ঘা নিয়ে গেলে সর্দির ওষুধ মিলছে
মমতার সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৪ই জুন , ২০১৮

বারুইপুর, ১৩ই জুন — দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার জেলা সদর হিসাবে ঘোষণা হয়েছে বারুইপুর, যদিও তৃণমূল সরকা‍‌রের আমলে তার পরিকাঠামো সামান্য কিছুই এগোয়নি। তবে মহকুমা হাসপাতালের কাছাকাছি একটি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল তৈরি হয়েছে। স্থানীয় মানুষ এবং প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষও তাকে নতুন হাসপাতাল নামেই চেনেন। অটো, টোটা এমন কী বাসে করে গেলে ‘নতুন হাসপাতাল’-এর সামনে নামবো’ — একথাই বলতে হবে। নীল-সাদা রঙের বাড়ি। প্রসূতি মহিলাদের, নাক-কান-গলা, শিশু বিভাগ — এরকম হাতে গোনা কয়েকটি বিভাগের চিকিৎসক বসেন। মেডিসিনের চিকিৎসক দেখাতে গেলে মহকুমা হাসপাতালে আসতে হবে তাও আবার সপ্তাহে ৩‍‌ দিন ডাক্তার আসেন সেখানে। এমনকি জরুরি বিভাগও নেই নতুন হাসপাতালে। জরুরি বিভাগে দেখাতে গেলে আসতে হবে মহকুমা হাসপাতালে। বেশিরভাগ দিনই জরুরি বিভাগে যে চিকিৎসকরা বসে থাকেন তারা হয় নাক-কান-গলার চিকিৎসক আর নয়তো শিশু চিকিৎসক এমনকি দন্ত চিকিৎকও বসেন জরুরি বিভাগে। বড় ধরনের কাটাছেঁড়ার ঘটনা বা হাত-পা ভাঙার রোগী এলে একজন নাক-কান-গলার চিকিৎসক কি করবেন? এহেন সুপার‍‌ স্পেশালিটি হাসপাতালই এখন এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর উন্নয়নের অন্যতম প্রতীক।

চন্দ্রা মণ্ডলের ৮ বছরের ছেলে রণদীপের রেচন অঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি কি সব বেরিয়েছিল। চুলকে চুলকে গোটা জায়গাটা ঘা ছড়িয়ে যায়। সেখানকার রস লেগে হাতেও ঘা হয়ে যায়। ছেলেটি জামা-প্যান্ট পরতে পারে না। সঙ্গে সর্দি-কাশি। চন্দ্রা অভাবী ঘরের মেয়ে। বাড়ি বাড়ি বাসন মাজার কাজ শুরু করেন চন্দ্রা। তিন বাড়ি কাজ করে ২ হাজার ৯শো টাকা রোজগার আর বাড়িতে একটি গোরু আছে তার দুধ বেচে যেটুকু আয় হয়।

এই অবস্থায় অসুস্থ বাচ্চার কষ্ট দেখে কাজের বাড়িগুলোতে একদিনের জন্য ছুটি নিয়ে সোমবার নতুন হাসপাতালে নিয়ে যায় রণদেবকে। সকাল ১০টায় পৌঁছে যায় হাসপাতালে তারপর টিকিট করে লাইনে। লম্বা লাইন। ১১ নাগাদ একজন মহিলা চিকিৎসক এসে রোগী দেখা শুরু করেন। বেলা ১২টা নাগাদ ডাক পড়ে চন্দ্রার ছেলে রণদীপের। চন্দ্রা ছেলেকে নিয়ে যায় ওই মহিলা চিকিৎসকের কাছে। ছেলের কি হয়েছে, বলার চেষ্টা করেন চিকিৎসককে। শরীরের ঘা দেখান চিকিৎসককে। সর্দি-কাশির কথাও বলেন। সব মিলিয়ে খুব বেশি হলে এক মিনিট তার মধ্যেই প্রেসক্রিপশন করে অন্য রোগীকে ডাকা হয় ঘরে। প্রেসক্রিপশন দেখে চন্দ্রা কিছুই বুঝতে পারে না। তাঁকে বলা হয় ডিসপেনসরিতে যেতে। বলা হয় ওখানে গেলে বিনা পয়সায় ওষুধ পাওয়া যাবে। সেই মতো চন্দ্রা ছেলেকে নিয়ে ডিসপেনসরিতে যায়। সেখান থেকে তাঁকে একটি কাশির সিরাপ দেওয়া হয় এবং বলা হয় আর কোন ওষুধ লেখেনি ডাক্তার। মাধ্যমিক পাশ চন্দ্রা তো অবাক! ঘা-এর জন্য কোনও মলম নেই, কোন ওষুধ নেই তাহলে ছেলের কষ্ট কীভাবে কমবে! সে আবার নতুন হাসপাতালের প্রেসক্রিপশনটি নিয়ে বাইরে ওষুধের দোকানে যায়, যদি কোনও অন্য ওষুধ থাকে। দু-তিনটি ওষুধের দোকান বলে দেয়, হাতের লেখা পড়া যাচ্ছে না।

বুধবার পর্যন্ত ওই কাশির সিরাপ খেয়ে ছেলের কষ্ট তো কমেইনি বরং ঘা আরও ছড়িয়েছে। বা‍‌ইরে বারুইপুর এলাকায় প্রাইভেট কোনও চিকিৎসককে দেখাতে গেলে খুব কম করে ২০০ টাকা ভিজিট নেবে। তার সঙ্গে রয়েছে ওষুধের দাম। মাসের এখন মাঝখান। কোনও বাড়ি থেকেই মাইনে পায়নি চন্দ্রা। এই অবস্থায় কী করবে সে। তবে এদিন একটা কথা বললো চন্দ্রা, আর কোনদিন সরকারি হাসপাতালে যাব না। ডাক্তার কোনও কথাই শোনে না। আমার ছেলেকে তো কোনও ওষুধই দিল না, ওর সারবে কি করে। একটা বাড়ি থেকে অগ্রিম ৫০০ টাকা চেয়ে নিয়ে বৃহস্পতিবার চন্দ্রা ছেলেটিকে বাইরের ডাক্তার দেখাবে। মুখ্যমন্ত্রীর উন্নয়নের প্রতীক সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের এখন এমনই হাল।



Current Affairs

Featured Posts

Advertisement