পানীয় জলের সংকট
তীব্র গোসাবার গ্রামে

নিজস্ব সংবাদদাতা   ১৩ই জুন , ২০১৮

গোসাবা, ১২ই জুন— ‘জলের অপর নাম জীবন’ কথাটি শুনতে শুনতেই বড় হয় ছাত্ররা। ছোটরা। তারপর বড় হয়ে ওঠা।

কিশোরবেলার সেই উদ্ধৃতি শুনতে শুনতে বড় হয়েছেন রফিক মোল্লা। এখন তার বয়স হয়েছে। বয়সের ভারে এখন অনেকটাই থিতু তিনি। কিন্তু কখনই ভাবেননি এই জলই মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে। চোখের সামনে অসহায়ভাবে সেটাই দেখতে হয়েছে তাকে। বিপন্ন হয়েছিলেন তিনিও। আইলায় ভেসে গিয়েছিল দ্বীপাঞ্চল। লন্ডভন্ড হয়ে যেন দলা পাকিয়ে গিয়েছিল সবুজ সাজানো গোছানো সব গ্রাম। বিপর্যস্ত করে তুলেছিল সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষের জীবনজীবিকা। একটির পর একটি মৃত্যু সংবাদে তিনি কেবল ভারাক্রান্তই হয়েছেন।

ছোট ছোট চিত্রনাট্য। ঘটনার ঘনঘটা। খুব বেশি দাবি নেই এখানকার মানুষের। একটু খাবার জল চেয়েছিলেন তাঁরা। দিতে পারেনি রাজ্য সরকার। এখানকার বলতে এই নোনা মাটির দেশ। সুন্দরবনের একটি দ্বীপাঞ্চল। আমাদের অতি পরিচিত গোসাবা। আবার গোসাবার হ্যামিলটন একটি দ্বীপ। এই নামেরও একটি ইতিহাস আছে। বেশ গর্বের ইতিহাস। এই দ্বীপেরই এক বাসিন্দা অপূর্ববাবু। এই নামেই তিনি পরিচিত। পদবি না বললেও কিছু আসে যায় না। তাঁর অভিজ্ঞতা আরও তিক্ত। জলসংকটে দিশাহারা হয়ে আইলার পরে তিনি জিনিসপত্র গুছিয়ে চলে আসেন সোজা কলকাতায়। গ্রামে যেটুকু ভিটেজমি আছে তা রেখে দিয়েছেন বাবা মায়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। সেটুকু হৃদয়ে। এই দ্বীপ তার জন্মভূমি। কৈশোর-যৌবন-কিছুটা বার্ধক্যও মিশে আছে গ্রামের মাটিতে। জীবনের অনেকগুলি বছর কাটিয়েছেন এখানে। দুচোখে স্মৃতিমাখা মেদুর ইতিহাস। এই জল-হাওয়া, সংস্কৃতি, জীবনের ছন্দ সবই তাঁর ধাতস্থ।

কিছুদিন আগে বাবা মায়েরও মৃত্যু হয়েছে। বড় হয়ে উঠেছে একমাত্র সন্তান মেয়েটিও। গাড়ি থেকে নেমে গদখালিতে নেমে যেন এক অজানা আনন্দে প্লাবিত হয়েছিলেন। খেয়াঘাটে দাঁড়িয়ে আঙুল দিয়ে ওপারের দিকে তাকিয়ে মেয়েকে বলেছিলেন ঐ দ্বীপ আমার জন্মভূমি। গোসাবা নামতেই চোখে পড়ে ‘বেকন বাংলো’। সঙ্গী মেয়েকে বলেন, এই বাংলোটি হলো হ্যামিলটন সাহেবের। এখানে রবীন্দ্রনাথ দুদিন ছিলেন। দুজনের গল্পকথা শুনে মেয়ে মুগ্ধ হয়। ভেবেছিলেন মেয়েকে নিয়ে কদিন এই গ্রামেই থাকবেন তিনি। স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতে যখন পা দিলেন, দ্বীপে সন্ধ্যা নেমেছে। হিমেল বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে নদীজল, দীর্ঘ জীবনের আবেগকেও। সে এক অন্য অনুভূতি। যা প্রকাশ করা যায় না।

এই পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিল। ছায়া-রোদ্দুরে বেশ জনজীবনের কোলাহল। কিন্তু সুর কেটে গেল তারপরে। প্রয়োজনীয় বাজার করে নিয়ে বাড়িতে ঢুকে দেখেন কলে জল নেই। খোঁজ নিয়ে জানলেন, কেবল একদিন নয়, জল নেই দুদিন। পানীয় জল নেই দোকানেও। লিটার দুই জল কোনওমতে জোগাড় করে বাঁচেন প্রাণে। অন্য বাসিন্দাদের মতোই আশায় ছিলেন পরের দিনের। কিন্তু জল পাননি।

বড় অদ্ভুত এই গোসাবা। মানুষের জন্য একটু পানীয় জল দিতে পারেনি সরকার। অথচ গেল অর্থবছরে কেবল ঘটা করে শিলান্যাস হয়েছ। গল্প ওটুকুই মাত্র। আর উদ্যোগ নেয়নি রাজ্যের সরকার। ভাবেনি গ্রামের মানুষের কথা। তাঁদের কষ্টের কথা। দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসক নিজে গ্রাম ঘুরেছেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। দুটি প্রকল্পে কমবেশি ১৯ হাজার মানুষের উপকার হওয়ার কথা। কমবেশি দুলক্ষ মানুষের বসবাস। পানীয় জলের সংকট রয়েছে। এলাকার মানুষ জানিয়েছেন, কিন্তু সমস্যার সমাধান কবে হবে তা জানেন না কেউ। হতাশা দীর্ঘ হচ্ছে প্রতিদিন।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement