মধ্যযুগের বর্বরতাও লজ্জা পাবে

  ১৮ই মে , ২০১৮

একটা সরকার এবং শাসকদল কতটা অমানবিক ও নীচ হতে পারে তা এরাজ্যের সরকার ও শাসকদলকে না দেখলে কল্পনাও করা যাবে না। একটা সাধারণ পঞ্চায়েত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৪৫টি তাজা জীবন বলিপ্রদত্ত হবার পরও সরকার ও দলের পান্ডারা নির্লজ্জভাবে বলতে পারে ভোট মোটের ওপর শান্তিপূর্ণভাবেই হয়েছে। বিরোধী সমর্থক তো বটেই দলীয় সমর্থকরাও উন্নয়নরূপী সশস্ত্র গুন্ডাবাহিনীর হাড় হিম করা চোখ রাঙানিতে ভোট দিতে না পারলেও বলতে পারে ভোট হয়েছে অবাধেই। পুলিশি প্রহরায় ও নিরাপত্তায় বেপরোয়া ছাপ্পা ভোট দেবার পর দলের পক্ষ থেকে পুলিশ ও প্রশাসনকে অভিনন্দন জানানো যায়। বিশ্বের আর কোথাও এমনকি তালিবান শাসিত আফগানিস্তানেও এই বিরল দৃশ্য চোখে না পড়লে তার দেখা মিলবে একমাত্র উন্নয়ন শাসিত বাংলায়। ভোটকর্মীদের নিরাপত্তার স্বার্থে মৃত্যুর জন্য ২০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা হয়। শাসক গুন্ডাদের হাতে ভোটকর্মী খুন হবার পর সেই মৃত্যুকে সরকারি তরফেই আত্মহত্যা বলে চালানো হয়। খুন হওয়া ভোটকর্মীর সহকর্মীরা তাদের নিরাপত্তার দাবিতে বিক্ষোভ অবস্থান করলে তাদের এ বি টি এ-র কর্মী বলে উপেক্ষা করা হয়।

সবচেয়ে যেটা বীভৎস ও পৈশাচিক ঘটনা সেটা কাকদ্বীপের বুধাখালি গ্রামের। সি পি আই (এম) কর্মী এক দম্পতিকে গভীর রাতে ঘরের মধ্যে জীবন্ত পুড়িয়ে মারে শাসকদলের নরঘাতকরা। কয়েক ঘণ্টা পরেই শাসকদলের নেতা ও সরকারি কর্তারা জানিয়ে দেয় খুন নয় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছে। এমন কুৎসিততম ঘটনাকে এইভাবে হালকাচালে উপেক্ষা করা যায় এই রাজ্যেই। ন্যূনতম বিবেকবোধ থাকলে এইভাবে তদন্তের আগে বানানো গল্প চাউর করা যায় না। খুনিদের বাঁচাতে মানবতার বিরুদ্ধে এই জঘন্যতম পৈশাচিক ঘটনাকে পরিকল্পিতভাবেই গল্পের আশ্রয় নিচ্ছে সরকার। খুনের ঘটনার পর ঘটনাস্থলে যেতে যেখানে পুলিশ পৌঁছাতে ১৫ ঘণ্টা সময় লাগে সেখানে তার আগেই ঘটনাস্থলে না গিয়ে স্থানীয় বিধায়ক তথা মন্ত্রী বলে‍ দিলেন বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে। আর এই সুরে সুর মিলিয়ে আরও কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশের বড় কর্তা নবান্নে বসে জানালেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েই মারা গেছে। তাজ্জব ব্যাপার এরাজ্যে এখন আর কোনও ঘটনার তদন্তের প্রয়োজন হয় না। শাসকদলের নেতারা তাদের খুনেবাহিনীর নিরাপত্তার স্বার্থে যে ফরমুলা বাতলে দেবেন পুলিশ ও প্রশাসন সেই ফরমুলা অনুযায়ীই কাজ করবে। এক্ষেত্রেও তেমনটাই হয়েছে। তাই বিদ্যুতের তার ছেঁড়ার গল্প বানিয়ে অভিযুক্ত খুনিদের গ্রেপ্তার এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এত বড় একটা ভয়ংকর ঘটনার পর মৃত দম্পতির পুত্র খুনিদের নামে এফ আই আর করার পরও পুলিশ নীরব ও নিষ্ক্রিয় থেকে গেছে। তদন্তের কোনও প্রয়োজনই তারা মনে করেনি। কারণ, শাসক নেতারা বলে দিয়েছে এটা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনা। এখন পুলিশের প্রধান দায়িত্ব হয়ে পড়েছে যেভাবেই হোক এবং যেনতেনপ্রকারে হোক সেই সাজানো তত্ত্বকে সত্য বলে হাজির করা।

তাই পুলিশ প্রধানেরও প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে ঝলসানো মৃতদেহের দখল নেওয়া যাতে ময়নাতদন্তে পুড়িয়ে মারার কোনও প্রমাণ হাজির না হয়। তাই পুত্র ও সি পি আই (এম) নেতাদের কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নেয় মৃতদেহ। আশঙ্কা থেকেই দাবি করা হয় ময়নাতদন্তের ভিডিও রেকর্ডিংয়ের। কিন্তু তা হয়নি। গোপনে ময়নাতদন্তের পর দেহ ঢুকিয়ে দেওয়া হয় পুলিশ মর্গে। পুত্র বাবা-মায়ের দেহ আনতে গেলে তাকে মর্গের ভিতর ঢুকিয়ে টানা ছঘণ্টা আটকে জেরা করা হয়। কতটা অমানুষ ও দলদাস হলে পুলিশের পক্ষে একাজ সম্ভব সহজেই অনুমেয়। নবান্নের নির্দেশে পুলিশ দেহ দিতে অস্বীকার করে। পুলিশই তাদের সময়মতো দেহের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করবে। ভয়ে সরকার এতটাই শঙ্কিত যে পুত্রের হাতে বাবা-মায়ের মৃতদেহ দিতে ভয় পাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভের আগুন ছড়িয়েছে। প্রতিবাদ-বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছে রাজপথ। আরও আতঙ্কিত হয় নবান্ন। তাই গ্রেপ্তার করা হয় সি পি আই (এম) নেতা-কর্মীদের। এদিকে ঘটনাস্থল থেকে নমুনা নষ্ট বা লোপাট হবার সুযোগ দিতে ফরেনসিক দল পাঠানো হয় প্রায় ৩৮ ঘণ্টা পরে। কিন্তু সেখানে তার ছেঁড়ার কোনও চিহ্ন নেই। আসলে সত্য আড়াল করে দলীয় খুনিদের বাঁচাতে শাসকদল ও সরকার এতটা মরিয়া ও বেপরোয়া যে যাবতীয় মানবিক বোধবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে মধ্যযুগীয় বর্বরতা ও প্রাচীন অসভ্যতার আশ্রয় নিতেও দ্বিধা করেনি।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement