কাশ্মীর নিয়ে কি আলোচনা হবে?

  ১৩ই জুন , ২০১৮

কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে আবার আলোচনা শুরু করার কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। গত ২৬শে মে সংবাদমাধ্যমে দেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সাক্ষাৎকারে জানানো হয়েছে, হুরিয়াৎ নেতৃত্ব রাজি থাকলে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের সঙ্গে আলোচনায় প্রস্তুত। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুনিয়েছেন, সরকার পাকিস্তানের সঙ্গেও কথা বলতে রাজি। এর সঙ্গে রাজনাথ ‘যদি’ শব্দটি যোগ করে দিয়েছেন, অর্থাৎ পাকিস্তান যদি সন্ত্রাসবাদে মদতদান থেকে বিরত থাকে তবেই তাদের সঙ্গে কথা হতে পারে। রাজনাথের এই প্রস্তাবের তিন দিন বাদেই হুরিয়াতের সৈয়দ আলি গিলানি, মীরওয়াইজ উমর ফারুক এবং মহম্মদ ইয়াসিন মালিক যুক্তভাবে এক বিবৃতি প্রকাশ করে জানান — তারাও সরকারের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী। এর সঙ্গে কাশ্মীরি নেতারা এটাও জানান যে, কেন্দ্রীয় সরকারকে কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে তাদের একগুঁয়ে মনোভাব পরিহার করতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে তিন নেতাই বলেছেন, তিন পক্ষের সঙ্গে আলোচনার প্রক্রিয়াই কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের সুযোগ উন্মোচন করতে পারে। তিনপক্ষ বলতে হুরিয়াৎ নেতারা (এক) ভারত, (দুই) জম্মু-কাশ্মীরের জনগণ এবং (তিন) পাকিস্তান বোঝাতে চেয়েছেন। রমজান উপলক্ষে কেন্দ্রীয় সরকার কাশ্মীরের বৈরীদের বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এই পটভূমিতেই কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে আলোচনার প্রস্তাবটি আবার নতুন করে সামনে আসে। বৈরীদের কিছু হামলা ছাড়া উপত্যকায় সংঘর্ষ বিরতির ঘটনা প্রথম কুড়ি দিনে মোটামুটি স্বাভাবিকভাবেই কেটেছে। তবে কাশ্মীর উপত্যকার মানুষেরা রাজনৈতিক আলোচনা সম্পর্কে খুব একটা আশাবাদী নন। কারণ অর্থপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনা ব্যতিরেকে কাশ্মীর সমস্যা নিরসন অসম্ভব। কাশ্মীরের জনগণ তাঁদের অতীত অভিজ্ঞতা থেকেই এটা মনে করেন। গত চার বছর ধরে তাঁরা প্রত্যক্ষ করছেন, কেন্দ্রে মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে কাশ্মীরের পরিস্থিতি দিন দিন ক্রমাগত অবনতি ঘটে চলেছে। কাশ্মীরের মানুষের প্রতিবাদ দাবিয়ে রাখতে সরকারের কট্টর নীতি অনুসরণের পরিণতিতে উপত্যকায় উগ্রপন্থীদের বৈরী কার্যকলাপ আরও বেড়ে গেছে। যুব সমাজের প্রতিবাদকে সরকার দমন করতে গিয়ে উলটো ফল ডেকে এনেছে।

এরই সঙ্গে নিরাপত্তাবাহিনীর বিশেষ করে সেনাবাহিনীর কার্যকলাপ মানুষের ক্ষোভে ঘৃতাহুতি দিয়েছে। মোদী জমানায় জেনারেল বিপিন রাওয়াত সেনাপ্রধান হিসাবে নিযুক্ত হবার পর তাঁর কিছু বিতর্কিত মন্তব্য ঘিরে শুধু কাশ্মীর নয়, সারা দেশেই সমালোচনার ঝড় ওঠে। সামরিক গণ্ডি অতিক্রম করে হামেশাই তাঁর রাজনীতির সীমায় অনুপ্রবেশে দেশব্যাপী মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। অর্থাৎ তাঁর মন্তব্য ও মতামতগুলি শাসকদলের হিন্দুত্ববাদী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে সঙ্গতিপূর্ণ। এধরনের মন্তব্য শাসকদলের সন্তুষ্টিবিধান করলেও বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনা ডেকে আনে। কাশ্মীরে গিয়ে বিক্ষোভ দমনে সেনাবাহিনীর কার্যকলাপ প্রশংসা করে তাদের বাহবা দেন। এতে কাশ্মীরি জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে চীন ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাঁর মন্তব্য রাজনৈতিক মহলকে চমকে দেয়। দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এধরনের মন্তব্যের পর সরকারের পক্ষ থেকে সেনাপ্রধানকে সংযত করা দরকার ছিল। কিন্তু তা হয়েছে কিনা জানা নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যদি সত্যিই পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বলার আন্তরিক সদিচ্ছা থাকে তাহলে বিপিন রাওয়াতের মন্তব্যে যে ভুল বোঝাবুঝির পরিবেশ তৈরি হয়েছে আগে তা পরিহার করা জরুরি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এস সি ও) শীর্ষ বৈঠকে চীনে গিয়ে পাক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সৌজন্যের হাসি হেসেছেন, করেছেন করমর্দনও। তদুপরি এস সি ও বৈঠকের পর সন্ত্রাসবাদ নিরসনে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তান স্বাক্ষর করেছে। সাম্প্রতিককালের মধ্যে দু-দেশের মধ্যে এটাই হচ্ছে ইতিবাচক দিক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, সন্ত্রাসবাদে মদতদান ছাড়লে পাকিস্তানের সঙ্গে কথা হতে পারে। সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কিত এস সি ও-র ঘোষণাপত্রে দিল্লি ও ইসলামাবাদের স্বাক্ষরের পর নিশ্চয়ই পাকিস্তানের সঙ্গে ভারত সরকারের আলোচনায় আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো — এরপর কি দুদেশের আলোচনার জন্য আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে?

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement