রুশ হৃদয়ে এখনও বেঁচে
সোভিয়েত বীর ইয়াসিন

প্রশান্ত দাস   ১৩ই জুন , ২০১৮

মস্কো, ১২ই জুন— ওক, পপলার, ম্যাপল গাছের ছায়া ঢাকা পথ চলে গেছে আরও গভীরে। মূল ফটক থেকে পরিপাটি করে নিকানো রাস্তার ধরে একটু ভিতরে যেতে হয়। সোজা রাস্তা ডান দিকে বাঁক নিলেই দেখা যায় তাঁকে। ডান হাতে ফুটবল। বাঁ হাতে গ্লাভস। কোথাও একটা যাওয়ার জন্য পা তুলেছেন। দেখা যায় পাথরে বাঁধানো লেভ ইয়াসিনকে। এপিটাফে লেখা জন্মের সন। মৃত্যুরও।

সর্বকালের সেরা গোলরক্ষকের বর্তমান ঠিকানা এটাই। মস্কোর প্রেসনায়া ডিসট্রিক্টের ভাগাঙ্কোভো গোরস্থান। রেড স্কোয়ার সাড়ে আট কিমি দূরে। কলকাতার মল্লিকবাজার বা দক্ষিণ পার্ক স্ট্রিট কবর স্থান নয়। ভাগাঙ্কোভোর সর্বত্রই শিল্পের ছোঁয়া। শিল্পী, রাজনীতিবিদ আর ক্রীড়াবিদদের জন্যই এই গোরস্থান। এখনও লেভ ইয়াসিনের সাক্ষাৎ পেতে ভিড় জমান তাঁর অনুরাগীরা। শুধু কবরস্থানেই লেভ ইয়াসিনকে পাওয়া যায় এমনও নয়। ভাগাঙ্কোভো থেকে একটু দূরেই ডায়নামো স্টেডিয়াম। মেট্রো স্টেশন থেকে বের হলেই দেখা যায়। আপাতত তারের জাল দিয়ে ঘেরা। কাঠের পাটাতনের রাস্তা দিয়ে একটু এগলেই দেখা যায় তাঁকে। তিনকোনা গোল পোস্টের এককোণ থেকে অপর দিকে হাওয়ায় দেহ ছুঁড়ে দিয়েছেন। ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ এভাবেই এই স্টেডিয়ামের তিন কাঠির নিচে অজস্র গোল বাঁচিয়েছেন। ডায়নামো স্টেডিয়ামের একটি স্ট্যান্ড করা হয়েছে ইয়াসিনের নামে। স্টেডিয়ামের বাইরেই ডায়নামো ক্লাবের বাগানে রয়েছে ইয়াসিনের এই ব্রোঞ্জের মূর্তি। আলেকজান্ডার রুকাভিশনিকভের তৈরি এই মূর্তিই এখন ডায়নামোর প্রতীক।

রাশিয়ার প্রায় প্রতিটি শহরের একটি রাস্তায়, রাশিয়ান ফুটবল সংস্থার বিশাল দেওয়ালের ম্যুরালে, তিন রুবলের কয়েনে পাওয়া যায় সর্বকালের সেরা গোলরক্ষক- দ্য ব্ল্যাক স্পাইডারকে। প্রস্তুর মূর্তির মতোই ভ্লাদিমির ভিস্তোস্কির গানে, রবার্ট রঝদেস্তভেনস্কি ও ইয়েভজেনি ইয়েভতুশেঙ্কোর কবিতাতেও বেঁচে তিনি।

ইয়াসিন শুধু গোলরক্ষকই নন, তিনি ছিলেন সোভিয়েতের বীর। ইয়াসিন বেঁচে শ্রমিকশ্রেণির মনে। শ্রমিক পরিবারে জন্মেছিলেন যেমন তেমন শুরুতে নিজেও শ্রমিকের কাজ করতেন মস্কোর কারখানায়। গোল পোস্টের নিচে যেমন ঋজু দেহের দৃপ্ত নড়াচড়া, তেমনই স্বভাবে ছিল নম্রতার স্পর্শ। কেউ কিছু চাইলে দিয়ে দিতেন অনায়াসে। ভাগাঙ্কোভোতে পৌঁছে লেভ ইয়াসিনের খোঁজ করতেই, গোরস্থানের কর্মচারী নিজেই এগিয়ে নিয়ে গেলেন। ভাষার ব্যবধান থাকলেও, ভালোবাসার কথা বললেন হাত পা নেড়ে।

সম্প্রতি ফিফাও তাঁকে সম্মান জানিয়েছে। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের পোস্টারে রয়েছে তাঁর ডাইভ দেওয়ার একটা ছবি। দীর্ঘ ফুটবল জীবনে ১৫০টির উপর পেনাল্টি বাঁচিয়েছেন। তাঁর গ্লাভসে গোলশূন্য থেকেছে ২৭০টি ম্যাচ। ফুটবলের ইতিহাসে একমাত্র গোলরক্ষক হিসাবে ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। ১৯৭০ সালে দিনো জফ এবং ২০০৬ সালে গিয়ানলুইগি বুঁফো দ্বিতীয় স্থান পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিলেন মাত্র। বস্তুত গোলরক্ষকের পুরানো ধারণাই বদলে দিয়েছিলেন ইয়াসিন। পেনাল্টি বক্স, রক্ষণ এলাকায় নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ধারা তাঁরই অবদান।

সাবেক সোভিয়েতের হয়ে হয়তো বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। ১৯৫৬ অলিম্পিকে সোনা সহ, ইউরো কাপ জিতেছিলেন। ট্রফির বিচারে সাফল্যের অঙ্ক কষলেও লেভ ইয়াসিনের তুলনা মেলা ভার! চুম্বকের শক্তি ছিল যেন তাঁর গ্লাভসে। এক কালে ডায়নামো মস্কোর আইস হকি দলের গোলরক্ষক হিসাবেও খেলেছিলেন। সেখানেও সাফল্য। নিজের সাফল্যের রহস্য নিজেই উদঘাটন করেছিলেন, ‘আমার রহস্য— ম্যাচের আগে, একটা সিগারেট আমার সব স্নায়ুগুলিকে শান্ত করে আর একটু ভালো ভদকা পেশিগুলিকে সতেজ করে দেয়।’

বিশ্বকাপে মস্কোয় বিদেশিদের অভাব নেই। ফুটবল ভালোবাসিয়েদের কয়েকজন ছিটকে এসেছেন লেভ ইয়াসিনের কবর স্থান দেখতে। পর্তুগাল থেকে আসা ষাট পেরনো আডাও টাভেট্টি ও তাঁর বন্ধু ভ্লাডোর বিশ্বকাপ দেখতে এসেছেন। ২৮ বছর আগের একটি ঘটনাই টেনে এনেছে তাঁকে। ইউসেবিওর ভালো বন্ধু ছিলেন ইয়াসিন। স্ট্রাইকার আর গোলরক্ষকের সম্পর্ক মাঠে সাপে নেউলের হয়। এদেরও তেমনই ছিল। ইয়াসিনকে ব্ল্যাক স্পাইডার ডাকা হলে ইউসেবিওকে বলা হয় ‘ব্ল্যাক প্যান্থার।’ মাঠের বাইরে দুজনের বন্ধুত্ব ছিল। ১৯৯০ সাল ইউরোপিয়ান কাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা ছিল এফ সি ডিঁপ্রো ও বেনফিকা লিসবনের মধ্যে। রবিবার ম্যাচ হওয়ায় দেখতে গিয়েছিলেন আডাও টাভেট্টি। মিটিওর স্টেডিয়ামে গিয়েছিলেন ইউসেবিও। তখনই খবর আসে লেভ ইয়াসিন প্রয়াত। মাইকে ঘোষণা করা হলে, জায়ান্ট স্ক্রিনে একটা মুখই ভেসে উঠেছিল বারবার। ইউসেবিওর চোখ বেয়ে জল পড়ছে। বন্ধু হারা হয়েছিলেন সেদিন ইউসেবিও।

মাঠে কড়া হলেও আদপে ছিলেন উদার স্বভাবের। তাই ইউসেবিওর সঙ্গে বন্ধুত্বও ছিল বেশ। ইয়াসিনের পরিবারের অভিযোগ ছিল নিজের কালো জার্সি কেউ চাইলেই অমনি বিলিয়ে দিতেন তিনি। হালকা স্বভাবের হলেও নিজের খেলা নিয়ে গর্বিতও ছিলেন। নিজেই একবার বলেছিলেন, ‘ইউরি গ্যাগরিনকে মহাকাশে উড়তে দেখার আনন্দ একমাত্র অতিক্রম করতে পারে একটা ভালো পেনাল্টি সেভ।’

ম্যানুয়েল ন্যুয়ের, কেলর নাভাস বা ডেভিড ডি গিয়াদের যুগেও লেভ ইয়াসিন হতে চায় রুশ গোলরক্ষকরা। ইয়াসিনের নজর কাড়া রেকর্ড বা ভালোবাসার জন্য নয়। ইয়াসিনের দায়বদ্ধতার জন্যও। টানা কুড়ি বছর খেলে গিয়েছেন মস্কো ডায়নামো ক্লাবের হয়ে। বড় অঙ্কের প্রস্তাব যে আসেনি এমন নয়। সোভিয়েত যুগের সব ভালো গুণই ছিল ইয়াসিনের মধ্যে। উলটো করলে, ইয়াসিনের মধ্যেই প্রতিফলিত হতো সোভিয়েতের সময়ের ভালো সব। আর তাই এখনও ইয়াসিনের নামেই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যান সকলে। উবের চালক নাম শুনেই নিয়ে যান কোনও কথা জিজ্ঞাসা না করে। ডায়নামো স্টেডিয়াম সাজিয়ে তুলতে যখন মাটি খুঁড়ে এফোঁড় ওফোঁড় করে ফেলা হয়েছে তখন ইয়াসিনকে আগলে রাখা হয়েছে যত্নে। শ্রমিকশ্রেণির ফুটবলারকে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement