এবার এগিয়ে
ব্রাজিল,জার্মানি

বিশ্বকাপ শুরুর মুহূর্তে বিশ্লেষণে প্রাক্তন ফুটবলার রঞ্জিত মুখার্জি

  ১৪ই জুন , ২০১৮

বিশ্বকাপ ফুটবল। পৃথিবীর সব থেকে বড় উৎসব। যে উৎসব ভুলিয়ে দেয় বাকি সব কিছু। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুধু ফুটবলে আচ্ছন্ন হয়ে থাকা। সরাসরি অংশগ্রহণ করছে ৩২দেশ। হরেক রকমের মানুষ। হরেক সংস্কৃতির ভিড় রাশিয়া জুড়ে। হাজারো রঙে রঙিন। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, এই বিশ্বকাপে লড়াইটা ব্রাজিল বনাম জার্মানির। হয়তো অনেকে চোখ কপালে তুলবেন। এ কি মেসি নেই? আমার ফেভারিটের তালিকায় কেন মেসির দেশ নেই পরে আসছি। আগে বলি, কেন ব্রাজিল আর জার্মানি। কারণ একটাই: দলগত ফুটবল। আধুনিক ফুটবলে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের থেকে এগিয়ে থাকে দলগত ফুটবলই। সেটাই এবার বাকিদের থেকে এগিয়ে রাখবে এই দুই দেশকে। ব্রাজিল গত বিশ্বকাপের ধাক্কা কাটিয়ে এবার ফেরার লড়াইয়ে। স্বপ্ন দেখাচ্ছেন নেইমার। চোট কাটিয়ে ফিরেই চমক দিয়েছেন। তবে শুধু নেইমারই নয়। গ্যাব্রিয়েল জেসুস, কুটিনহো, উইলিয়ান, মার্সেলো। টিটের দেশ সত্যিই দল হয়ে উঠেছে। আমরা যদি একটু পিছনের দিকে দেখি, দেখব বরাবর ব্রাজিলের শক্তি উইং ব্যাকরা। আক্রমণে উঠে তাঁরা বারবার সমর্থন জোগান। আর এই ব্রাজিল দল একটা ত্রিভূজ তৈরি করে আক্রমণ করছে। যা প্রতিপক্ষের জন্য চিন্তার হতে পারে।

জার্মানির এবার বিশ্বকাপ জয়ের যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। তার সবথেকে বড় কারণ কোচের নাম জোয়াকিম লো। তাঁর প্রখর ফুটবল মস্তিষ্ক জার্মানিকে এগিয়ে রাখবে কয়েক কদম। সঙ্গে জার্মানির চিরাচরিত টিম গেম। আর হার না মানা লড়াই। গত বছর বিশ্বকাপ জেতার সেটাই ছিল বড় কারণ। জার্মানি দলের এবছর পঞ্চম বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা। আর তাতেই তাঁরা ছুঁয়ে ফেলবে ব্রাজিলকে। এই কারণেই বললাম লড়াইটা ব্রাজিল বনাম জার্মানির। চমক দেখাতে পারে ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ডও। বিশেষ করে শেষ কয়েক বছরে ইংল্যান্ডে যুব ফুটবল স্তর থেকে বেশ কিছু দুরন্ত ফুটবলারের উঠে আসা সমৃদ্ধ করেছে ইংল্যান্ড জাতীয় দলকে। তবে বিশ্বকাপ জেতার জন্য একটা মানসিকতা প্রয়োজন। সেটা সব দেশের থাকে না।

বিশ্বকাপের ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে, প্রতি বিশ্বকাপে একজন করে তারকার জন্ম হয়। খেলা দেখে মনে হয়, হয়তো তাঁর পায়ের জাদু দেখার জন্যই এই বিশ্বকাপের আয়োজন করা হয়েছে। কখনও পেলে, কখনও মারাদোনা। আবার কখনও রোনাল্ডো। এবার কার? অনেকেই বলছেন এই বিশ্বকাপ মেসির বিশ্বকাপ। অস্বীকার করার উপায় নেই যতজন ফুটবলার এই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করছেন, তার মধ্যে সেরা মেসিই। বাকিদের থেকে কয়েক যোজন এগিয়ে। তবে আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, একা মেসির পক্ষে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ দেওয়া খুব কঠিন। কারণ মেসির পাশে যাঁরা খেলছেন, তাঁরা বড় মঞ্চে মেসিকে কতটা সমর্থন করতে পারবেন, আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। গত বিশ্বকাপেও মেসি নিজের সেরাটা দিয়েছিল। এই বিশ্বকাপেও নিজেকে উজাড় করে দেবেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তবে আগুয়েরো, ডিবালা, ডি মারিয়ারা কতটা সমর্থন করতে পারেন মেসিকে, তার উপরই নির্ভর করছে আর্জেন্টিনার স্বপ্ন সত্যি হওয়ার সম্ভাবনা। মারাদোনার সেই স্বপ্নের ফুটবল বিশ্বজোড়া সমর্থক তৈরি করেছিল আর্জেন্টিনার। তার আগে অবধি ব্রাজিল ছিল অনেকটাই একচেটিয়া। মেসির উত্থানের পর মাঠের বাইরেও সমর্থনের লড়াই জমেছে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি এটাও কম উপভোগ্য নয়।

বিশ্বকাপ রাশিয়ায়। সেটা আরও বেশি আকর্ষণীয়। সত্তর দশকের গোড়ার দিকে ভারতের জাতীয় ফুটবল দল রাশিয়ায় খেলতে গিয়েছিল। দুরন্ত খেলেছিলেন গোলরক্ষক তরুণ বসু। রাশিয়ানরা তাঁকে ‘উড়ন্ত পাখি’ বলেছিলেন। ১৯৭৭ সালে রাশিয়ার ক্লাব পাখতাকর তাসখন্দ খেলে গিয়েছিল মোহনবাগানের বিরুদ্ধে। মোহনবাগান মাঠে ফ্লাড লাইট উদ্বোধন হয়েছিল ওই ম্যাচটাতেই।

গত ৫০ বছরের বিশ্বকাপের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে বিশ্বকাপের লড়াইটা মূলত ইউরোপ এবং লাতিন আমেরিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আফ্রিকার দেশগুলো নব্বই দশকের শেষ দিকে কিছুটা ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। ওরা কখনই বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়নশিপের দাবিদার হয়ে উঠতে পারেনি। একই ঘটনা সত্যি এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও। হঠাৎ একটা ম্যাচে দারুণ ফুটবল, বড় দলের স্বপ্ন ভেঙে দেওয়া। কিন্তু তারপর? না তারপর আর লেখার মতো কিছুই নেই।

এই বিশ্বকাপে বেশ কিছু নতুন বিষয় দেখার জন্য আমি অপেক্ষা করে আছি। তার মধ্যে একটি ভি এ আর পদ্ধতি (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি)। অনেকেই বলছেন ভি এ আর পদ্ধতির জন্য বিঘ্নিত হতে পারে খেলার ছন্দ। আবার বেশিরভাগ মানুষ সমর্থন করছেন। বলছেন ভি এ আর পদ্ধতিতে নির্ভুল হবে সিদ্ধান্ত। বঞ্চিত হবে না কোন দল। বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কম। ক্রিকেটে ডি আর এস (ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম) দেখে আমরা অভ্যস্ত। ফুটবলে কেমন হয় সেটাই দেখার অপেক্ষায়।

আগেই বললাম বিশ্বকাপে লড়াইটা বরাবরই ইউরোপ এবং লাতিন আমেরিকার। কোনবার লাতিন আমেরিকার দল চ্যাম্পিয়ন হয় তো তারপরের বারই ছিনিয়ে নেয় ইউরোপীয় শক্তি। ফুটবল যেন যুদ্ধ। অবিরাম। অবিরত যুদ্ধ চলছে। না এই যুদ্ধে রক্ত ঝরে না। এই যুদ্ধে মৃত্যু হয় না মানুষের। এই যুদ্ধ শুধুই উপভোগের। যতদিন বিশ্বকাপ চলবে ততদিন গোটা পৃথিবী ভুলে থাকবে সব সমস্যা। তখন শুধুই ফুটবল। প্রিয় দলের জয়ে আনন্দে উদ্বেল হয়ে যাওয়া। হারের পর কান্নায় ভেঙে পড়া। ফুটবল মানেই আবেগ। ফুটবল মানেই তো ভালোবাসা। আগামী এক মাস গোটা পৃথিবীর মতো ভারতও তাকিয়ে থাকবে রাশিয়ার দিকেই। আমাদের দেশ কবে বিশ্বকাপ খেলবে জানি না। জানি না কবে নিজের দেশের হয়ে গলা ফাটাবে ভারত। ততদিনের ওইটুকু খারাপ লাগা মনের মধ্যে নিয়ে বিশ্বকাপের উন্মাদনায় গা ভাসাই সবাই।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement