চে গুয়েভারা বিপ্লবের ধ্রুবতারা

তাপস সিনহা   ১৪ই জুন , ২০১৮

‘বিপ্লবী হতে চাও? বিপ্লবের প্রথম শর্ত,শিক্ষিত হও।’

‘যখনি তুমি অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে জ্বলে ওঠো, তখনি তুমি আমার একজন সহ-যোদ্ধা’।

এটাই ছিল কমানদান্তের বিপ্লবী শিক্ষা।

লাতিন আমেরিকার বলিভিয়াতে ৫১ বছর আগে থেমে গিয়েছিল তাঁর জীবন। কিন্তু থামেনি তাঁর আদর্শ। আজও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রতিবাদের আইকন তিনি। যতদিন সাম্রাজ্যবাদ, ততদিন চে গুয়েভারা।

চে গুয়েভারা বিপ্লবের ধ্রুবতারা। রূপকথার মতো সত্যের জনকের নাম চে। কালের গণ্ডি পেরনো এক বিপ্লবী অগ্নিপুরুষ। গোটা দুনিয়ার শোষিত মানুষের কমানদান্তে। এই দেশের এই বাংলারও।

কিউবা বিপ্লবের প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ১৯৫৯ সালের ২৮শে ডিসেম্বর সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব লাস ভিয়াসের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণ আজও কিউবার নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন দেখার দিশারি। আজও আমাদের শিক্ষা। আপাদমস্তক সামরিক পোশাকে সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘আজ আমাকে এখানে যে মর্যাদায় ভূষিত করা হলো, তা শুধু আমি বিনম্রভাবে এ দেশের জনগণের পক্ষ থেকে গ্রহণ করতে পারি, ব্যক্তি হিসাবে নয়।’

এই নতুন কিউবায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ভূমিকা কী হওয়া উচিত? আমি বলব, ‘বিশ্ববিদ্যালয়কে ভেঙেচুরে ভিন্ন ধাঁচে গড়ে তোলার সময় এসেছে। কালোদের, মিশ্র বর্ণের, শ্রমিকদের, কৃষকদের জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুয়ার খুলে দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় হবে গণমানুষের। মনে রাখতে হবে, এই বিশ্ববিদ্যালয় কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয়, এটি কিউবার জনগণের সম্পত্তি। বিজয় হলে কেবল জনগণেরই হবে। জনগণ এখন জানে যে, তারা অপ্রতিরোধ্য। আজ তারা আশায় বুক বেঁধে এদিকে তাকিয়ে আছে, বিশ্ববিদ্যালয়কেই আভিজাত্যের মুখোশ খুলে তাদের হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানাতে হবে। হয় আপামর জনসাধারণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দুয়ার খুলে দাও, নয়তো শুধু দুয়ার খোলো। জনগণই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের মতো করে গড়ে নেবে।’ এটাই ছিল চে গুয়েভারার শিক্ষা।

দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষের উজ্জ্বল স্বাক্ষরে শুধুই পরিচিত নাম ‘চে’। জীবন জয়ের সংগ্রামী ধ্রুবতারা, আর্নেস্তো চে গুয়েভারা। ১৪ই জুন ১৯২৮ সাল। আর্নেস্তো গুয়েভারা লিঞ্চ ও সেলিয়া ডে লা সেরনার ঘরে জন্ম নিল এক শিশু লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী ইতিহাসের জ্বলজ্বলে এক নক্ষত্র। জন্ম নিল দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষের উজ্জ্বল স্বাক্ষরের পরিচিত একটি নাম চে। আর্জেন্টিনার প্রথা অনুযায়ী বাবার নামানুসারে রাখা হলো তাঁর নাম আর্নেস্তো গুয়েভারা।

বিপ্লবের পোড়া গন্ধ এসে নাকে লাগলো চের। ঘুরে দেখতে ইচ্ছা জাগল সারা লাতিন আমেরিকা। সঙ্গী ছোটবেলার বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদোকে নিয়ে লা পদেরোসা (LAPODEROSA) মোটর সাইকেলে পুরো লাতিন আমেরিকা পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা করলেন চে। পুরানো একটা মোটর সাইকেলের পিঠে চড়ে বেরিয়ে পড়লেন দুই বন্ধু। চের বয়স তখন ২৩ বছর। চিলি পৌঁছালেন আন্দিজ পর্বতমালা অতিক্রম করে। একপর্যায়ে গোড়া থেকেই সমস্যা সৃষ্টি করতে থাকা মোটর বাইকটি পরিত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। অবৈধভাবে বলিভিয়াগামী একটা মালবাহী জাহাজে চেপে বসলেন দুজনে। এখানে বিশাল আয়তনের খনি চুকুইকামাতা দেখার সুযোগ মিলল। উত্তর আমেরিকানদের পরিচালিত এই খনিতে সাধারণ শ্রমিকদের বঞ্চনার চিত্র পরিষ্কার হয়ে উঠল। অকুতোভয় চে এখান থেকে রওনা হলেন পেরুর উদ্দেশে। একে একে পাড়ি দিলেন টিটাকাকা হ্রদ, কুজকো আর মাচু পিচু। তারপর আমাজনের ভাটি ধরে চলে এলেন সান পাওলোর কুষ্ঠরোগীদের কলোনিতে। এত বছর পরও সেখানকার কুষ্ঠরোগীরা স্মরণ করে অদ্ভুত দুজন মানুষের কথা, দস্তানা ছাড়াই যারা তাদের সঙ্গে করমর্দন করেছিল, ফুটবল খেলেছিল। তাদের তৈরি করে দেওয়া ভেলায় চড়েই আমাজনের ভাটি ধরে যাত্রা অব্যাহত থাকল অভিযাত্রীদের। জুলাইয়ের শেষে একসঙ্গে সাত মাস ভ্রমণের পর কারাকাসে পৌঁছে বিচ্ছিন্ন হলেন দুজন। চের হাতে তখন মাত্র ১ ডলার। মাচু পিচুর ধ্বংসাবশেষ দেখার সময় রেড ইন্ডিয়ানদের কষ্ট উপলব্ধি করে তিনি বলেছিলেন, ‘এই ভ্রমণের কারণে আমি আবিষ্কার করেছি দারিদ্র, পুষ্টিহীনতা আর প্রতিনিয়ত নিপীড়নের কারণে যেসব শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে তাদের সুস্থ করে তোলা এককথায় অসম্ভব। ১৯৫২ সালে বুয়েনস আয়ার্স থেকে ডাক্তার হয়েই পুরো লাতিন আমেরিকার সাধারণ মানুষের জীবন-সংগ্রাম উপলব্ধির জন্য পরিভ্রমণ। বিপ্লব অনিবার্য—এই বোধে পৌঁছাতে দীক্ষা নিয়েছিলেন মার্কসবাদে।

১৯৫৫ সালের ২৫শে নভেম্বর থেকে ২রা ডিসেম্বর সিয়েরা মায়েস্ত্রা পাহাড় থেকে কিউবার বাতিস্তা সরকারকে উৎখাতের পরিকল্পনায় কিউবান বিপ্লবীদের সঙ্গী এবং চিকিৎসক। ১৯৫৭ সালের জুলাইতে সশস্ত্র বিপ্লবী বাহিনীর প্রথম কমান্ডার। ১৯৫৯ সালে তীব্র সংগ্রামী লড়াইয়ে বাতিস্তা সরকারের পতন। চে তখন নতুন বিপ্লবী সরকারের অন্যতম নেতা।এরপর জাতীয় ভূমিসংস্কার ও শিল্প দপ্তরের প্রধান। জাতীয় ব্যাঙ্কের সভাপতি, শিল্প দপ্তরের মন্ত্রী। ক্ষমতা গ্রহণের পর চে গুয়েভারাকে প্রথম কিউবার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করেন ফিদেল কাস্ত্রো।

চে বলতেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আমার জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল। মধ্যবিত্ত শ্রেণির বাসিন্দা, সেদিনের সেই যুবক ডাক্তার আর্নেস্তো একসময় তোমাদের মতোই স্বপ্ন দেখত। সংগ্রাম আমাকে বদলে দিয়েছে, আমি বিপ্লবের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছি, জনগণের মিছিলে এসে দাঁড়িয়েছি। আমি আশা করি, তোমরা যারা আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চালিকাশক্তি, তারা একে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেবে। এটি কিন্তু তোমাদের জন্য কোনও হুমকি বা দুশ্চিন্তার কারণ নয়। আমি শুধু বলতে চাই যে, ইউনিভার্সিটি অব লাস ভিয়াসের শিক্ষার্থীরা যদি জনগণের ও জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী বিপ্লবী সরকারের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়,তবে সেটি কিউবার সাফল্যের টুপিতে আরেকটি পালক যোগ করবে।’

এভারেস্ট জয় প্রেরণা জুগিয়েছিল চে গুয়েভারাকেও। বলিভিয়ার জঙ্গলে গেরিলা বাহিনীকে তিনি বারে-বারে উদ্দীপ্ত করতেন এভারেস্টকে হারাতে মানুষের মরণপণ লড়াইয়ের কথা বলে। বলিভিয়ার লড়াইকে তিনি তুলনা টানতেন এভারেস্ট জয়ের সঙ্গে। বলতেন, বারংবার হেরে মানুষ কী কখনও ছেড়ে দিয়েছেন এই চরম ঝুঁকির বিপজ্জনক লড়াই! গেরিলা যুদ্ধও অনেকটা তেমন, একদিন ‌আমরা জিতবই। চে বলতেন, ‘আমার পরাজয় মানে এই নয় যে জিত হবে না। কত মানুষ এভারেস্ট উঠতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু মোদ্দা কথা হলো: মানুষই এভারেস্ট জয় করেছেন’।

আর সেই জয়ের জন্যই ১৯৬৫ সালের এপ্রিলে অন্যান্য দেশের মুক্তির সংগ্রামে স্বশরীরে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে কিউবা ত্যাগ। কিছু সময় আফ্রিকার কঙ্গোতে অবস্থান এবং পরে ফিদেল কাস্ত্রোর ব্যবস্থাপনায় গোপনে কিউবায় প্রত্যাবর্তন। ১৯৬৬ সালের নভেম্বরে বলিভিয়ার নিপীড়িত মানুষের জীবনযুদ্ধে ছদ্মবেশে বলিভিয়ায় প্রবেশ। কিউবান বিপ্লবী ও বলিভিয়ার নিপীড়িত মানুষদের নিয়ে গেরিলা বাহিনী গঠন ও বলিভিয়ার সামরিক সরকারের উৎখাতের জন্য গেরিলা অভিযান শুরু। একের পর এক সফল অভিযান। সারা বিশ্ব তখন আন্দোলিত। নিদারুণ ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ প্রতিকূল সময়ের এক বিরল যোদ্ধা ও সেনাপতি। ৮ই অক্টোবর ১৯৬৭ সালে আমেরিকার বংশবদ প্রতিক্রিয়াশীল বলিভিয়ান সামরিক বাহিনীর হাতে আহত এবং ৯ই অক্টোবর ওয়াশিংটনের নির্দেশে সরাসরি গুলির আদেশে নিহত।

কী ছিল চে গুয়েভারার স্বপ্ন? বন্দি চে-র কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কেন তিনি এসেছেন বলিভিয়ায়? চে-র পালটা প্রশ্ন ছিল, ‘আপনি কি বলিভিয়ার কৃষকদের জীবনের করুণ দশা দেখতে পাচ্ছেন না? তাদের অবস্থা প্রায় বর্বর যুগের মানুষদের মতো, দারিদ্রপীড়িত এমন এক জীবন যা হৃদয়কে উদ্বেলিত করে। একটি মাত্র ঘর, সেখানেই থাকা-ঘুমানো-রান্নাবান্না, পরবার মতো জামা তাদের নেই, প্রায় পশুবৎ এই জীবন।’ প্রশ্নকর্তা তাঁকে বলেছিলেন যে, কিউবার কৃষকদের অবস্থাও তো প্রায় একইরকম। জবাবে চে বলেছিলেন, ‘সেটা এখন আর সত্যি নয়। আমি অস্বীকার করছি না যে, কিউবাতে দারিদ্র নেই, তবে কৃষকরা অন্তত জীবন পালটাবার আশা ফিরে পেয়েছে। অন্যদিকে বলিভিয়ার কৃষকদের জীবন আশাহীন এক অস্তিত্ব, জন্মেই যে-অন্ধকার তারা দেখে, মৃত্যুও ঘটে সেই অন্ধকারে। তুমি কিউবান না আর্জেন্টাইন? চে-র উত্তর হাসিমুখে—আমি কিউবান, আর্জেন্টাইন, বলিভিয়ান, পেরুভিয়ান, ইকুয়েডরিয়ান ...ইত্যাদি, বুঝতে পারছো নিশ্চয়ই। তাঁর দলে বিদেশি যোদ্ধা রয়েছেন এমন অভিযোগের উত্তরে সহবন্দিদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে চে বলেছিলেন, ‘কর্নেল, এদের দিকে তাকিয়ে দেখুন, জীবনে যা চাইবার কিউবায় সবকিছুই তাদের ছিল, কিন্তু এখানে তারা এসেছে কুকুর-বিড়ালের মতো মৃত্যুবরণ করতে।’ চে-র সেই বিপ্লবী দলে ছিলেন উইলির মতো বিপ্লবী, ছায়াসঙ্গী হয়ে চে-র পাশে সদা-বিরাজমান, এমনকি মৃত্যুতেও তাঁর সঙ্গী। ছিল খাপ-খোলা তরবারির মতো তানিয়া, জার্মান-আর্জেন্টিনিয়ান বংশোদ্ভূত যে-তরুণী হয়েছিল গেরিলা কমান্ড্যান্ট, যাঁর দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছিল শনাক্তের অযোগ্য। অপার এক ভালোবাসায় সকল কিছু ত্যাগে এঁরা হয়ে উঠেছিলেন একেবারেই বেপরোয়া, অনন্য।

১৯৬৭ সালের ১২ই অক্টোবর মার্কিন বিদেশ দপ্তরের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: ‘গুয়েভারা’স ডেথ, দ্য মিনিং অব ল্যাটিন আমেরিকা’। সেই অক্টোবরেই চের মৃত্যুসংবাদ গোটা দুনিয়া জানতে পারে। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা তখন লিখেছিল, ‘একজন মানুষের সঙ্গে সঙ্গে একটি রূপকথাও চিরতরে বিশ্রামে চলে গেল।’ কথাটা সত্য হয়নি। কমরেডের মৃত্যুর পর কিউবায় লাখো জনতার সামনে আবেগঘন কণ্ঠে ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, যারা মনে করছে, চে গুয়েভারার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তাঁর আদর্শ বা তাঁর রণকৌশলের পরাজয় ঘটেছে, তারা ভুল করছে। ঠিকই। আজ শোষণ, বৈষম্য ও পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছে চের ছবি। অতীতের যে কোনও সময়ের চেয়ে সারা বিশ্বে চে এখন অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক, অনেক বেশি জাগ্রত। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে, প্রতিবাদে ও সংগ্রামের রক্তধারায় মিশে আছেন চে। মানুষের জাগরণে অনুপ্রেরণা, প্রণোদনা হয়ে প্রতিদিনের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। শুধু লাতিন আমেরিকা নয়, সারা বিশ্বের নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানুষের বিপ্লব, বিদ্রোহ ও উত্থানের আরও শক্তিশালী সহযাত্রী হয়ে ফিরে এসেছেন কমানদান্তে আর্নেস্তো চে গুয়েভারা।

চে-র মৃত্যুতে তাঁকে বিদায় জানিয়ে নেরুদা লিখেছিলেন ‘এক বীরের মৃত্যুতে বিষন্নতা’ নামে কবিতাটি:

এই ইতিহাসে যারা বাস করতাম

এই মৃত্যু এবং পুনরুত্থান

আমাদের অবরুদ্ধ আশা

যারা বেছে নিয়েছিলাম যুদ্ধ।

যারা দেখতাম পতাকাগুলো বড় হচ্ছে

জানতাম যারা সবচেয়ে শান্ত

তাঁরাই আমাদের একমাত্র বীর...

Featured Posts

Advertisement