সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য
করে বাঁকুড়ায় জে সি পি দিয়ে
চলছে অবাধে বালি তোলা

মধুসূদন চ্যাটার্জি   ১৪ই জুন , ২০১৮

বাঁকুড়া : ১৩ই জুন— সরকারিভাবে নদী থেকে বালি তোলার অনুমতি (পারমিট) শেষ হয়ে যাচ্ছে ১৭ই জুন। হাতে মাত্র চারটে দিন। তবে শেষ পর্যন্ত সময়সীমা বাড়বে কিনা সেচ দপ্তর বা জেলা প্রশাসন ঠিক করবে না, করবে বালি মাফিয়ারাই। কিন্তু বর্ষা যদি পুরোদমে শুরু হয়ে যায় নদী জলে ভরে উঠে তাহলে তো বালি তোলা যাবে না। তাই শেষ মুহূর্তে বালি মাফিয়ারা বাঁকুড়া জেলার দামোদর, দারকেশ্বর, গন্ধেশ্বরী, কংসাবতী নদীর বুক চিরে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে। প্রশাসন সব কিছু জেনে বুঝে দেখেও মুখ ফিরিয়ে আছে। অভিযোগ, এক একটা বালির লরির পেছনে প্রতিদিন সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ ১০০টাকা করে নেয়। খালি জয়পুর কোতুলপুরেই এখন প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিনশো লরি বালি পাচার হচ্ছে। কত টাকা রাস্তায় আদায় হচ্ছে প্রতিদিন? সহজ অঙ্ক। এর পরে আছে সরকারি ও সমস্ত স্তরের প্রভাবশালীদের হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়া। তাই মরিয়া হয়ে বালি মাফিয়ারা এই সাতদিন ধরে বালি তুলে নদী ও গ্রামের রাস্তার দফা রফা করে দিচ্ছে। বুধবার জয়পুর নদী এলাকায় এই দৃশ্য প্রকটভাবে ধরা পড়ল।

বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিতে প্রায় সমস্ত নদীতে জল ভরে যাচ্ছে। এর মাঝেই চলছে জে সি পি দিয়ে বালি তোলা। সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ আছে যে কোথাও জে সি পি দিয়ে বালি তোলা যাবে না। কিন্তু কে কার কথা শোনে। ‘ই টেন্ডারে আমরা বালির পারমিট পেয়েছি। অন্য জায়গায় প্রথমে এক মোটা টাকা, পরে মাসে মাসে গোছা গোছা টাকা গুঁজে দিতে হয়, কে আমাদের আটকাবে?’ বুধবার জয়পুরের নদী খাদানে বালি তোলার কাজে যুক্ত জনৈক কৈবর্ত্য নামে এক ব্যক্তি সরাসরি এ কথা জানান। তিনি আবার নিজে খাদান চালান না। জানান, অন্য লোকের নামে আছে। যার নামে সরকারি পারমিট তিনিও আবার আসল মালিক নয়। আসল মালিক শাসকদলের এক জনপ্রতিনিধি। এখানেই শেষ নয়, সেই জনপ্রতিনিধিকে আবার এক শাসকদলের বাইরের নেতার ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তির নির্দেশে বালির কারবার চালাতে হয়। বাঁকুড়ায় এসে পুরো কারবারটা দেখাশোনা করে সেই ব্যক্তি। যাকে শাসকদলের যুবনেতা ও সাংসদের মঞ্চে প্রায়ই দেখা যায়। জেলার তৃণমূলের নেতারাও যার ভয়ে জড়সড় হয়ে থাকেন। এই বর্ষার আগে তাই ব্যাপক হারে বালি উঠছে। সরকারি তদন্ত? একেবারেই না।

যদিও বা কখনও সরকারি গাড়ি বালির খাদানের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে তখন খাদান থেকে প্রায় ৫কিমি দূরে বালি খাদানের মালি নিযুক্ত লোকজন মোবাইলে খবর পৌঁছে দেয়। বুধবারই জয়পুরের তাঁতি পুকুরে এই দৃশ্য দেখা গেল। অপরিচিত কেউ এলেই সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে কে যাচ্ছে তার গাড়ির নম্বর কত। এদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এই প্রতিবেদকের সামনেই প্রায় ১০০গাড়ি বালি চালান হলো এই রাস্তা দিয়ে। প্রত্যেকটা গাড়িতেই বাড়তি বালি। আসার পথে যেখানে যা টাকা দেওয়ার সেই টাকা দিয়েই আসছে।

প্রশ্ন হলো বৈধ পারমিটে বালি তুললে অসুবিধা কোথায়? কিন্তু ঘটনাটা এত সহজভাবে হচ্ছে না। দেখা গেল যিনি নদীর একটা নির্দিষ্ট জায়গায় বালি তোলার পারমিট পেয়েছেন, তিনি সেই জায়গায় বালি তুলছেন না। তুলছেন পাশের জায়গার বালি। তার জায়গা অটুট অবস্থায় পড়ে রইল। পাঁচ বছরের লিজ। পাশের জায়গায় বালি তুলে সেখানকার অবস্থা যখন সঙ্গিন হয়ে পড়বে তখন নিজের পারমিট পাওয়া জায়গা থেকে বালি তুলবে। তখন নদী আর নদীর অবস্থায় থাকবে না। খালি নদীর মাঝে নয়, পাড়কেও শেষ করে দিচ্ছে বালি কারবারীরা। ফলে সামান্য জলেও নদী উপচে পড়ছে। জল ঢুকে যাচ্ছে গ্রামে। ফসল, রাস্তার দফা রফা হয়ে যাচ্ছে। অসাবধানতাবশত প্রাণ হারাচ্ছেন বহু মানুষ।

বর্ষায় বালি তোলা বন্ধ হলেও বালির কারবার কিন্তু থেকে থাকছে না। সরকারিভাবেই স্টক পারমিট বের করে বালি তুলে রাখা হবে। বর্ষার সময় সেই বালি বিক্রি করা হবে। সেই উদ্দেশ্যেই এই জোর কদমে জয়পুর, কোতুলপুর, সোনামুখী, ওন্দা, সারেঙ্গা, রাইপুরের নদীকে জে সি পি দিয়ে নদী চিরে ফেলে বালি তুলে নেওয়া হচ্ছে।

Featured Posts

Advertisement