দুই জেলায় তিন
বিস্ফোরণ আহত ৩০

নিজস্ব সংবাদদাতা   ১৪ই জুন , ২০১৮

সিউড়ি ও মেদিনীপুর, ১৩ই জুন— একদিনে রাজ্যের তিন জায়গায় তিন বিস্ফোরণ। বুধবার দুপুরে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঘাটাল শহরের দুই নম্বর ওয়ার্ডে আড়গোড়ায় ঘিঞ্জি এলাকায় একটি আতসবাজির দোকানে বিস্ফোরণে গোটা এলাকা কেঁপে ওঠে। বাজি ব্যবসার আড়ালে সেখানে বোমা মজুত করা হয়েছিল বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন। এদিনই সকালে বীরভূম জেলার সদাইপুর থানার সাহাপুর গ্রামে এক খাদান শ্রমিকের বাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটেছে। তাঁর বাড়িতে বেআইনিভাবে খাদানের ডিটোনেটর মজুত করা ছিল বলে গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন। এই জেলারই রামপুরহাট পৌরসভার ৭নম্বর ওয়ার্ডের বগটুই মোড়ে বোমা বিস্ফোরণে দুজন গুরুতর জখম হয়েছেন। বোমা বাঁধার সময় আচমকা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় মানুষজন অভিযোগ করেছেন।

একদিনে এতগুলি বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত ৬জন গুরুতর জখম হয়েছেন এবং চব্বিশ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। সাধারণ কোনও দুর্ঘটনা নয়, তিনটি ঘটনার প্রত্যেকটিই বোমা অথবা বেআইনি বিস্ফোরকের মজুত থেকে ঘটে থাকলেও পুলিশ এখনও পর্যন্ত কোনও ঘটনা নিয়েই তৎপরতা দেখায়নি এবং কাউকে গ্রেপ্তারও করেনি। যদিও রামপুরহাট শহর, ঘাটাল শহর এবং সাহাপুর গ্রামের বাসিন্দারা শুধু আতঙ্কিতই নন, নিরাপত্তার অভাবে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। শাসকদলের মদতে দুষ্কৃতীরা পঞ্চায়েত নির্বাচনকে লক্ষ্য রেখে যে বোমার কারবার করছিল তারই মারাত্মক ফল ঘটে গেছে বলে অভিযোগও করেছেন। একদিনের তিন বিস্ফোরণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, রাজ্য কি বিস্ফোরকের স্তুপের ওপরে দিন কাটাচ্ছে?

এদিন সাতসকালেই বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে বীরভূমের সাহাপুর গ্রাম। হকচকিয়ে যান গ্রামের মানুষ। আকস্মিকতা কাটার পর দেখা যায় গ্রামের জামির মোল্লার বাড়ি প্রায় ধুলিসাৎ। বাড়ির পাশে থাকা ভগ্নস্তূপে ক্ষতবিক্ষত জামির মোল্লা কাতরাচ্ছেন যন্ত্রণায়। সঙ্গে সঙ্গে খবর দেওয়া হয় পুলিশে। পুলিশ এসে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায় গুরুতর জখম জামির মোল্লাকে। এলাকা সূত্রে জানা গেছে, জামির মোল্লা পেশায় খাদান শ্রমিক। বাঁকুড়ায় কর্মরত। আগের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার তিনি বাড়ি ফিরেছেন। তারপর দিনই এই ঘটনা। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, বাড়িতে বেশ কিছু ডিটোনেটের মজুত করেছিলেন এই জামির মোল্লা। তার থেকেই ঘটেছে বিস্ফোরণ। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ছিল যে বাড়ি থেকে বাইরে ছিটকে ফেলে দিয়েছে জামির মোল্লাকে। গোটা শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছে। ঘটনায় আতঙ্কগ্রস্থ গোটা গ্রাম। বিস্ফোরণস্থল লাগোয়া একটি বাড়ির বাসিন্দা জানিয়েছেন, আগের রাতে বেশ মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন জামির মোল্লা। এর আগেও জামির মোল্লার বাড়িতে মজুত ডিটোনেটর দেখা গিয়েছিল। কী কারণে, কাদের জন্য তিনি এই ডিটোনেটরগুলি বাড়িতে মজুত করেছিলেন তা অবশ্য কেউই বলতে পারেননি।

অপরদিকে রামপুরহাট পুরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বগটুই মোড়ের তালবোনা পুকুরপাড়ে বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, ওখানে জনা পাঁচেক যুবক বোমা বাঁধছিল। অসাবধনাতবশত বোমা ফেটে চারজন আহত হয়েছে। এখনো পর্যন্ত দুজনকে রামপুরহাট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকি দুজনের কোনও খোঁজ নেই। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন টোটোন শেখ নামে এক যুবকের দুটি হাত উড়ে গিয়েছে। টুটুল নামে অপর এক যুবকের সারা শরীর বোমের স্প্লিন্টারে ক্ষতবিক্ষত। দুজনেরই বাড়ি বগটুই গ্রামে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বোমার সুতলি, মদের বোতল, চাপ চাপ রক্ত। পাশেই রয়েছে একাধিক বসতি। এরকম একটি ঘনবসতি পূর্ণ এলাকায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

ঘাটালের আড়গোড়ায় বিস্ফোরণের তীব্রতা আরও বেশি ছিল। বহুদূর এলাকা পর্যন্ত কেঁপে ওঠে বিস্ফোরণে। এরপর সেখানে দীর্ঘসময় ধরে অগ্নিকাণ্ডও চলে। চারিদিক কালো ধোঁয়ায় ভরে যায়। আড়গোড়ায় দোকানবাজারের ঘিঞ্জি এলাকায় দীপা দোলই ও বিশ্বনাথ দোলইয়ের দুটি আতসবাজির দোকান বিস্ফোরণে ধংস হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, নিচের তলায় দোকান, ওপরের তলায় বসবাসের ঘর। সেই ঘরেই আতসবাজির সঙ্গে বোমা বানিয়ে রাখা হতো। কাঠের গুঁড়োয় ঢেকে পেটি পেটি বোমা এখান থেকেই বিভিন্ন জায়গায় চালান দেওয়া হতো।

সেখানেই বিস্ফোরণে দীপা দোলইয়ের ঘরের তিনদিকের দেওয়াল ভেঙে গেছে। বিশ্বনাথ দোলইয়ের ঘরের অ্যাসবেস্টসের ছাউনি উড়ে গিয়ে পড়েছে রাস্তায়। ঘরগুলির দেওয়ালের ইট ভেঙে ছিটকে পড়ে আশেপাশের পনেরো কুড়ি জন আহত হয়েছেন। একটি ইট উড়ে গিয়ে পাশের ফার্নিচারের দোকানের মালিক তাপস বেরার মাথায় পড়ায় তিনি রক্তাক্ত ও জ্ঞানহীন হয়ে লুটিয়ে পড়েছেন। তাঁকে ঘাটাল মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বিস্ফোরণস্থল থেকেই দীপা দোলইয়ের ছেলে সুভাষ দোলইকে (২৭) স্থানীয় মানুষজন উদ্ধার করে ঘাটাল মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যান। তাঁর শরীরের ৯০শতাংশ পুড়ে গেছে। প্রাথমিক চিকিৎসার পরে গুরুতর অবস্থায় তাঁকে কলকাতায় এস এস কে এম হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

বিস্ফোরণস্থলের একশো মিটার দূরে একটি প্রাথমিক স্কুল রয়েছে। বিস্ফোরণের ফলে ইটের টুকরো, ছাউনির অংশ সেখানে গিয়ে ছিটকে পড়ে। তবে দুপুরে যখন বিস্ফোরণ ঘটে ততোক্ষণে স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ায় সেখানে কোনও ছাত্রছাত্রী ছিল না। ফলে শিশুদের আঘাতের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু বিস্ফোরণস্থলের দুশো মিটার দূরে যোগদা সদসঙ্ঘ হাইস্কুলে তখন পঠনপাঠন চলছিল। শিক্ষকরা ছাত্রদের ক্লাসরুমে আটকে রেখে দেন আঘাত থেকে বাঁচাতে। বিস্ফোরণের চল্লিশ মিনিট পড়ে দমকলের তিনটি ইঞ্জিন এসে আগুন নেভানো শুরু করে।

আতসবাজির নামে এখানে যে বোমা তৈরি হতো সে বিষয়ে ঘাটালের মানুষ অভিযোগ করলেও পুলিশ এখনও পর্যন্ত তা স্বীকার করে কোনও বিবৃতি দেয়নি। আতসবাজির ব্যবসাও লাইসেন্সবিহীন বলেই অভিযোগ। ঘাটাল থানার থেকে মাত্র তিনশো মিটার দূরে এমন বেআইনি কারবার কিভাবে চলছিল? পৌরসভা ও এই ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর কেন ব্যবস্থা নেননি? স্থানীয় মানুষদের অভিযোগ, পঞ্চায়েত নির্বাচনে ব্যবহারের জন্য শাসকদলের দুষ্কৃতীরাই এই বোমা মজুত করছিল। তাই পুলিশ প্রশাসন নির্বিকার।

পুলিশ নির্বিকার থাকলেও পশ্চিম মেদিনীপুরে গত কয়েকবছরে এভাবে বোমা বিস্ফোরণে অনেক প্রাণহানিও ঘটেছে। গত অক্টোবর মাসে মেদিনীপুর শহরের ধুনারু বস্তিতে বিস্ফোরণে দুইজনের প্রাণহানি ঘটেছে। বছর কয়েক আগে পিংলার ব্রাহ্মণডিহা গ্রামে তৃণমূলনেতার বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে ২২জনের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। এছাড়াও নারায়ণগড়, কেশিয়াড়ি ইত্যাদি এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটেছে। কিন্তু পিছনে শাসকদলের হাত থাকায় পুলিশ কোনও ব্যবস্থাই নিতে পারছে না।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement