নিহত দম্পতির দেহ লোপাট পুলিশের, আদালতে পুত্র

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৮ই মে , ২০১৮

কাকদ্বীপ, কলকাতা, ১৭ই মে — কাকদ্বীপে নিহত দম্পতির মৃতদেহ বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেশীকে গছিয়ে দেওয়ার দেওয়ার চেষ্টা করেছে পুলিশ। যদিও নিহত ওই দম্পতির ছেলে দীপংকর দাসের হাতে বুধবার মৃতদেহ দুটি তুলে দিতে গড়িমসি করে পুলিশই। তাই বৃহস্পতিবার দীপংকর তাঁর বাবা, মার মৃতদেহ তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন হাইকোর্টে। শুক্রবার সেই মামলার শুনানি হওয়ার কথা। কাকদ্বীপের ওই নৃশংস খুনের ঘটনা এবং তৃণমূল কংগ্রেস, প্রশাসনের চক্রান্তের প্রতিবাদে রবিবার কাকদ্বীপে সমাবেশের ডাক দিয়েছে সি পি আই (এম)। মৃতদেহ দুটি ছেলের হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে এদিন কলকাতা পুলিশ মর্গের সামনে বিক্ষোভ দেখান বামপন্থী সংগঠনগুলি। পুলিশ ১১১ জন বিক্ষোভকারীকে সেখানে গ্রেপ্তার করে।

এদিন কাকদ্বীপ থানার পক্ষ থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা নাগাদ এক পুলিশকর্মী বুধাখালিতে শিবপ্রসাদ দাসের কাছে একটি নোটিস নিয়ে হাজির হয়। নোটিসে শিবপ্রসাদ দাসকে জোর করে সই করানো হয় বলে শিবপ্রসাদ দাসই অভিযোগ করেন। নোটিসের মোদ্দা কথা — নিহত দেবপ্রসাদ দাস এবং ঊষারানি দাসের দেহ তাঁকে নিতে হবে। শিবপ্রসাদ দাস দেবপ্রসাদ দাসের ভাই। যদিও ওই ঘটনার পরেই শিবপ্রসাদ দাস কাকদ্বীপ থানায় ওই জোর করে সই করানোর কথা উল্লেখ করে তাঁকে যেন এই ব্যাপারে জড়ানো না হয় — সেই চিঠি জমা দেন। চিঠিতে শিবপ্রসাদ দাস লিখেছেন,‘‘আজ ইং ১৭/৫/১৮ তারিখ বেলা ৫টা ৩০ মিনিট নাগাদ কাকদ্বীপ থানা থেকে অফিসার এসে উক্ত দেহগুলি নেওয়ার জন্য নোটিসে স্বাক্ষর করাতে চায়। আমি বলি দীপংকর দাস ছাড়া আমি এই দেহ নিয়ে কী করব। আমি দেহ নেওয়ার নোটিসে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করি। কিন্তু জোর পূর্বক নোটিসে স্বাক্ষর করানো হয়।’’

বাবা, মায়ের মৃত্যুর সি বি আই বা অন্য কোনও নিরপেক্ষ সংস্থার তদন্ত চেয়ে এদিন হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন দীপংকর দাস। একই সঙ্গে তিনি বাবা, মায়ের মৃতদেহ হাতে পেতেও আদালতে আবেদন জানিয়েছেন। শুক্রবার হাইকোর্ট এই আবেদনের শুনানি গ্রহণ করবে। দীপংকর দাস কলকাতা হাইকোর্টের কাছে তাঁর আবেদনে বলেছেন, এই মৃত্যুর জন্য ২০লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক। আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মৃতদেহ দুটির ময়না তদন্তের রিপোর্টে কোনও কারচুপি যাতে না হয় সেদিকটিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় রাখতে হবে। শুক্রবার বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর এজলাসে এই আবেদনের শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে। আদালতে আবেদনকারীর পক্ষে রয়েছেন আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য, সামিম আহমেদ, সব্যসাচী চ্যাটার্জি।

গত রবিবার রাতে কাকদ্বীপে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হওয়ার পর মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে কাকদ্বীপ থানায় স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেস নেতাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্টভাবে লিখিত অভিযোগ জানানো হয়েছিল। সেখানে তৃণমূল নেতা অমিত মণ্ডল, শিবপ্রসাদ মণ্ডল, চন্দন গিরি, শেখ মনিরুল, অশোক মণ্ডলদের নাম ছিল। পুলিশ এদের কাউকেই গ্রেপ্তার করেনি। উলটে পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডকে নিছক দুর্ঘটনা হিসাবে দেখাতে চাইছে।

গত রবিবার মধ্যরাতে কাকদ্বীপের বুধাখালিতে খুন হন ওই দম্পতি। নিহত দেবপ্রসাদ দাস (৫০) ও তাঁর স্ত্রী ঊষারানি দাস (৪১) দুজনেই সি পি আই(এম) কর্মী ছিলেন। গরিব পরিবার। তাঁদের ছেলে দীপংকর দাস বি এ তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। বুধাখালির কাছাড়িবাড়ি গ্রামে তাঁদের বাড়ি। বাড়িটি লোকালয় থেকে কিছুটা দূরে, নদীর ধারে। অভিযোগ, ঘরে তাঁদের হাত পা বেঁধে, মোবিল ও কেরোসিন তেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় তৃণমূল কংগ্রেসের দুষ্কৃতীরা। তার আগে তাঁদের বেধড়ক মারধর করা হয় বলেও ধারণা গ্রামবাসীদের। সোমবার ছিল পঞ্চায়েত নির্বাচন। খুনের আগে বেশ কিছুদিন তাঁদের লাগাতার হুমকি দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী অমিত মণ্ডল ও তার বাহিনী। ঘটনার দিন দুপুরেও ভয় দেখিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা, অভিযোগ এমনই। খুনের ঘটনায় কাকদ্বীপ থানায় মূল অভিযুক্ত তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী অমিত মণ্ডল, শিবপ্রসাদ মণ্ডল, চন্দন গিরি, শেখ মণিরুল, অশোক মণ্ডলসহ অন্যান্য দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন নিহতদের সন্তান দীপংকর দাস। পুলিশ অবশ্য কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।

উলটে ফরেনসিক দল যাওয়ার প্রায় কুড়ি ঘন্টা আগে, সোমবার বিকালেই নবান্নে রাজ্য পুলিশের এ ডি জি(আইনশৃঙ্খলা) অনুজ শর্মা জানিয়ে দেন যে, বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে আগুন ধরার কারণে ওই দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষার আগেই কী করে পুলিশ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় এবং তা নবান্ন থেকে ঘোষিত হয়, এই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শহীদ দেবপ্রসাদ দাস ও ঊষারানি দাসের মরদেহ ৪দিন কেটে গেলেও ছেলের হাতে তুলে দেয়নি পুলিশ। নানা টালবাহানার পরে বুধবার রাতে পুলিশ জানিয়েছিল মৃতদেহ বৃহস্পতিবার ছেলের হাতে দেওয়া হবে। তবে পুলিশ সূত্রেই জানা গেছে, বুধবার গভীর রাতে কলকাতা পুলিশ মর্গ থেকে মরদেহ সরিয়ে ফেলে পুলিশ। বৃহস্পতিবার সকালে মর্গে দেহ নিতে এলে ছেলেকে বলা হয় এখানে কেউ নেই। মৃতদেহ কোথায় গেল? কেন দেওয়া হচ্ছে না? এই প্রশ্ন তুলে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সি পি আই (এম) নেতা, কর্মীরা। মৃতদেহ সন্তানের হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ অবরোধ করলে সেই কলকাতা পুলিশই লাঠি পেটা করে, টেনে হিঁচড়ে ৩১জন মহিলাসহ ১১১জনকে গ্রেপ্তার করে লালবাজারে নিয়ে যায়।

বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা থেকেই কলকাতা পুলিশ মর্গের সামনে তৃণমূলের হাতে খুন হওয়া দুই কমরেডের মরদেহ নিতে হাজির হন পার্টি নেতা কর্মীরা। মাত্র ১২ঘন্টার ব্যবধানে মর্গের সামনের চিত্র পরিবর্তন হয়। একটি পুলিশও মর্গের ধারেকাছে ছিলেন না বৃহস্পতিবার। সাদা পোশাকে নজিদারি চালাচ্ছিলেন দু একজন। যদিও বুধবার রাত পর্যন্ত কলকাতা পুলিশ মর্গের গেট আটকে ছিল পুলিশ আধিকারিকসহ বিরাট বাহিনী। সেদিনও রাত প্রায় দশটা নাগাদ পুলিশ আশ্বাস দিয়েছিল বৃহস্পতিবার সকালে মরদেহ ছেলের হাতে তুলে দেওয়া হবে। সেই আশ্বাসে বিক্ষোভ তুলে নেওয়া হয়েছিল। মমতা ব্যানার্জির পুলিশ এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ফের মরদেহ লোপাট করার নজির গড়েছে সেই রাতেই। পুলিশের দাবি, গভীর রাতে দুটি মরদেহ কলকাতা থেকে ডায়মন্ড হারবার হাসপাতালের মর্গে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই ক্ষেত্রে পরিবারের কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। কিছু জানানোও হয়নি। ফলে দীপংকর দাসের কথায়,‘‘আমি জানিই না আমার বাবা, মার দেহ কোথায়? আমি কলকাতা পুলিশ মর্গ থেকেই তা নেব। কারণ সেখানেই তা ছিল।’’ প্রসঙ্গত, কলকাতা পুলিশ এর আগেও মধ্যমগ্রামের দলবদ্ধ ধর্ষনের শিকার কিশোরীর মরদেহ রাস্তা থেকে ছিনতাই করে পালিয়েছিল পুড়িয়ে ফেলার জন্য।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পার্টি নেতা, কর্মীসহ এস এফ আই, ডি ওয়াই এফ আই, সি আই টি ইউ, সারা ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির নেতা-কর্মীরা মরদেহ নিতে গেলে দেখেন কলকাতা পুলিশ মর্গের গেটে তালা দেওয়া। কোনও পুলিশ নেই। তাঁরা মর্গের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে মর্গের এক কর্মী জানান,‘‘কেউ নেই।’’ চারদিন পরও কেন বাবা-মায়ের মৃত দেহের শেষকৃত্য করার জন্য ছেলেকে দেওয়া হচ্ছে না? এই ক্ষোভে ফেটে পড়েন উপস্থিত নেতা কর্মীরা। এরপরেই মর্গের সামনে থেকে মিছিল করে তাঁরা দুপুর দেড়টা নাগাদ সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ এবং এম জি রোডের সংযোগস্থল অবরোধ করেন। অবরোধের নেতৃত্ব দেন শ্যামল চক্রবর্তী, সুজন চক্রবর্তী, মানব মুখার্জি, অনাদি সাহু, মিনতি ঘোষ, কল্লোল মজুমদার, নেপালদেব ভট্টাচার্য, মধুজা সেনরায়, দেবেশ দাস, গার্গী চ্যাটার্জিসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। ছিলেন ছাত্র নেতা সৃজন ভট্টাচার্য, কবি মন্দাক্রান্তা সেন।

যে পুলিশের দেখা মেলেনি এদিন সকাল থেকে, অবরোধ শুরু হতেই সেই পুলিশের বিরাট বাহিনী হাজির হয় অবরোধস্থলে। পার্টি নেতৃত্ব পুলিশ আধিকারিকদের স্পষ্ট জানান, ৪দিন কাটতে চললো ছেলেটি তাঁর মা-বাবার মরদেহ কেন পাচ্ছে না শেষকৃত্য করার জন্য? মরদেহ ছেলের হাতে তুলে দিন অবরোধ তুলে নেওয়া হবে। এদিকে অবরোধকারীরাও তৃণমূল ও পুলিশ বাহিনীর এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে লাগাতার বিরুদ্ধে স্লোগান তুলতে থাকেন। পুলিশের পক্ষ থেকে তখন দাবি করা হয় যে, মৃতদেহদুটি হেপাজতে নেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে। সেটি জোর করে নিহতের ভাই শিবপ্রসাদ দাসের থেকে জোর করে সই আদায় করা আবেদনটিই কিনা — তা অবশ্য পুলিশ জানায়নি।

পুলিশই তখন কলকাতা পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার(সেন্ট্রাল) বুদ্ধদেব মুখার্জি নেতৃত্বকে জানান, ‘‘আমরা মরদেহ তুলে দিতে চাই পরিবারের হাতে। তবে মরদেহ দুটি ডায়মন্ড হারবারের মর্গে আছে।’’ নেতৃত্ব পাল্টা প্রশ্ন ছোঁড়েন, কী করে কলকাতা পুলিশ মর্গ থেকে মরদেহ ডায়মন্ড হারবার মর্গে গেল? কার অনুমতিতে গেল? এর কোনও স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি পুলিশ কর্তারা। পার্টি নেতৃত্ব দাবি করেন — ডায়মন্ড হারবারে মরদেহ আছে এবং সেখানে গেলে পরিবারের হাতে দেহ তুলে দেওয়া হবে লিখিত দিন। তাতে রাজি হয়নি পুলিশ।

আধঘন্টা অবরোধ চলার পরে বিরাট বাহিনী অবরোধ তুলতে লাঠি পেটা শুরু করে। টেনে হিঁচড়ে পার্টি নেতা কর্মীদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ ভ্যানে তুলে লালবাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। ১১১জন নেতা, কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে ৩১জন মহিলা। তাঁদের বিকালে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। লালবাজার চত্বরে মুক্তি পাওয়া কমরেডদের অভিনন্দন জানাতে উপস্থিত ছিলেন পার্টি নেতা শ্যামল চক্রবর্তী, মদন ঘোষ, শ্রীদীপ ভট্টাচার্যসহ অন্যান্য নেতারা।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement