উত্তরবঙ্গে এখন বিশ্বকাপ বসন্ত

দীপক হোড়রায়   ১৪ই জুন , ২০১৮

শিলিগুড়ি, ১৩ই জুন — গভীর অরণ্য বেষ্ঠিত তিস্তা নদীর পাড়ে সরস্বতীপুর চা বাগানেও বিশ্বকাপের থিম বাজছে। দেশের মহিলা রাগবি দলে এই বাগানের শ্রমিক কন্যারা এখন অন্যতম মুখ। যে কোনও সময় হাতি ঢুকতে পারে। তবু কোন ভয়ডর নেই স্বপ্না ওরাঁও, সান্দিয়া রাই, চন্দা ওরাঁওদের। দিব্যি রাগবির অনুশীলন চলছে। এখন ওদের মন পড়ে রয়েছে রাশিয়ার দিকে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সবাই মিলে দেখবে। এবার রাশিয়া বিশ্বকাপের ছটা তরাই ডুয়ার্সের চা বাগান জুড়েও। মা বাবার ন্যায্য পাওনার লড়াইয়ের পাশাপাশি পাহাড়, টিলা, জঙ্গল, নদী আর এক চিলতে মাঠে ফুটবল খেলে শৈশব থেকে যৌবনে পা রেখেছে শ্রমিক পরিবারের ছেলেমেয়েরা। বিশ্বকাপকে ঘিরে নিশ্চিন্তপুর চা বাগানের অশোক ওঁরাও, গৌতম লোহার, রাজেশ ওঁরাওরা ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনায় ভাগ হয়ে গেছে।

পাহাড় থেকে সমতল, তরাই ডুয়ার্স সর্বত্র রাশিয়া বিশ্বকাপের কাউন্টডাউন চলছে। শিলিগুড়িতে কফি হাউসের মতো সেই আড্ডা না থাকলেও, রয়েছে বিধান মার্কেটের উত্তরের সবার চেনা নেতাজী কেবিনের চায়ের আড্ডা। কে নেই। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া, শিক্ষা, সমস্ত ক্ষেত্রের চেনা পরিচিত মুখের ভিড় সকাল সন্ধ্যায়। এখন শুধুই ফুটবল। বিশিষ্ঠ ভ্রমণ কাহিনি লেখক গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য বলছিলেন, ‘কলিংবেল ছিল না। রাস্তা থেকেই হাঁকাহাঁকি। একসময় বাঁশের টঙে অ্যান্টেনা লাগিয়ে টিভিতে বিশ্বকাপ দেখার কি মরিয়া চেষ্টা। বাঁশের মাথা ঘোরাতে ঘোরাতে হাত ব্যথা হয়ে যেত। সেই আকর্ষণটা হারিয়ে গেছে। একটা বল নিয়ে ২২জনের বিশ্ব সেরা হয়ে ওঠার লড়াই। বিশ্বকাপ বলে কথা’।

শিলিগুড়ি পৌর কর্পোরেশন বাঘাযতীন পার্ককে সাজাবে। বড় পর্দায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানসহ খেলা দেখানো হবে। এদিন সকালে শিলিগুড়ি মহকুমা ক্রীড়া পরিষদের উদ্যোগে বিশ্বকাপ নিয়ে পদযাত্রা হয়েছে। বিশ্বকাপে রাশিয়া হট ফেভারিট না হলেও শিলিগুড়ির মানুষের মন ছুঁয়ে আছে রাশিয়া। ১৯৮৮সালে কাঞ্চনজঙ্ঘা ক্রীড়াঙ্গনে নেহরু গোল্ড কাপ খেলে গেছে তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া। রাশিয়ার মিখাইল চেঙ্খার নাম প্রবীণদের মুখে মুখে আবার ঘুরে এসেছে। কাঞ্চনজঙ্ঘা ক্রীড়াঙ্গনে সব সময় মুখে হাসি লেগে থাকা এক তরুণের দুরন্তপনা দেখেছিলো শিলিগুড়ির দর্শক। নেতাজী কেবিনের চায়ের আড্ডায় মিখাইলচেঙ্খার সেই ক্লিপিংসটাও যেন উঠে আসছে।

গত ব্রাজিল বিশ্বকাপেও দার্জিলিঙ জেলার নাম জড়িয়ে গিয়েছিল। পাহাড়ের মকাইবাড়ির চা বিশেষ পানীয় হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল ব্রাজিল বিশ্বকাপে। এই শতাব্দীতেও মকাইবাড়ি ধরে রেখেছে প্রাচীন ঐতিহ্য। এলাকার চা বাগানের শ্রমিকদের সাইরেনের আওয়াজে ঘুম ভাঙে না। স্কুলের ঘণ্টার মতো আওয়াজ ছড়িয়ে বাগানের শ্রমিক লাইনে। পাঙ্খাবাড়ি দিয়ে দার্জিলিঙ যাবার পথে চোখে পড়বে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা মকাইবাড়ি চা বাগান। রাস্তার ধারে কাউন্টার থেকে মকাইবাড়ির চা কেনার সময় এখনও কেউ কেউ বলেন এই বাগানের চা ব্রাজিলে আসা দেশ বিদেশ থেকে মানুষের প্রাণ জুড়িয়েছে। এবারও রাশিয়াতে দার্জিলিঙের চা আছে।

পাহাড়, গিটার আর ফুটবল একে অপরের পরিপূরক। পাহাড় সমতলের মেলবন্ধনের সেতু ফুটবল। সেই বহুকাল আগে থেকে ঐতিহ্য চলে আসছে। এক সময়ে শিলিগুড়িতে নিয়মিত খেলে যাওয়া প্রশান্ত সুব্বার কথায়, বিশ্বকাপ নিয়ে পাহাড়ে উৎসাহ রয়েছে। নানা দেশের পতাকায় পাহাড়ের দেওয়াল ভরে উঠছে। রাস্তায় বা ছোট মাঠে ফুটবল নিয়ে খেলার সময় সতর্ক থাকতে হয় যাতে পাহাড়ের খাদে বল গড়িয়ে না পড়ে। এতে স্কিল বাড়ে। আর গিটারের সুরেলা আওয়াজ প্রাণ ভরাতো। ফুটবল আড্ডায় নেইমার, মেসির আধিপত্যের পাশাপাশি উঁকি মারছে রোনাল্ডোর পেশিবহুল শরীরের ছবি। আর লাটসাহেবের ভবনের দৌলতে ইংল্যান্ডের প্রতিও একটা দুর্বলতা রয়েছে পাহাড়ের মানুষের। ম্যাল এখন ফুটবল নিয়ে বড় আড্ডার জায়গা।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement