আইনের খাঁড়া মাথায়
নিয়েই শপথ ইয়েদুরাপ্পার

সংবাদসংস্থা   ১৮ই মে , ২০১৮

বেঙ্গালুরু ও নয়াদিল্লি, ১৭ই মে- তুমুল রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের মধ্যেই কর্ণাটকে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলেন বি জে পি নেতা বি এস ইয়েদুরাপ্পা। গরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য রাজ্যপাল বাজুভাই ভালা তাঁকে ১৫দিন সময় দিলেও ইয়েদুরাপ্পার দাবি, তার আগেই তিনি বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করে দেবেন। কীভাবে দেবেন, তার যথেষ্ট আন্দাজ মিলছে। কেন্দ্রের শাসক দল কংগ্রেস, জে ডি (এস), নির্দল বিধায়কদের কিনতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বলে খবর। ইয়েদুরাপ্পার শপথ স্থগিত রাখার আরজি জানিয়ে মধ্যরাতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল কংগ্রেস, জনতা দল (এস)। শীর্ষ আদালত শপথ নেওয়া আটকায়নি, কিন্তু ইয়েদুরাপ্পার সমর্থনের উৎস সন্ধান করতে চেয়ে রাজ্যপালকে লেখা তাঁর চিঠি চেয়ে পাঠিয়েছে। শুক্রবার সকালেই ফের এই মামলা উঠবে সুপ্রিম কোর্টে।

এই অবস্থায় ইয়েদুরাপ্পা একাই শপথ নিয়েছেন। জাঁকজমক করার অবকাশ মেলেনি। প্রধানমন্ত্রী বা অমিত শাহের মতো নেতারা এই অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন না। ৭৫ বছর বয়সি ইয়েদুরাপ্পা তৃতীয় বার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেবার পরেই দাবি করেন, যত শীঘ্র সম্ভব তিনি বিধানসভায় গরিষ্ঠতা প্রমাণ করবেন। এই বিষয়ে তাঁর ‘১০০শতাংশ’ আত্মবিশ্বাস রয়েছে। ২২৪ সদস্যের কর্ণাটক বিধানসভায় ভোট হয়েছে ২২২ আসনে। বি জে পি পেয়েছে ১০৪। কংগ্রেসের ৭৮, জে ডি (এস) ৩৭, বি এস পি-র ১ ও এক নির্দল মিলে জে ডি (এস) নেতা কুমারস্বামীর পিছনে ১১৭ জনের সমর্থন রয়েছে।

ইয়েদুরাপ্পা যখন শপথ নিয়ে রাজভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন তখন রাজ্য সচিবালয়ের সামনে ধরনায় বসে কংগ্রেস ও জে ডি (এস)। কংগ্রেসের বিধায়কদের শহরের একটি হোটেলে রাখা হয়েছে। তাঁরা কিছুক্ষণ ধরনায় থেকে ফের সদলবলেই হোটেলে ফিরে যান। ইয়েদুরাপ্পা মুখ্যমন্ত্রী হবার পরে অবশ্য হোটেলের দরজা থেকে পুলিশ পাহারা তুলে নেওয়া হয়েছে।

নজিরবিহীন ভাবে এই শপথ হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে মধ্যরাত থেকে আইনি বিতর্কের পরে। বুধবার রাতে কর্ণাটকের রাজ্যপাল ইয়েদুরাপ্পাকে সরকার গঠনের জন্য চিঠি দেবার পরে এই নির্দেশের আইনি বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রাতেই সুপ্রিম কোর্টে যায় কংগ্রেস ও জনতা দল (এস)। প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের বাসভবনে গিয়ে রাতেই মামলা শোনার আবেদন জানান তাঁদের আইনজীবীরা। রাত সওয়া একটায় প্রধান বিচারপতি সিদ্ধান্ত নেন এই আবেদন শোনাই উচিত। রাত দুটোয় ফের আলো জ্বলে ওঠে সুপ্রিম কোর্টে। বিচারপতি এ কে সিকরি, এস ও বোবদে, অশোক ভূষণের বেঞ্চ রাত সওয়া দুটোয় শুনানি শুরু করেন। প্রায় সওয়া তিন ঘন্টা শুনানি হয়। কংগ্রেসের প্রদেশ সভাপতি জি পরমেশ্বর ও জে ডি (এস)-র এইচ ডি কুমারস্বামীর হয়ে আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি শপথ স্থগিত রাখার আবেদন জানান। তিনি বলেন, বি জে পি-র বিধায়ক সংখ্যা ১০৪। অথচ কংগ্রেস- জে ডি (এস) ১১৭ জনের নামের তালিকা রাজ্যপালকে জমা দিয়েছে। রাজ্যপাল এর পরেও ইয়েদুরাপ্পাকে ডেকে অবৈধ কাজ করেছেন। অন্যদিকে, তিনজন বি জে পি বিধায়কের পক্ষে মুকুল রোহাতগি বলেন, এই আবেদন ছুঁড়ে ফেলা উচিত। রাজ্যপাল একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী, তাঁর অধিকারে আদালত হস্তক্ষেপ করবে কেন? এমন কি জরুরি বিষয় যে মাঝরাতেই নিষ্পত্তি করতে হবে? উত্তরে সিংভি বলেন, শপথের পরে আবেদন করলে তার তো অর্থই থাকবে না। রোহাতগি বলেন, পনের দিন সময় রয়েছে, কেউ তো ফাঁসিতে চড়ছে না। সিংভি ও তাঁর সঙ্গী আইনজীবীদের বলতে শোনা যায়, ভারতীয় গণতন্ত্রকে ফাঁসিতে চড়ানো হচ্ছে। রাজ্যপাল বিধায়ক কেনাবেচার রাস্তা করে দিয়েছেন। সংবিধান রাজ্যপালকে আইনানুগ কর্তব্য পালনের দায়িত্ব দিয়েছে, যা খুশি করার অনুমোদন দেয়নি।

আইনজীবীদের যুক্তি-পালটা যুক্তির মধ্যে বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণও ছিল লক্ষণীয়। তাঁরা বলেন, বিধায়করা শপথ নেবার আগে দলত্যাগ-বিরোধী আইনের পরিধিতে পড়েন না, এমন যুক্তি মারাত্মক। তাঁরা এও বলেন, সাধারণ ভাবে শীর্ষ আদালতের রায়ের প্রবণতা হলো রাজ্যপালের কাজে হস্তক্ষেপ না করা। কিন্তু দেখতে হবে তিনি কোন যুক্তির ওপরে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিচারপতিরা জানতে চান কংগ্রেস-জে ডি (এস)-র যদি ১১৭জন বিধায়ক থেকে থাকেন তাহলে বি জে পি সংখ্যাগরিষ্ঠতা জোগাড় করবে কোথা থেকে? এই প্রশ্নের কোনও উত্তর আদালতে দেওয়া হয়নি। তেমনই বিচারপতিরা এও জানতে চান রাজ্যপাল ১৫দিন সময় দিলেন কেন?

কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে অ্যাটর্নি জেনারেল কে ভেনুগোপালের সওয়ালও ছিল বি জে পি-র পক্ষেই। তাঁর যুক্তি ছিল মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথের পরে তো বিধানসভায় গরিষ্ঠতার পরীক্ষা দিতে হবে। মামলা তার পরে শুনলেই চলবে। শীর্ষ আদালত সিদ্ধান্ত নেয় শপথ গ্রহণ স্থগিত রাখা হবে না কিন্তু মামলার নিষ্পত্তির ওপরে এই শপথের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। বেঞ্চ অ্যাটর্নি জেনারেলকে নির্দেশ দেয় সরকার গঠন করতে চেয়ে ইয়েদুরাপ্পা রাজ্যপালকে যে চিঠি দিয়েছেন তা আদালতে হাজির করার। শুক্রবার সকালেই সেই চিঠি সুপ্রিম কোর্টে পেশ করতে হবে। আদালত দেখবে সেখানে কতজনের সমর্থনের কথা বলা হয়েছে। এই চিঠি দেখে মামলার পরবর্তী প্রক্রিয়া স্থির হবে। ইয়েদুরাপ্পা শপথ নিয়ে নিলেও তাঁর মাথার ওপরে শীর্ষ আদালতের শুনানির এই খাঁড়া ঝুলছে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement