১৮ই জুন রাজ্যে ট্যাক্সি ধর্মঘট আন্দোলনই পথ

জীবন সাহা   ১৪ই জুন , ২০১৮

১৮ই জুন ২০১৮ ট্যাক্সি ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্যাক্সি ওয়ার্কার্স ফেডারেশন (সি আই টি ইউ) ও ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্যাক্সি অপারেটার্স কো-অর্ডিনেশন কমিটি (এ আই টি ইউ সি)। গত ১২ই এপ্রিল শ্রমিক ভবনে সকল পরিবহণ ফেডারেশনের যৌথ কনভেনশন থেকে ২৬শে এপ্রিল পরিবহণ ভবন অভিযান এবং ট্যাক্সি শ্রমিকদের রক্ষার দাবিতে যৌথ ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২৬শে এপ্রিল ২০১৮ পরিবহণ ভবন অভিযান হয়েছে, সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার থেকে প্রায় ৩ হাজার পরিবহণ শ্রমিক মিছিল করে পরিবহণ ভবনে আসলে পুলিশ রাস্তা আটকায়, সেখানেই সারাক্ষণ রাস্তা অবরোধ করে সভা চলে। প্রতিনিধিদল ডেপুটেশনে যায়, মন্ত্রী অনুপস্থিত থাকায় সচিবের কাছে দাবিপত্র দেওয়া হয়। ট্যাক্সি ধর্মঘট সফল করতে গত ২৭শে মে শ্রমিক ভবনে ট্যাক্সিচালকদের সভা করে প্রচার আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। পোস্টার, লিফলেট বিলি, মাইক প্রচার, স্ট্যান্ডসভা ইত্যাদির মাধ্যমে প্রস্তুতি এমন স্তরে পৌঁছেছে যে, ধর্মঘট সফল হতে সময়ের অপেক্ষা। এই ধর্মঘট সফল করতে সমর্থন করেছে বেঙ্গল ট্যাক্সি অ্যাসোসিয়েশনসহ অন্যান্য ট্রেড ইউনিয়ন। একই দিনে ট্রাক ধর্মঘট ডেকেছে মালিকদের সংগঠন, ১৮ই জুন সূচনা, পরিবহণ শ্রমিকদের আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ আবার ছড়িয়ে যাবে সকল ক্ষেত্রে।

আগের ধর্মঘট থেকে শিক্ষা নেয়নি সরকার

২০১৪ সালের ৭ই আগস্ট কলকাতাতে ভাড়া বৃদ্ধি, পুলিশি জুলুম, ৩০০০ টাকা রিফিউজাল ফাইনের বিরুদ্ধে মিছিল করে ট্যাক্সি শ্রমিকেরা, ডোরিনা ক্রশিং থেকে কলেজ স্কোয়ার পর্যন্ত মিছিলে সকল ট্যাক্সিচালক যোগ দেওয়ায় কার্যত ট্যাক্সি ধর্মঘট হয়ে যায়। স্বতঃস্ফূর্ত মিছিলে লাঠিচার্জ করে পুলিশ, তিনজন নেতৃত্ব সহ ২৫ জন ট্যাক্সিচালককে গ্রেপ্তার করে। আন্দোলনের চাপে পুলিশ জামিন দিতে বাধ্য হলেও মামলা এখনও চলছে। ৯ই আগস্ট, ২০১৪ কনভেনশন থেকে ঠিক হয় লাগাতার ধর্মঘটের, পুলিশি জুলুমের বিরুদ্ধে ১৮ই সেপ্টেম্বর থেকে লাগাতার ধর্মঘটে যোগ দেয় ট্যাক্সিচালকেরা। ট্যাক্সি ধর্মঘটের সমর্থনে ১৯শে সেপ্টেম্বর সফল হয় রাজ্যব্যাপী পরিবহণ ধর্মঘট। লাগাতার ধর্মঘটে ভীত হয়ে সরকার ভয়-ভীতি প্রদর্শন শুরু করে, শ্রমিকেরা সিদ্ধান্ত নেয় ২২শে সেপ্টেম্বর মোটর ভেহিকেলস ভবন অভিযানের। হাজার হাজার ট্যাক্সিচালকের অংশগ্রহণের ফলে রাস্তা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু ওলা, উবেরের মতো কর্পোরেট সংস্থার তাঁবেদার রাজ্য সরকার ট্যাক্সিচালকদের দাবি আজ পর্যন্ত মানেনি।

কলকাতার ট্যাক্সি আক্রান্ত

কেন্দ্রীয় সরকারের আনা কর্পোরেট স্বার্থবাহী দানবীয় মোটর ভেহিকেলস অ্যামেন্ডমেন্ট বিল পাশের আগেই এই রাজ্যে চালকদের উপরে জেল, জরিমানা, লাইসেন্স সাসপেন্ডের মতো ভয়ানক শাস্তির প্রয়োগ শুরু করেছে সরকার, বৃদ্ধি পেয়েছে পুলিশি জুলুম। রিফিউজাল, নো পার্কিং, সিগন্যাল ফেল প্রভৃতি কারণে ফাইন দিতেই শেষ হয়ে যায় সারা মাসের আয়। ডিজেলের দ্বিগুণ মূল্যবৃদ্ধি, ট্যাক্স ও বিমা তিনগুণ বৃদ্ধি হলেও ২০১২ সালের পরে ট্যাক্সির ভাড়া বাড়ায়নি এক পয়সাও উপরন্তু ওয়েটিং চার্জ কমিয়েছে। ওলা উবেরের অনিয়ন্ত্রিত পারমিট, যেমন খুশি ভাড়ার ফলে কলকাতার হলুদ ট্যাক্সি ধ্বংসের মুখে। এক সময় কলকাতা শহরে এক লক্ষ হলুদ ও কালো-হলুদ ট্যাক্সি চলত আজ কমতে কমতে মাত্র ৩৫ হাজারের মতো দাঁড়িয়েছে। কর্মচ্যুত হাজার হাজার শ্রমিক। প্রথম প্রথম জোর করে ইউনিয়ন দখল করলেও আজ এই সকল শ্রমিকদের জন্য কোনও দায়িত্ব পালন করে না শাসকদলের নেতারা বা তাদের তাঁবেদার ইউনিয়ন। প্রি-পেডের নামে টাকা তুলছে, স্ট্যান্ডে স্ট্যান্ডে তোলাবাজির শিকার, শাসকদলের নেতা-কর্মীদের হাতে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন চালকেরা। সামাজিক সুরক্ষার খাতে কয়েক শত কো‍‌টি টাকা জমা থাকলেও বামফ্রন্ট সরকারের করা সামাজিক সুরক্ষার ন্যায্য প্রাপ্য চালকদের দিচ্ছে না সরকার, নতুন করে কোনও নাম নথিভুক্ত করা হচ্ছে না। বামফ্রন্টের সময়ে ১৫ বছরের পুরাতন ট্যাক্সি পরিবর্তন করতে ২০ হাজার টাকা সাবসিডি দিয়ে নতুন ট্যাক্সি তুলে দেওয়া হতো চালকদের হাতে, এখন পুরাতন ট্যাক্সির পারমিট বাতিল করে দিচ্ছে, কাজ হারাচ্ছে ট্যাক্সিচালক। ট্যাক্সি স্ট্যান্ড তুলে দিয়ে পার্কিং ফিস চাপানো হচ্ছে চালকদের উপরে। আঞ্চলিকতার ধোয়া তুলে লাইসেন্স রিনিউ করতে বাধা শুরু হয়েছিল, আজ কয়েকগুণ ফিস বৃদ্ধি করা হয়েছে লাইসেন্সের।

ট্যাক্সি শ্রমিকদের দাবি

১) অবিলম্বে ট্যাক্সি ভাড়া ও ওয়েটিং চার্জ বৃদ্ধি করতে হবে।

২) ট্যাক্সি আন্দোলনের নেতা ও ট্যাক্সিচালকদের উপর থেকে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

৩) ট্যাক্সিচালকদের উপর কলকাতা, হাওড়াসহ রাজ্যের সর্বত্র পুলিশের জুলুম বন্ধ করতে হবে।

৪) ১৫ বছরের পুরাতন ট্যাক্সির পারমিট বাতিল করা চলবে না। পুরাতন ট্যাক্সি পরিবর্তনে ১ লক্ষ টাকা সরকারি সাবসিডি দিতে হবে।

৫) ওলা, উবেরের মতো কর্পোরেট সংস্থার লাগামহীন পারমিট ও ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

৬) সকল ট্যাক্সিচালককে সামাজিক সুরক্ষায় নাম নথিভুক্ত করতে হবে, পাওনা অর্থ অবিলম্বে দিতে হবে।

৭) কর্পোরেট স্বার্থবাহী, দানবীয় মোটর ভেহিকেলস অ্যামেন্ডমেন্ট বিল বাতিল করতে হবে।

আক্রান্ত সকল পরিবহণ

গত চার বছরে ডিজেলের দাম বেড়েছে ১২বার, ২০১৬ থেকে বে-সরকারি তেল সংস্থার স্বার্থে পেট্রপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়েছে সরকার, চাপানো হয়েছে কয়েকগুণ সেস ও শুল্ক। ২০১৬ সালে যে ডিজেলের দাম ছিল ৪৯ টাকা আজ তার দাম হয়েছে ৭২ টাকা। টায়ার ব্যাটারি, স্পেয়ার, ট্যাক্স, বিমা সবই বেড়েছে লাগামহীনভাবে। পরিবহণের সকল ক্ষেত্রই আজ আক্রান্ত। বালি পাথরের লরি থেকে তোলা আদায়ে তোলাবাজ নিয়োগ করেছে, চালকদের অবস্থা ভয়ানক। ছোট বড় মালবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে নো এন্ট্রি, ওভারলোডের নামে টাকা দেওয়া বাধ্যতামূলক হয়েছে। বেআইনি অ‍‌টো চলছে সর্বত্র, ভাড়া ঠিক করছে শাসকদলের ইউনিয়ন, অত্যাচারে মানুষের নাভিশ্বাস।

কর্পোরেট সংস্থার তাঁবেদার সরকার

ওলা উবেরের মতো বড় বড় কর্পোরেট সংস্থা পরিবহণ ক্ষেত্রের দখল নিতে চায়, তাই কেন্দ্রীয় সরকার আইন পরিবর্তন করার উদ্যোগ নিয়েছে। লোকসভাতে বিল পাশ হলেও বামপন্থীদের আপত্তিতে রাজ্যসভায় বিল এখনও পাশ হয়নি। নতুন আইন অনুযায়ী বাস, ট্যাক্সি চালাতে কোনও রুট পারমিট লাগবে না, ১৪ সিটের গাড়ি বিনা পারমিটেই ১৫০ কিমি পর্যন্ত রুটে যাত্রী পরিবহণ করতে পারবে, বড় বড় কর্পোরেট সংস্থার ন্যাশনাল পারমিট যুক্ত গাড়ি যে কোনও স্থানে, যে কোনও রুটে চলতে পারবে, ফলে বাস শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। ডিলারের কাছে গাড়ি রেজিস্ট্রেশন হবে, বেসরকারি সংস্থা ট্যাক্স সংগ্রহ করবে, মোটর ভেহিকেলস ডিপার্টমেন্ট থাকবে না, কাজ হারাবে বহু সরকারি কর্মচারী। বড় বড় কর্পোরেট সংস্থা পরিবহণ ক্ষেত্রের দখল নিলে এক দিকে যেমন বাস, লরি, অটো, ট্যাক্সির ছোট ছোট মালিকেরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে, কাজ হারাবে সাধারণ শ্রমিক, তেমনি বিপদে পড়বে সাধারণ মানুষ। একচেটিয়া ব্যবসাতে যাত্রীভাড়া বৃদ্ধি পাবে কয়েকগুণ, ওলা, উবেরের মতো ভাড়ার মূল্য ঠিক করবে সেই সংস্থা। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার সেই পথেই পরিবহণ ক্ষেত্রকে নিয়ে যে‍‌তে চায়, সরকারি পরিবহণ সংস্থা তুলে দেওয়া, সমস্ত সরকারি পরিবহণ দপ্তরের কাজ বেসরকারি সংস্থাকে দিয়ে দেওয়া, সবই কর্পোরেট সংস্থার জন্য পরিবহণ ক্ষেত্র উন্মুক্ত করবে।

আন্দোলনই পথ

ট্যাক্সি ধর্মঘট শুধু চালকদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষকে কর্পোরেট সংস্থার শোষণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এই ধর্মঘট। শ্রমিকদের দাবি আদায় ও অধিকার রক্ষার জন্য মহারাষ্ট্র, তামিলনাডু, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, কেরালাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবহণ ধর্মঘট হয়েছে। মোটর ভেহিকেলস অ্যামেন্ডমেন্ট বিলের বিরুদ্ধে সারা দেশে ধর্মঘটের প্রস্তুতি চলছে, আগস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহে হবে এই ধর্মঘট। একমাত্র আন্দোলনের ভাষাই বোঝে শাসকবর্গ, ধর্মঘট হলো আন্দোলনের অন্যতম হাতিয়ার। ১৮ই জুন সাহসিকতার সাথে ট্যাক্সি ধর্মঘট সফল করে আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দিতে হবে রাজ্যের সকল পরিবহণ ক্ষেত্রে, আদায় করতে হবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি, রক্ষা করতে হবে শ্রমিকদের অধিকার।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement