ক্রেমলিনের উঠোনেই বিশ্বের মেলা

প্রশান্ত দাস   ১৩ই জুন , ২০১৮

মস্কো : ১২ই জুন— এ যেন হট্ট মেলার হাট। কী নেই এখানে! উৎসবের মেজাজ পুরোদস্তুর। দুটো নাগরদোলা ছাড়া কোনও কিছুই বাকি নেই। হাজার হাজার দর্শক ভিড় জমাচ্ছেন, যাচ্ছে-আসছেন। পাশের রেঁস্তোরাগুলো ভিড়ে ঠাসা। বসার জন্য একটা চেয়ারও ফাঁকা নেই। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের মিলন স্থল ক্রেমলিন।

লুঝনিকি স্টেডিয়ামের সামনে সমর্থকদের ভিড় তেমন নেই। ফাঁকা ফাঁকা। নিরাপত্তার একটু বেশিই বাড়াবাড়ি। লুঝনিকিকে রাশিয়া বিশ্বকাপের পীঠস্থান ধরে নিলে একটু হতাশ হতেই হবে। যদিও এখানেই হবে উদ্বোধনী ম্যাচ। ফাইনালও।

লুঝনিকি থেকে এগারো কিমি দূরের রেড স্কোয়ারেই প্রাণের ছোঁয়া পাওয়া যায়। সমর্থকরা তাই এখানেই ছুটে এসেছেন। ভিড় করছেন, হুল্লোড় করছেন, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক সঙ্গে নাচ করছেন গান করছেন। মস্কো মেট্রোর রেড লাইনের ওখত্রিন রিয়াদ স্টেশনের ভিতর থেকে হাজারে হাজারে সমর্থক বেরিয়ে আসছেন।

রাতের দশটা বাজলেও, এখানে দিনের ঝকঝকে আলো। তার মধ্যেও ক্রেমলিনের বাতিস্তম্ভে আলো জ্বলে উঠেছে। সেন্ট বাসিলস ক্যাথিড্রালের সামনে দিকটায় ফ্যান ফেস্টের জন্য কাঠামো তৈরি হয়েছে। ভিড় সেখানেও। এই ভিড় সামাল দেওয়ার কাজ নিরলস দক্ষতায় করছেন রাশিয়ার নিরাপত্তারক্ষীরা। কড়া নজর এঁদের। কারণ পান থেকে চুন খসলেই রে রে করে উঠবে পশ্চিমী দুনিয়া। বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই কিছু না কিছু খুঁত বের করেছে। ক্রিমিয়া নিয়ে সরাসরি সংঘাতে যেতে পারছে না পশ্চিমী দুনিয়ার প্রতিভূরা। ইউক্রেনকে মদত দিয়ে, ইউক্রেনকে নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে। সরাসরি সে দ্বন্দ্বের কথা মুখে না আনলেও, কিছু না কিছু অছিলা খোঁজে। কখনো রুশ সমর্থকদের বিশৃঙ্খলার উদাহরণ দিয়ে ভয় দেখানো হয়। কখনো বা রাস্তার সারমেয়দের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

বিরাগের কারণ যে শুধু ক্রিমিয়া তাও নয়। রাশিয়া পথের কাঁটা হয়েছে অনেকেরই। সিরিয়ায় পশ্চিমী দুনিয়ার দেশগুলির আধিপত্য তৈরির ছকে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ। সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে নাশকতার পথ করিয়ে যে দখলদারি নীতি নিয়েছিল তাতে বাধা তৈরি হয়েছে। উগ্রপন্থীদের মোকাবিলায় বাশার আল আসাদ ও রাশিয়ার মিলিত অভিযানকে বিকৃত করে প্রচার করা হয়েছে।

এই দ্বন্দ্বে শেষ ঘৃতাহুতি করেছে রুশ গুপ্তচর সের্গেই স্ক্রিপালকে নার্ভ এজেন্ট দিয়ে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধজ্ঞা পর্যন্ত জারি করে। সঙ্গী হয় ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। বিশ্বকাপের আগে এই নিষেধাজ্ঞা বড় ধাক্কা। এখানেও শেষ হওয়ার নয়। বিশ্বকাপে না খেলার পর্যন্ত হুমকি দিয়েছিল ইউরোপীয় দেশগুলি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঢোঁক গিলে খেলতে আসতে হচ্ছে।

ক্রেমলিনের এই ভিড় যদিও সেসবকে তোয়াক্কা করে না। এই ভিড়ে ব্রিটিশ, ফরাসি, রুশ, ভারতীয়, আমেরিকান সবাই তো আছে। কে কী ভাবছে তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই কোনও। কেনই বা হবে? ‘...কলঙ্ক দেখাই তাঁদের ব্যবসাগত অভ্যাস; আলো চোখে পড়ে না, বিশেষত যাদের উপর বিরাগ আছে। ভুলে যান তাঁদের শাসনচন্দ্রেও কলঙ্ক খুঁজে বের করতে বড় চশমার দরকার পড়ে না।’ এই কথার সারমর্ম বুঝেছে রুশরা। তাই কার উপর কার রোষ আছে সে সবে বয়েই গেছে! এই বিশ্বকাপ এখন মিলন মেলা। আর ক্রেমলিনের শান বাধানো উঠোন হলো তার মিলন স্থল।

কেউ তাই পাশের সার বাঁধা দোকানগুলি থেকে পুতুল কিনছে। কেউ রুশ খাবারে লোভ দিচ্ছে তাকিয়ে তাকিয়ে। তো কেউ আবার সেলফি স্টিক হাতে নির্দ্ধিধায় সেলফি তুলছে। কেউ বা একে অপরের হাত ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এর মধ্যেই মিশে গেছে একদল মিশরের সমর্থক। ফারাও সেজে এসেছেন আলি মহম্মদ ও তাঁর বন্ধু। মহম্মদের কাছে সারা দুনিয়া তো দূর অস্ত, তাঁর দলের বাকি ফুটবলাররাও যেন গুরুত্বহীন। ‘সালাহ ইজ দ্য ইজিপশিয়ান কিং’ গান করতে করতে গলা চিরে গেছে। তাও আশ্বাস পাওয়ার সুরে জানতে চাইলেন, ‘প্রথম ম্যাচ থেকেই সালাহ খেলবে? বলুন!’ ভরসা পেতেই হাত জড়িয়ে ধরলেন। এঁদের কাছে কোথায় লাগে পশ্চিমী দুনিয়ার চোখ রাঙানি! এঁদের জন্য বিশ্বকাপ আবেগের। রাশিয়ার জন্যও তাই। ক্রেমলিনের এই মিলন স্থলে ‘...না এলে এ জন্মের তীর্থদর্শন অত্যন্ত অসমাপ্ত থাকত।’

Featured Posts

Advertisement