এ যেন এক তাসের দেশ! এখানে
সব কিছুই চলে উলটো পথে অশোক ভট্টাচার্য

অশোক ভট্টাচার্য   ১৩ই জুন , ২০১৮

রাজ্য জুড়ে সংবিধান, আইন, গণতন্ত্র নিয়ে নিজের খেয়ালখুশি মতো একের পর এক কাজ করে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সংবিধান ও আ‍‌ইনের কোনও তোয়াক্কা তিনি করছেন না। তিনি যেভাবে মনে করেন সেভাবেই সংবিধান ও আইনের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী নয়, পঞ্চায়েত বা পৌরসভাগু‍‌লি চলছে এ রাজ্যে তাঁরই নির্দেশে। দল, মত, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের নিরপেক্ষভাবে, নিজের পছন্দ মতো প্রার্থীকে ভোট দানের অধিকারের কথা সংবিধানে বলা থাকলেও বা পঞ্চায়েত/পৌরসভার বোর্ড যে দলের হাতেই থাকুক না কেন, সংবিধান ও আইনে সব দলের ক্ষেত্রেই সমান সুযোগ সুবিধা মর্যাদার কথা বলা হলেও, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ, বিরোধীদের জন্যে থাকবে আলাদা ব্যবস্থা। তারা এসব সুযোগ সুবিধাগুলি পাবে না। তাদের ভোটে দাঁড়াবার অধিকার থাকবে না। নিজের পছন্দ মতো ভোটও দিতে পারবেন না তারা। বিরোধী দলের বোর্ড হলেও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আর্থিক সহযোগিতাও তারা পাবে না। এমন কি ভোটে জিতে কোথাও সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও বিরোধীদের বোর্ড গঠনের অধিকারও থাকবে না। অঙ্কের সাধারণ নিয়ম আমরা সকলেই জানি — যে বে‍‌শি ভোট পায় সে জয়ী হবে, যে কম পাবে সে পরাজিত। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ, এসব অঙ্ক‍ পশ্চিমবঙ্গে চলবে না। ভোটের গণনাও হয় তারই নির্দেশে। যদি সে বিরোধী হয়, বেশি ভোট ‍ পেলেও তাকে জয়ী বলে ঘোষণা করা যাবে না। সং‍বিধানে বলা আছে রাজ্য নির্বাচন কমিশন বা রাজ্য অর্থ কমিশন এক একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ, এগুলি সব তাঁর দলীয় প্রতিষ্ঠান। তাঁর নির্দেশই এসব ক্ষেত্রেও শিরোধার্য। চলবে না সংবিধানের কোনও নির্দেশ। তিনি সংবিধানেরও ওপরে।

দার্জি‍‌লিঙের বিশেষ পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী কোনও আইন, কানুন কোনও কিছুই মানছেন না। এম ন কি তাঁর নিজের হাতে তৈরি করা গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্রেন শন আইনও। যখন দার্জিলিঙ পার্বত্য এলাকার মানুষরা ভোট দিয়ে জি টি এ-র প্রধান হিসাবে বিমল গুরুংকে নির্বাচিত করেছিলেন, তখন জি টি এ-কে আইন অনুযায়ী ন্যূনতম মর্যাদা ও ক্ষমতা না দিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে প্রথমে বিভিন্ন হস্তান্তরিত দপ্তরের ওপর হস্তক্ষেপ করা শুরু করলেন তিনি, পরে জি টি এ-র বিকল্পে কিছু জনজাতির নামে কিছু পর্যদ গঠন করে সমান্তরাল উন্নয়নমূলক ও প্রশাসনিক কাজ শুরু করলেন। নির্বাচিত জি টি এ পেল না ন্যূনতম সম্মান ও মর্যাদাও। জি টি এ-র চেয়ারম্যান হিসাবে বিমল গুরুং-এর রাজ্যে মন্ত্রীর মর্যাদা পাবার কথা, অথচ তাঁকে তা না দিয়ে, মুখ্যমন্ত্রী জি টি এ দপ্তরে তালা লাগিয়ে দিলেন। রাজ্য সরকারি ভাষা (West Bengal Official LanguageAct.) আইন অনুযায়ী নেপালি ভাষা, দার্জিলিঙ পার্বত্য এলাকায় সরকারি ভাষা। দার্জিলিঙের স্থানীয় মানুষরা একে কার্যকর করার দাবি তুলবার অপরাধে স্থানীয় মানুষের ওপর পুলিশ গুলি চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে হত্যা করেছিল। পরের ঘটনা সম্পর্কে সকলেই অবহিত আছেন। জি টি এ আইন অনুযায়ী মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাবার পর বর্তমানে জি টি এ-তে রয়েছে সরকার মনোনিত একটি প্রশাসনিক বোর্ড। যার চেয়ারম্যান বিনয় তামাং ও ভাইস চেয়ারম্যান অনীত থাপা।

আইন অনুযায়ী তাদের নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত এক বছরের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকার কথা। তারা কার্যত কেয়ারটেকার। অথচ লোকসভা নির্বাচন আসন্ন বলেই দুজন প্রশাসনিক প্রধানকে মন্ত্রী ও রাষ্ট্রমন্ত্রীর মর্যাদা প্রদান করে একটি সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে রাজ্য সরকার। আবার কোনও আইনের উল্লেখ না থাকা সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রী নিজের খুশি মতো পাহাড়ে জি টি এ-র সমান্তরালে হিল এরিয়া ডেভেলপমেন্ট কমিটি গঠন করে জি এন এল এফ নেতা মন ঘিষিংকে চেয়ারম্যান মনোনীত করেছেন। অথচ জি টি এ বা পঞ্চায়েত, কোনও আইনেই এরকম কোনও ব্যবস্থার উল্লেখ নেই। সম্প্রতি রাজ্য সরকার একটি নোটিফিকেশন জারি করে মন ঘিষিংকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা প্রদান করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর বিনয় তামাংকেও চাই, আবার মন ঘিষিংকেও। গাছেরও খাব, তলারও কুড়াবো। সত্যিই এসব বেনজির। লক্ষ্য এখন তাঁর একটিই দার্জিলিং লোকসভা আসনে জয়লাভ করা। রাজ্য সরকারের হিল এ‍‌রিয়া ডেভেলপমমেন্ট কমিটি গঠন ও মন ঘিষিংকে সভাপতি ‍‌হিসাবে ‍‌ মনোনয়ন সম্পূর্ণ বেআইনি। এর পেছনে অর্থ খরচও সম্পূর্ণভাবে আইন বিরোধী। বেআইনিভাবে গঠিত পর্ষদগুলিকে কোনও নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করেই দেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন আরও ৯৬ কোটি টাকা শীঘ্রই এই সমস্ত পর্ষদগুলিকে দেবার। এসব অর্থ কোন খাতের তা মানুষ জানতে চাইতেই পারেন। শোনা যাচ্ছে বহু কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকাও এই সমস্ত পর্ষদগুলিকে দেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক কারণেই এসব সিদ্ধান্ত তাঁর, এরসাথে পাহাড়ের মানুষের স্বার্থের কোনও সম্পর্ক নেই।

উত্তরবঙ্গে বিভিন্ন জনজাতি, ভাষা, উপভাষী মানুষের বসবাস। বহু সংস্কৃতি, উপ সংস্কৃতিও রয়েছে এখানে। সবাই চায় এসবের আরও চর্চা ও বিকাশ। এই সমস্ত মানুষরা চায় তাদের ভাষা, উপভাষা, সংস্কৃতির সরকারি স্বীকৃতি। এসবের বিকাশের জন্য প্রয়োজন আরও চর্চা, গবেষণা। মুখ্যমন্ত্রী এসবের দিকে না গিয়ে একের পর এক ঘোষণা করছেন বিভিন্ন ভাষা বা উপভাষাকে স্থানীয়ভাবে সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি প্রদানের। অথচ আজ পর্যন্ত কোথাও এই সমস্ত ভাষা, উপভাষাকে সরকারি ভাষা হিসাবে ব্যবহারে সামান্যতম উদ্যোগ নেই মুখ্যমন্ত্রীর। রাজবংশী ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে একই ভাষাকে কামতাপুরি হিসাবেও পৃথকভাবে স্বীকৃতিরও আইন তৈরি করা হলো। আবার আদিবাসীদের কুরুক ভাষার স্বীকৃতি দিয়েও শাদ্রী ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হলো না। এই মুহূর্তে উত্তরবঙ্গে দাবি উঠছে বোরো, রাভা, ধীমাল, লিম্বু, ডুকপা এরকম অনেক ভাষা বা উপভাষায় স্বীকৃতি। এই সমস্ত দাবি কোথায় গিয়ে শেষ হবে তা কেউ বলতে পারছে না।

মুখ্যমন্ত্রী যা করছেন তার সাথে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জনজাতিদের ভাষা, সংস্কৃতি, আর্থ-সামাজিক বিকাশের কোনও সম্পর্ক নেই। নিছক ভোটের জন্যেই মুখ্যমন্ত্রী এসব বিষয়ে গভীরে না গিয়ে একটার পর একটা ঘোষণা করে চলেছেন। এসব চালাকির দ্বারা কোনও মহৎ কাজ হতে পারে না। মুখ্যমন্ত্রীর এই বাস্তব সত্য উপলব্ধি করা প্রয়োজন।

বি জে ‍‌পি দলও কেন্দ্রীয় সরকারও প্রতিযোগিতা করে একইভাবে এই সমস্ত বিষয়ে নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছে। তারা কখনও পৃথক কোচবিহার রাজ্য, কখনও বা পৃথক উত্তরবঙ্গ রাজ্যের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এদের সকলেরই লক্ষ্য বাড়তি ভোট পাওয়া। উত্তরবঙ্গের জনজাতিগুলির মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, আর্থ-সামাজিক বিকাশের স্বার্থের সাথে এই দুটি দলের কোনও সম্পর্ক নেই। তাদের একটিই লক্ষ্য মানুষকে বোকা বানিয়ে ভোট নেওয়া। অথচ উত্তরবঙ্গ কেন, সারা দেশেই বিভিন্ন জনজাতি বা উপজাতিদের ভাষাগত, সাংস্কৃতিক, আর্থ-সামাজিক বহু সমস্যা রয়েছে। এই সমস্ত সমস্যাগুলির নিরসন প্রয়োজন। বামপন্থীরা আন্তরিকভাবে চায় বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি, উপজা‍‌তি, জনজাতি, ভাষা, উপভাষা মানুষের আর্থ-সামাজিকভাবে বিকাশ।

তৃণমূল কংগ্রেস দল বিরোধী শূন্য পশ্চিমবঙ্গ বানাবার যে বাহুবলি অভিযান শুরু করেছে, তা সফল হতে পারেনি নকশালবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতে। পুলিশ লাগিয়েও তাদের উদ্দেশ্য সাধিত হয়নি। নকশালবাড়ির মানুষ দেখিয়েছে সব মানুষ অর্থের প্রলোভনের কাছে আত্মসমর্পণ করে না। এক সাহসিক লড়াই লড়ে চলেছে নকশালবাড়ি। তা অবশ্যই শিক্ষণীয়। জবর দখলের রাজনীতিকে তৃণমূল কংগ্রেস কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তার একটি প্রমাণ কোচবিহারের জামালদহে সি‍ পি আই (এম)-র এক স্থানীয় নেতাকে নৃশংসভাবে খুন করার ঘটনা। মুখ্যমন্ত্রী যদি মনে করে থাকেন এই পথ ধরেই তিনি এগিয়ে চলতে থাকবেন, তাহলে তিনি ভুল করবেন। প্রতিবাদ হচ্ছে, হবেই। হবে প্রতিরোধও। নকশালবাড়ি ও জামালদহসহ অনেক গ্রামগঞ্জের মানুষরা সেই পথই দেখাচ্ছেন।

Featured Posts

Advertisement