ভোটকর্মী খুনের প্রতিবাদে
বিক্ষোভে উত্তাল রায়গঞ্জ

নিজস্ব সংবাদদাতা   ১৭ই মে , ২০১৮

রায়গঞ্জ ও ফাঁসিদেওয়া, ১৬ই মে— ভোট চলাকালীন খোদ প্রার্থী এমনকি ভোটারকেও শাসকদলের দুষ্কৃতী বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে, সেই ঘটনার অনায়াস সাক্ষী থেকেছে রাজ্য। কিন্তু খোদ বুথ থেকে প্রিসাইডিং অফিসার নিখোঁজ? এবার সেই মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী রইল রায়গঞ্জ।

সোমবার ভোট চলাকালীন বুথ থেকেই অপহরণ। তার ২৪ ঘণ্টা পরে সেই নিখোঁজ প্রিসাইডিং অফিসার, উত্তর দিনাজপুরের দোমোহনার রহটপুর হাই মাদ্রাসার শিক্ষক রাজকুমার রায়ের (৪০) ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ রায়গঞ্জের সোনাডাঙি এলাকায় রেললাইনের ধার থেকে উদ্ধার হলো।

ভোট চলাকালীন নিখোঁজ প্রিসাইডিং অফিসারের দেহ উদ্ধারের এই ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতেও তোলপাড় শুরু হয়। রায়গঞ্জ থেকে ইসলামপুর, কালিয়াগঞ্জ, ফাঁসিদেওয়া দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়ায়, গভীর রাত পর্যন্ত পথ অবরোধে শামিল হন মানুষজন। গোটা ঘটনাকে লঘু করে দিতে প্রিসাইডিং অফিসারের মৃত্যুতে বিক্ষোভকারী ভোটকর্মী, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তোপ দাগে নবান্ন।

নিরাপত্তার দাবিতে বুধবার সকালে রায়গঞ্জের ঘড়িমোড়ে বিক্ষোভে শামিল হন ভোটকর্মীরা। পরিস্থিতি সামলাতে এসে উলটে রায়গঞ্জের মহকুমা শাসক টি এন শেরপা’র বেফাঁস মন্তব্য পরিস্থিতি আরও ঘোরালো করে। প্রিসাইডিং অফিসার আত্মহত্যা করেছে এস ডি ও এই কথা বলার সাথে সাথেই প্রচণ্ড উত্তেজনা বাড়ে। পথ অবরোধে শামিল শিক্ষক এবং রায়গঞ্জে ট্রেনিংয়ে আসা ভোটকর্মীরা। এস ডি ও-কে ঘিরে ধরে শুরু হয় বিক্ষোভ। উত্তেজিত বিক্ষোভকারীদের ভিড়ের মধ্যে থেকে জুতো উড়ে আসে মহকুমা শাসককে লক্ষ্য করে। ভোটকর্মীরাই চিৎকার করে বলতে থাকেন, পুলিশের পোশাক খুলে ফেলুন আপনারা! অতিরিক্ত পুলিশসুপার নিকিতা ফনিংয়ের সামনেই এস ডি ও-কে ঘিরে সেই বিক্ষোভ চলে। যদিও নবান্ন থেকে গোটা ঘটনার দায় এ বি টি এ-র ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। যা আরও ক্ষোভ ছড়িয়েছে ভোটকর্মীদের মধ্যে। রায়গঞ্জ ছাড়িয়ে উত্তেনার রেশ পৌঁছায় শিলিগুড়ি মোড়। সেখানে গভীর রাত পর্যন্ত চলে অবরোধ। রাতে সেই অবরোধ ভাঙতে অবরোধকারীদের চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলে পুলিশ। রায়গঞ্জ, মালদা থেকে তৃণমূলী দুষ্কৃতী বাহিনী পুলিশের সঙ্গেই জড়ো হয় অবরোধ ভাঙতে।

শেষ পর্যন্ত রাত প্রায় দশটা নাগাদ অবরোধ ওঠে শিলিগুড়ি মোড় থেকে। পুলিশ প্রশাসন যদিও শাসক তৃণমূলের অনুগামী বাহিনী হিসাবেই নীরব দর্শকের ভূমিকাতেই ছিল। শেষে শিক্ষক, শিক্ষিকারাই সিদ্ধান্ত নেন অবরোধ আপাতত তুলে নেওয়ার জন্য। কেননা ময়নাতদন্তের শেষে মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হবে ফাঁসিদেওয়ায়। তবে আন্দোলন থামবে না বলেই জানিয়েছেন তাঁরা। বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে ফের আন্দোলন শামিল হবেন তাঁরা।

পঞ্চায়েত নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে খুন হয়ে গেলেন ফাঁসিদেওয়ার করণগছ গ্রামের বাসিন্দা শিক্ষক রাজকুমার রায়, অভিযোগ ফাঁসিদেওয়ার বাসিন্দাদের। উত্তর দিনাজপুরের দোমোহনার রহটপুর হাই মাদ্রাসার তিনি ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। ইটাহার ব্লকের সোনাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪৮নম্বর বুথের প্রিসাইডিং অফিসার হিসাবে গিয়েছিলেন তিনি। ভোটের দিন বিকালের পর থেকে তাঁর আর কোন খোঁজ মেলেনি। জানা যায় বিকালের দিকে বুথের বাইরে বেরিয়েছিলেন তিনি। তারপর আর ফেরেননি। ফোনের সুইচ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বুথ থেকে বের হবার আগে শেষবারের জন্য পরিবারের সাথে ফোনে কথা হয়েছিল। রাত ১২টার মধ্যে বাড়ি ফিরবেন বলে ফোনে পরিবারকে জানিয়েছিলেন তিনি।

দীর্ঘক্ষণ সময় পার হয়ে গেলেও সে ফিরে না আসায় খোঁজ শুরু হয়। ভোটগ্রহণের দিনই মাঝরাতে রাজকুমারের খোঁজে পরিবারের লোকজন ইটাহার ব্লক অফিসে যায়। কিন্তু কোন খোঁজ মেলেনি। মঙ্গলবার সকালে ১০টা নাগাদ ইটাহার থানায় প্রিসাইডিং অফিসার রাজকুমার রায়ের নিখোঁজ সংক্রান্ত বিষয়ে একটি এফ আই আর দায়ের করেন ইটাহার সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক। এরপরেই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রায়গঞ্জের সোনাডাঙি এলাকায় রেললাইনের ধার থেকে ক্ষতবিক্ষত একটি দেহ উদ্ধার হয়। পরে রাতে রাজকুমার রায়ের ভাই ও তাঁর স্কুলের প্রধান শিক্ষক সইদুল রহমান রায়গঞ্জ জেলা হাসপাতালে গিয়ে মৃতদেহটি শনাক্ত করেন।

এই প্রিসাইডিং অফিসারের মৃত্যুতে রায়গঞ্জের ঘড়ি মোড়ে পথ অবরোধ করে সকাল থেকেই বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন কয়েকশো ভোটকর্মী। তাদের দাবি, ওই প্রিসাইডিং অফিসারকে বুথ থেকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে খুনের কিনারা হলো না কেন তার জবাব দিতে হবে। এই জবাব না পেলে বৃহস্পতিবার ভোট গণনার দায়িত্ব তাঁরা পালন করবেন না। জেলা প্রশাসনের তরফেও এই বিষয়ে যথাযথ আশ্বাস মেলেনি। আন্দোলনকারীদের দাবি পর্যাপ্ত পুলিশ ফোর্স এবং সি সি টিভি ব্যবস্থা না করা হলে তাঁর ভোট গণনার কাজেও যুক্ত হবেন না।

আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের দাবি না শুনলেও এদিন জেলাশাসক আয়েশা রানি ও পুলিশসুপার শ্যাম সিংহ সাংবাদিক বৈঠকে দাবি করেন, যে বুথে উনি (রাজকুমার রায়) প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন সেখানে কোনরকম অশান্তি হয়নি। বুথে অশান্তির যে খবর ছড়ানো হচ্ছে তা ঠিক নয়। তবে কী কারণে এই ঘটনা ঘটলো তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জেলাশাসক আয়েশা রানি জানান, গোটা ঘটনার তদন্তভার সি আই ডি-র হাতে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার রিপোর্ট রাজ্য প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মঙ্গলবার প্রশাসনের কাছে জিজ্ঞাসা করার পরেও কেন জানানো হয় যে রাজকুমার রায় ঠিক আছে, তিনি রাতেই বাড়ি ফিরবেন? সাংবাদিকদের এই প্রশ্নে দৃশ্যতই অস্বস্তির মধ্যে পড়েন জেলাশাসক ও পুলিশসুপার। জেলাশাসকের দাবি আমরা তাঁর নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পরে মোবাইলের টাওয়ার লোকেশনে জানতে পারি সেটা রায়গঞ্জে তাঁর বাড়ির কাছাকাছি রয়েছে। সেই কারণে তা বলা হয়েছিল। প্রশাসনের কথাতেও ধোঁয়াশা বেড়েছে এই রহস্য মৃত্যুর ঘটনায়।

পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগে নিহত শিক্ষক রাজকুমার রায়ের স্ত্রী অর্পিতা বর্মণ দাবি করেন, ভোটের দিন রাত আটটার সময় স্বামীর সঙ্গে তাঁর শেষবারের মতো কথা হয়। তারপর থেকে তিনি আর মোবাইলে যোগাযোগ করতে পারেননি। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, স্বামী রাজকুমার রায়কে অপহরণ করা হয়েছিল এবং ঠান্ডা মাথায় তাঁকে খুন করা হয়েছে। পরিবারের তরফে গোটা ঘটনার উপযুক্ত তদন্ত ও দোষীদের কঠোরতম শাস্তির দাবি তোলা হয়েছে। নিহত রাজকুমার রায়ের এক পুত্র সন্তান ও এক কন্যা সন্তান রয়েছে। মেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে ও পুত্রের বয়স মাত্র তিন বছর।

রাজকুমার রায় ফাঁসিদেওয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। নিহত প্রাক্তন ছাত্রের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ফাঁসিদেওয়া স্কুল ছুটি হয়ে যায়। খবর পেয়ে স্কুলের শিক্ষকরা তাঁর বাড়িতে গিয়ে বাবা প্রিয়নাথ রায় ও মা অন্নদা রায়ের সাথে দেখা করেন। বাবা অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। ভাই হেমন্ত রায় খবর পেয়েই রায়গঞ্জ চলে যান। বুধবার ভোরে ছেলের মৃত্যুর খবর আসলেও অনেক পরে বাবা ও মাকে এই দুঃসংবাদ জানানো হয়। কান্নায় ভেঙে পড়েন মৃত শিক্ষকের বাবা ও মা। বছর দুয়েক আগে রায়গঞ্জ শহরে বাড়ি করে স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে আসেন রাজকুমার রায়।

ফাঁসিদেওয়ার করণগছ গ্রামের বাসিন্দা শিক্ষক রাজকুমার রায়কে অপহরণ ও এই মৃত্যুর ঘটনায় তীব্র ধিক্কার জানিয়ে এদিন শিলিগুড়িতে ছাত্র যুবদের মিছিল বের হয়। মিছিল ও ধিক্কার জানান দলমত নির্বিশেষ সর্বস্তরের শিক্ষকরা। ময়নাতদন্তের পরে মৃতদেহ আসার কথা ফাঁসিদেওয়ায়। সন্ধ্যা থেকে শুরু গভীর রাত পর্যন্ত ফাঁসিদেওয়া রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভে শামিল কয়েকশো মানুষ। রাত যত বেড়েছে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে উত্তেজনাও।

অন্যদিকে রায়গঞ্জ ঘড়ি মোড় থেকে এক কিলোমিটার দূরে ৩৪নম্বর জাতীয় সড়কে শিলিগুড়ি মোড়ের সামনেও রাত পর্যন্ত চলছে অবরোধ। শামিল হাজারো মানুষ। চরম উত্তেজনা। শাসকদলের বাহিনীও জড়ো হয়েছে অবরোধ তুলতে। রাত পর্যন্ত অবরোধ চলে কালিয়াগঞ্জ, ইসলামপুরেও। পরে রাত দশটা নাগাদ অবরোধ কর্মসূচিতে বাকি বিক্ষোভকারীদের কাছে রায়গঞ্জ পার্বতী দেবী স্কুলের শিক্ষিকা শর্মিষ্ঠা ঘোষ আবেদন জানান, আপাতত এই অবরোধ তুলে নেওয়ার। যদিও দাবি থেকে সরে আসছেন না আন্দোলনকারীরা।

বিক্ষোভকারী ভোটকর্মীদের দাবি, যদি ভোটের দায়িত্ব পালন করতে এসে ভোট চলাকালীনই অপহরণ হয় মৃত্যু হয় শিক্ষকের তাহলে কোন ভরসায় সরকারি কর্মীরা ভোটের দায়িত্ব পালন করতে আসবে? ভোটকর্মীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তো খোদ সরকারের? তা না করে উলেট সরকারি কর্মীচারীদের কাঠগড়ায় তুলে আত্মহত্যার তত্ত্ব কেন খাড়া করতে চাইছে পুলিশ প্রশাসন?

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement