ঐতিহাসিক বৈঠক

  ১৪ই জুন , ২০১৮

অবশেষে আলোচনার পথেই কোরিয়া উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও গণতান্ত্রিক কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি কিম জঙ উনের মধ্যে বৈঠকের মধ্য দিয়ে। কয়েক সপ্তাহ আগে যা কল্পনা করাও ছিল কঠিন সেই ঐতিহাসিক ঘটনাই বাস্তবে ঘটল সিঙ্গাপুরের হোটেলে। দুই রাষ্ট্রনায়ক খোলা মনে কথা বললেন। কোরিয়া উপদ্বীপে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুজনেই তাঁদের দায়বদ্ধতার কথা উচ্চারণ করলেন, এমনকি যৌথ বিবৃতি দিয়ে তাদের সন্তুষ্টির কথা এবং ধাপে ধাপে লক্ষ্যে পৌঁছানোর কথা বিশ্বকে জানিয়েছেন। এবিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, গোটা বিশ্ব উদ্‌গ্রীব হয়ে তাকিয়ে ছিল এই বৈঠকের দিকে। নিঃসন্দেহে এটা ছিল ইতিহাসের নজিরবিহীন ঘটনা। তাছাড়া বৈঠকের দিন ঠিক হবার পরেও এক সময় বৈঠক ভেস্তে যাবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। যাইহোক শেষপর্যন্ত দুপক্ষেরই সদিচ্ছার ফলে বৈঠক হয়েছে এবং তার থেকে উঠে এসেছে ইতিবাচক আশ্বাস। শেষপর্যন্ত এই আশ্বাস বাস্তবে রূপ পাবে কিনা তা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। আপাত দুনিয়া খুশি যে, দুই বিবদমান পক্ষই কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে পদক্ষেপ নেবার কথা বলেছেন।

কোরীয় উপদ্বীপের সমস্যার সূত্রপাত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে। প্রথমে জাপানি সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন পরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনে অখণ্ড কোরিয়ার একাংশ দখল নেয় আমেরিকা। সেখানেই (দক্ষিণ কোরিয়া) গঠিত হয় আমেরিকার পুতুল সরকার এবং রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এই খণ্ডকে। অপরদিকে জাপ ও মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ লড়াই করে মাতৃভূমির অখণ্ডতা রক্ষায় ব্যর্থ হন কোরিয়ার মানুষ। এই বিপ্লবী যোদ্ধারা রক্ষা করে যে অংশকে সেই অংশই আজ গণতান্ত্রিক কোরিয়া। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রে কোরিয়া ভাগ হলেও দুই কোরিয়ার সাধারণ মানুষ এই বিভাজনের বিরুদ্ধে। তাঁরা মনেপ্রাণে চান দু‍‌ই কোরিয়া আবার এক হয়ে এক দেশে পরিণত হোক। বস্তুত গোড়া থেকেই দুই কোরিয়ার একীকরণের দৃঢ় অবস্থান নিয়ে আছে গণতান্ত্রিক কোরিয়া। কিন্তু এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় বাধা আমেরিকা। আমেরিকা কোনও অবস্থাতেই দুই কোরিয়াকে এক হতে দিতে চায় না। দক্ষিণ কোরিয়া যাতে কোনোভাবেই এক হতে না পারে অথবা গণতান্ত্রিক কোরিয়া যাতে বিভাজনের সীমানা তুলে দিয়ে দুই কোরিয়াকে এক দেশে পরিণত করতে না পারে তার জন্য গোড়া থেকেই দক্ষিণ কোরিয়ায় সামরিক ঘাঁটি বানিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে আ‍‌মেরিকা। প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন আছে সেখানে। আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রে সাজিয়ে রাখা হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়াকে যাতে গণতান্ত্রিক কোরিয়া কোনোভাবেই হস্তক্ষেপ করতে না পারে।

দুই কোরিয়ার একীকরণের বিরুদ্ধে মার্কিন অবস্থানের মূলে তাদের সাম্রাজ্যবাদী নীতি। চীনের নাকের ডগায় বসে চীনের রক্তচাপ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটা মোক্ষম ব্যবস্থা। তাই আমেরিকা দুই কোরিয়ার বিবাদকে চরম শত্রুতার পর্যায়ে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে। আর তার সুবাদে কোরিয়াকে তাদের সামরিক ঘাঁটি বানিয়ে কোরিয়া উপদ্বীপে যুদ্ধের উন্মাদনা জিইয়ে রাখার ব্যবস্থা করে। একাজে তাদের প্রধান সহযোগী জাপান। প্রতি মুহূর্তে মার্কিন হুংকার ও দখল করার হুমকির মধ্যে আত্মরক্ষার তাগিদে গণতান্ত্রিক কোরিয়া সকল বাধা অতিক্রম করে পরমাণু অস্ত্র গবেষণা চালিয়ে আজ পরমাণু অস্ত্র শক্তিধর দেশ। তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় খোদ আমেরিকাও। ঘুম ছুটে যায় আমেরিকার। মুখে হুমকি দিলেও একরকম বাধ্য হয়েই আলোচনার টেবিল বেছে নিতে বাধ্য হয় আমেরিকা। অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞা থেকে বেরিয়ে দেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চায় গণতান্ত্রিক কোরিয়া। এমন এক বাস্তবতার মধ্যেই আলোচনা শুরু। আমেরিকার দাবি গণতান্ত্রিক কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্র ত্যাগ করতে হবে। কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করতে হবে। তেমনি গণতান্ত্রিক কোরিয়া চায় দক্ষিণ কোরিয়া থেকে মার্কিন সেনাঘাঁটি ও সেনা প্রত্যাহার হোক। তেমনি বন্ধ হোক সামরিক মহড়া এবং প্রত্যাহৃত হোক নিষেধাজ্ঞা। এই বিস্তৃত প্রেক্ষাপটেই অ‍‌লোচনার সূত্রপাত। প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও নির্দিষ্টভাবে কোনও পদক্ষেপের কথা শোনা যায়নি। ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই কাজ হবে। অন্তত সারা বিশ্ব সেটাই প্রত্যাশা করে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement