ময়দানে মান রক্ষাই
চ্যালেঞ্জ রাশিয়ার

প্রশান্ত দাস   ১৪ই জুন , ২০১৮

মস্কো : ১৩ই জুন— মিডিয়া ক্যাফে থেকে মিডিয়া সেন্টার। দূরত্ব কয়েকশো মিটার। সাপের মতো এঁকে বেঁকে যেতে হয়। একবার গ্যালারির নিচ দিয়ে। পরক্ষণে মাঠে ঢোকার রাস্তার সামনে দিয়ে। দুবার অন্তত লুঝনিকি স্টেডিয়ামের মাঠ দেখা যায় এই পথে। দেখা যায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কুশীলবদের। রং বেরঙের পোশাক পরে দাঁড়িয়ে। অপেক্ষা করছেন। কখন নির্দেশক বলবেন আর তাঁরা কখন মহড়ায় পা মেলাবেন। চোখে মুখে একটা চাপা উত্তেজনা। সব প্রস্তুতি শেষ। এবার পরীক্ষার মঞ্চ। কয়েক ঘণ্টা পরই পর্দা উঠবে। আর তাঁদের সামনে আসতে হবে। বিশ্বের সামনে আয়োজকদের মান রাখা তাঁদের দায়িত্ব।

বৃহস্পতিবার একবিংশতিতম বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন কুড়িটির বেশি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। আয়োজক কমিটির প্রধান আলেক্সেই সোরোকিন বুধবার এই সংখ্যা জানিয়েছেন। ফিফার কংগ্রেসের মঞ্চে রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন ধন্যবাদ জানিয়েছেন ‘বিশ্ব ফুটবল পরিবারকে’, বলেছেন বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞদের সাহায্য ছাড়া এমন বড় উৎসব অসম্ভব হতো।

৩২দেশের একমাসব্যাপী লড়াইয়ে মারকাটারি লড়াই শুধু মাঠেই হবে না, দুনিয়াজুড়েই চলবে আশা-নিরাশার টানাপড়েন। মর্যাদার লড়াইয়ে এবারের কাপে যেমন এগিয়ে চ্যাম্পিয়নের শিরোপা মাথায় জার্মানি, তেমনই গভীর অতল খাদ থেকে উঠে আসা ব্রাজিল। ম্যাজিশিয়ান মেসির আর্জেন্টিনার সঙ্গেই সমান তালে দৌড়োবে তরুণদের ইংল্যান্ড। হঠাৎ কোচ বহিষ্কারের আঘাত সামলে শুক্রবারই নামতে হবে স্পেনকে, আরেক দাপুটে পর্তুগালের মোকাবিলায়। মজবুত দল নিয়ে প্রহর গুণছে ফ্রান্স। আকর্ষণের আলো টেনেছে হ্যাজার্ডদের বেলজিয়াম।

এত পরিশ্রমের আয়োজনে ময়দানে রাশিয়ার মান বাঁচানোর দায়িত্ব ফুটবলারদের। অথচ সত্যি বলতে কি তাঁদের থেকে প্রত্যাশা তেমন নেই। দেশের সংবাদমাধ্যম তো একেবারে মুখের উপর বলে দিচ্ছে: বাস্তব পরিস্থিতি হলো কেউ আশা করছে না আপনাদের থেকে। কেনই বা আশা করবে? উদ্বোধনী ম্যাচে যে দুটি দল খেলবে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে সবার পিছনে। ৭০-এ আয়োজক রাশিয়া এবং ৬৭-তে সৌদি আরব। রাশিয়ার কোচ স্টানিস্লাভ চেরচেরভ চেষ্টা করছেন আশা বাঁচিয়ে রাখার। স্বপ্ন দেখিয়ে যাওয়ার। ‘বাস্তব জেনেও বলছি, আমাদের কাজ আশা বাঁচিয়ে রাখা। আমাদের নিজেদের জন্যই সেটা করতে হবে। ইতিবাচক মনোভাব যাতে বজায় থাকে তার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে’, সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলে চলেন চেরচেরভ।

নিরাশার ভগ্নস্তূপ থেকে সাফল্যের ফিনিক্স পাখির উড়ে যাওয়া কঠিন। গ্রুপ এ তুলনায় হয়ত সহজ। মহম্মদ সালাহর মিশর, সুয়ারেজের উরুগুয়ে এবং সৌদি আরব। কঠিন বলতে কেউ নেই। এরপরেও আশা দেখছেন না। একটু একটু করে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা প্রকাশ পাচ্ছে কথাতেও। একটু ছুঁতো পেলেই হাসি ঠাট্টা দিয়ে ভরিয়ে তুলতে চাইছেন রুশ কোচ। সাংবাদিক বৈঠকে মাইক সামান্য গন্ডগোল করায় বলে উঠলেন, ‘দেখলেন, মাইকটাও আমাদের প্রত্যাশার চাপ নিতে পারল না। বিগড়ে গেল।’

চারিদিকে হতাশার ছাই উড়লেও, আশার দমকা হাওয়াও আছে। পরিসংখ্যান বলছে, ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আয়োজকরা কখনও হারেনি। এর আগেও ১৯৭০ সালে সোভিয়েত রাশিয়া উদ্বোধনী ম্যাচ খেলেছিল আয়োজক মেক্সিকোর বিরুদ্ধে। ম্যাচ গোলশূন্য ড্র হয়েছিল। চেরচেরভ ও তাঁর ফুটবলাররা নিজেদের মতো করে প্রস্তুতিও সেরেছেন। প্রতিপক্ষের খেলার অনেক কাটাছেঁড়া করেছেন। রুশ মিডফিল্ডার আলেকজান্ডার সামেদভ বলছেন, ‘সৌদি আরব টেকনিক্যাল ফুটবল খেলে। নিজেদের বল পায়ে রেখে খেলতে ভালোবাসে। আমাদের দেখতে হবে ওরা যেন পায়ে বল রাখতে না পারে।’

রুশ কোচকে সমালোচনাও কম সহ্য করতে হয়নি। বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচের পরই খেলার স্টাইল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তা অবশ্য গায়ে মাখেননি। এসব নাকি হয়েই থাকে। বরং ম্যাচের আগে কতটা শান্ত থাকা যায় সেদিকে নজর রেখেছেন। একেতেই দালের কুজয়ায়েভ ও জর্জ ঝিকি চোট পেয়ে ছিটকে গিয়েছেন। ম্যাচের আগের রাতে ঘুমোতে চান শান্তিতে।

রুশ কোচকে সমর্থন জানানোর চেষ্টাও কম নয়। স্থানীয় টিভি সঞ্চালক ইভান উগ্রান্ত ‘মুশতাশে অব হোপ’ বা ‘আশার গোঁফ’ রাখা শুরু করেছেন। রাশিয়ার কোচ স্টানিস্লাভ চেরচেরভের গোঁফ রয়েছে। কোচের মতো ধুমসো একটা গোঁফ রেখে কোচের পাশে আছি জানাতে চেয়েছেন উগ্রান্ত। সেই গোঁফই এখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। নকল গোঁফ দিয়ে ছবি প্রকাশ করছেন রুশ সমর্থকরা। চেরচেরভ যা শুনে কিছুটা অবাকই হলেন। একেবারেই জানতেন না বলে জানিয়ে বললেন, ‘আমি তো জানি না। তবে কাল সবাই গোঁফ নিয়েই আসবেন আমাদের সমর্থন করতে।’ ‘পাশে আছি’ এই কথাটাই জানানোর জন্য গান বেঁধেছেন সেমেন স্লিপাকোভ। লড়াইয়ের আগে হার মানতে রাজি নয় রুশরা। বিশ্বকাপের আয়োজনে প্রকাশ পেয়েছে তা। সম্ভবত উদ্বোধনী ম্যাচেও দেখা যাবে সেই অদম্য লড়াই।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement