বাঁকুড়ায় বাজে মৃত মা-মেয়ে,
জলমগ্ন কলকাতা

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৩ই জুন , ২০১৮

কলকাতা ও বাঁকুড়া, ১২ই জুন– মরশুমের প্রথম বর্ষণেই জলমগ্ন মহানগর। ভাসল কলকাতা সহ দক্ষিণ বঙ্গের একাধিক জেলা। মঙ্গলবার দুপুরে ঘন্টাখানেকের মুসলধারে বৃষ্টির সঙ্গে তীব্র বজ্রপাতে বাঁকুড়ায় প্রাণ হারালেন ৪জন। জলমগ্ন শহরে নাগরিকদের দুর্ভোগে দিনভর রাস্তায় দেখা মিলল না কলকাতার মেয়র বা মেয়র পারিষদ (নিকাশি) কারুর।

এদিন বৃষ্টির সঙ্গে লাগাতার বজ্রপাতের জেরে বাঁকুড়ায় তিনটি জায়গায় বজ্রপাতে ২জন মহিলা সহ মোট ৪জন প্রাণ হারান। একসঙ্গে মারা যান মা ও মেয়ে। এদিন দুপুর সাড়ে বারোটা থেকেই কালো মেঘে আকাশ ঢেকে লাগাতার বজ্রপাত শুরু হয়। জয়পুর থানা এলাকায় রাজগ্রামের বাসিন্দা লক্ষী মাঝি (৩২) ও তাঁর মেয়ে পিয়ালী মাঝি (১২) গ্রামের মাঠে গোরু চরাতে যান। লক্ষী মাঝির স্বামী ভৈরব মাঝি খেতমজুরের কাজ করেন। মেয়ে পিয়ালী স্থানীয় বালিকা বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। বাবা ভৈরব মাঝি জানান, তিনি মেয়েকে স্কুলে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু এদিন মেয়ে নাছোড়বান্দা ছিল স্কুল যাবে না বলে। পরে মায়ের সঙ্গে মাঠে গোরু চরাতে যায় সে। দুপুর দুটো নাগাদ গ্রামের মাঠের মাঝেই বাজ পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কালো মেঘ দেখে মা মেয়ে মাঠ ছেড়ে বাড়ি চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে গোরুগুলিকে এক জায়গায় করার সময়ই আচমকা সেখানে বাজ পড়ে। মাঠের মধ্যেই লুটিয়ে পড়ে তাঁরা। ঘটনাস্থলেই তাঁদের মৃত্যু হয়।

স্থানীয় মানুষজনের কথায়, লাগাতার বজ্রপাত হওয়াতে সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার করাও সম্ভব হয়নি। তীব্র আওয়াজ ও আলোর ঝলকানিতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বেশ কিছুক্ষণ পরে বাজ পড়া বন্ধ হতেই ছুটে যান বাসিন্দারা। মাটিতে পড়ে থাকা মা মেয়ের দেহ উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসকরা দুজনকেই মৃত বলে ঘোষণা করেন। অন্যদিকে সোনামুখীর নিত্যানন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা রঞ্জিত দাস (৪৫) এদিন বড়জোড়ার পখন্না বাজার থেকে সবজি বিক্রি করে ফিরছিলেন। প্রতিদিনই তিনি সবজি বিক্রি করতে যান। এদিন সাইকেলে বাড়ি ফেরার সময় বজ্রপাত শুরু হয়। তিনি বেশ কিছুটা দুরে কুলডাঙার গ্রামের একটি গাছের তলায় আশ্রয় নেন। সেখানেই বাজ পড়ে। ঘটনাস্থলেই তিনি প্রাণ হারান। পাশাপাশি প্রায় একই সময়ে ওন্দা থানার পুলিশোল গ্রামের বাসিন্দা আবদুল আলি খাঁ ( ৩৫) সাইকেলে করে বাড়ি ফিরছিলেন। গ্রামে ঢোকার আগেই বজ্রপাতে তিনি প্রাণ হারান। হকারি করে পরিবার চলতো তাঁর।



এদিন কলকাতায় দুপুর সাড়ে ৩টা নাগাদ শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। ঝাপসা হয়ে যায় রাস্তাঘাট। বৃষ্টির দাপটে বহু জায়গায় গাড়ি থামিয়ে দিতে বাধ্য হন চালকরা। সঙ্গে তীব্র বজ্রপাত চলে নাগাড়ে। ঘন্টাখানেকের তুমুল বৃষ্টি শেষে ফের শহরের বেহাল জলছবি স্পষ্ট হয়ে যায়। শরৎ বসু রোড, কালীঘাট, ই এম বাইপাস, সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের একাংশ, এম জি রোড, কাঁকুড়গাছি, গলফ্ গ্রিন এলাকা, বেহালা ঠাকুরপুকুর, বালিগঞ্জ স্টেশন চত্বর, আনন্দ পালিত রোড সহ শহরের বিভিন্ন এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেও বহু রাস্তারই জলছবির কোনও পরিবর্তন হয়নি। এর জেরে বিকালে অফিস ফেরতা যাত্রীদের তীব্র ভোগান্তির শিকার হতে হয়।

বহু জায়গায় জল ঠেলে রাস্তা পার হতে দেখা গেছে মানুষজনকে। যানের গতিও কমে যায়। একাধিক জায়গায় যানজট হয়। ডাফরিন রোডে একটি গাছ উপড়ে পড়ে রাস্তায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। কলকাতা পুলিশের বিপর্যয় মোকাবিলা বিভাগের কর্মীদের চেষ্টায় অনেকক্ষণ পর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। গোবিন্দ খটিক রোডেও একটি গাছ উপড়ে পড়ে এদিন বৃষ্টিতে।

তবে ঘন্টাখানেকের বৃষ্টিতে যে ভাবে কলকাতা ফের জলমগ্ন হয়ে উঠেছিল এদিন তাতে নিকাশির বেহাল অবস্থাই স্পষ্ট হয়েছে বলে দাবি বিরোধী কাউন্সিলরদের। তাঁদের কথায়, শুধু মুখে বললেই নাগরিকদের দুর্ভোগ কমানো সম্ভব নয়। বর্ষা আসার আগে প্রতি বছর নিয়ম মেনে শহরের সমস্ত এলাকায় নিকাশি নালার পলি তোলার কাজ করতে হয়। সেই কাজ যে এবারও কর্পোরেশনের নিকাশি বিভাগ করেনি বর্ষার প্রথম বৃষ্টিই তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। এদিন রাস্তায় দেখা মেলেনি মেয়র শোভন চ্যাটার্জি থেকে নিকাশির দায়িত্বে থাকা মেয়র পরিষদ সদস্যের। কেন বিকাল থেকে সন্ধ্যা গড়িয়েও শহরের বহু জায়গা জলমগ্ন অবস্থায় থাকল সে বিষয় কোনও বক্তব্য মেলেনি তাঁদের তরফে। কলকাতা ছাড়াও আশপাশের জেলায় বৃষ্টির জেরে একাধিক রাস্তা জলমগ্ন হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, নদীয়া, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া সহ দক্ষিণ বঙ্গের জেলাগুলিতে এদিন ব্যাপক বৃষ্টি হয়। অবশ্য পুরুলিয়া, নদীয়া সহ অন্যান্য জেলাতে তীব্র গরমের পরে বৃষ্টিতে খানিক স্বস্তি মিলেছে।

Featured Posts

Advertisement