরিষ্কার করা হয়।

বাঁকুড়ায় এদিন সকালে মাঠে কাজ করার সময় বজ্রপাতে প্রাণ হারান সারেঙ্গার দেবগ্রামের প্রান্তিক কৃষক কার্তিক সোরেন (৫৮)। এদিন সকাল ৯টা নাগাদ ঘটনাটি ঘটে। আকাশ কালো করে বৃষ্টি শুরু হলেও কার্তিক সোরেন জমিতে লাঙল দেওয়ার সময় বাজ পড়ে।

বাজের শব্দ শুনে স্থানীয়রা ছুটে এসে দেখেন মাঠের মধ্যে বেহুঁশ অবস্থায় পড়ে রয়েছেন কার্তিক সোরেন। গুরুতর জখম কার্তিক সোরেনকে সারেঙ্গা ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

বসিরহাটে বাজ পড়ে বুধবার সকালে এক ছাত্রসহ দুইজনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। প্রথম ঘটনাটি ঘটেছে উত্তর ২৪পরগনার স্বরূপনগর থানার সগুনা গ্রাম পঞ্চায়েতের শাকদহ গ্রামে। নিহত ওই ছাত্রের নাম আলফাজুল গাজি (১৭)।

এলাকা সূত্রে জানা গিয়েছে, এদিন সকাল ১০টা নাগাদ বাড়ির অদূরে সবজি খেতে বাবার সঙ্গে দেখা করতে গেছিল আলফাজুল। তখনই আচমকা কালো মেঘে ঢেকে যায় গোটা আকাশ। শুরু হয় প্রচণ্ড বৃষ্টি। সেই সঙ্গে বিকট শব্দ করে পড়তে থাকে বাজ। মাঠের পাশে ছুটে আসা বাজের আঘাতে গুরুতর আহত হয় ওই ছাত্র। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। সকালে এই মর্মান্তিক ঘটনায় গোটা গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া।

অন্যদিকে, সন্দেশখালি গ্রামপঞ্চায়েতের টোংতলা গ্রামে একজন বাজের আঘাতে মৃত্যু হয়েছে। নিহতের নাম কার্তিক মণ্ডল (৬৯)। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টোংতলায় কার্তিক মণ্ডলের বাড়িতে এদিন কয়েকজন আত্মীয় এসেছিলেন। দুপুর বারোটা নাগাদ সেই আত্মীয়দের বউঠাকুরানি নদীঘাটে তুলে বাড়ি ফেরার পথেই বজ্রাঘাতের মধ্যে পড়েন ওই ব্যক্তি। ঘটনাস্থলে তাঁর মৃত্যু হয়।

নদীয়ার চাপড়ায় বাজ পড়ে দুইভাই সহ চারজনের মৃত্যু ঘটেছে। আকাশ কালো করে থাকার সময়ে তাঁরা একসঙ্গে পাটখেতে কাজ করছিল বলে জানা গেছে। মৃত্যু হলো দুই ভাইসহ চারজনের।

বুধবার সকালে চাপড়া থানার ন মাইল এলাকায় বি এস এফ ক্যাম্পের পিছনের একটি পাটখেতে দিনমজুরি করতে গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। পাটখেতে কাজে গিয়ে বাজ পড়ে মারা গিয়েছেন ওই চারজন। কালাচাঁদ শেখ (৬০), কামাল শেখ (৫০), নাজিজুল শেখ (৩০) এবং আজিজুল শেখ (২৫)।

সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি শুরু হলে তাঁরা মাঠের পাশে শ্যালো মেসিন রাখার ঘরে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানে আশ্রয় নেওয়ার কিছু সময় পড়েই ওখানে বাজ পড়ে। ঘটনাস্থলেই চারজনের মৃত্যু হয়। এদিনের ঘটনায় বি এস এফ-র জওয়ানরা গুরুতর জখমদের উদ্ধার করে চাপড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণ করেন। বাজে নিহতদের ব্যক্তিদের মধ্যে নাজিজুল এবং আজিজুল দুই ভাই বলে জানা গেছে।

বজ্রাঘাতে কলিঙ্গ গ্রাম পঞ্চায়েতে কাঠগড়া গ্রামের চারজনের মৃত্যুতে গোটা গ্রামে এখন শোকের ছায়া। আসাননগরেও বুধবার সকালে বজ্রপাতে চারজন আহত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। এদিন নদীয়ার বেশ কিছু অঞ্চলে বৃষ্টি তার সাথে বজ্রপাত হয়েছে।

হাওড়ার পাঁচলার শুভয়ার গ্রামের বাসিন্দা উর্মিলা মণ্ডল (৪২) বজ্রাঘাতে মারা গিয়েছেন। এদিন সকালে শুভয়া গ্রামে ঢোলে পাড়ার মাঠে ছাগল বেঁধে ফিরে আসার সময় আকস্মিক বাজ এসে পড়ে তাঁর ওপর। ঘটনাস্থলে মারা যান ওই মহিলা।







Featured Posts

Advertisement