তালডাংরায় স্কুলে পড়ছে
যাযাবর ছেলেমেয়েরা

মধুসূদন চ্যাটার্জি   ১২ই জুলাই , ২০১৮

বাঁকুড়া : ১১ই জুলাই— বাবা, মা দুজনেই কাপড়ের পুঁটলিতে করে শেকড় বাকড় নিয়ে রাস্তায় বেরিয়েছেন। এর ওর বাড়ি ঘুরে নানা অসুখের উপশমের কথা বলে এই সব শেকড় বিক্রি করবেন। বিক্রি না হলে শুকনো শেকড় নিয়ে ঘরে ফিরবেন। সারাদিনের শেষে ঝুলিতে যেটুকু টাকা আসবে সেখান থেকে চাল, সবজি কিনে খোলা আকাশের নিচে ফুটিয়ে জঠরের জ্বালা মেটাবেন। কিন্তু সূর্য, কদমদের সেদিকে কোন নজর নেই। তারা এক নতুন আনন্দে ডুবে আছে। লেখাপড়ার আনন্দ। এরা মায়ের চাল ফোটানো ভাত মুখে তোলে না। তুলতে হয় না। স্কুলের মিড ডে মিলেই এদের এখন পেট ভরে। রাতে যা পায় তাই খেয়েই হাসপাতালের পরিত্যক্ত কোয়ার্টারে শরীর এলিয়ে দেয়। এরা বানজারা। বাঁকুড়ার মানুষ কেউ এদের ইরানি, কেউ বা কাকতাড়ুয়া বলে ডাকেন। এই যাযাবর পরিবারের ছেলেমেয়েরা এখন স্কুলমুখী হচ্ছে। বাঁকুড়ার তালডাংরার হাড়মাসড়া গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিত্যক্ত কোয়ার্টারে গেলেই এদের দেখা মিলবে। কোথা থেকে এরা এসেছে কেউ জানে না। এঁদের মূল ভূখণ্ড কোথায় একজনও বলতে পারলেন না। প্রতিবছরই জেলার নানা প্রান্তে তাঁবু গেড়ে এঁদের বসতে দেখা যায়। এঁদের না আছে কোনও রেশনকার্ড, না আছে কোনও সরকারি নথি। সরকারি কোন সুযোগ সুবিধাই এঁরা পান না। তার জন্য কোন রাগ নেই। এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম এঁরা দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেরাচ্ছেন। নিজেদের একটা ভাষা থাকলেও যেখানে যান সেই এলাকার ভাষা এঁরা রপ্ত করে নিতে পারেন সহজেই।

‘ভাষাটা শিখতেই হয়। না হলে সেখানে বাঁচব কি করে।’ জানান মা পিঙ্কু ব্যাদ। রাজস্থানের কোন এলাকার স্থানীয় ভাষা তার টান থেকে শুরু করে বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার কথ্যভাষা তার টান সবই এঁদের কাছ থেকে শুনতে পাওয়া যায়। পরিত্যক্ত, ফাঁকা এলাকায় এরা বাসা বাঁধেন। বেশি দিনের জন্য নয়। অল্প কয়েকমাস সেখানে থেকে পরে দল বেঁধে অন্য জায়গায় চলে যান। এই চলার পথে এঁদের বিবাহ, জন্ম, মৃত্যু ঘটে। বুধবার সকালে হাড়মাসড়া হাসপাতাল চত্বর থেকে কাজে বের হওয়ার মুখেই এঁদের সঙ্গে দেখা। পিঙ্কু ব্যাদ জানান, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষের কাছ থেকে শেকড় বাকড়ের সন্ধান পেয়েছি। বাত, ঘাড়ে ব্যথা, পায়ের পাতা জ্বালা সহ নানা রোগের আমরা ওষুধ দিই। আবার বয়স্ক মানুষদের আমাদের তৈরি করা তেল দিয়ে শরীর মালিশও করে দি। যা দুটো পয়সা পাই তাই দিয়েই পেট চালাই। তবে এই রাজ্যের মানুষ আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি কোনদিন। বাচ্চা হওয়ার সময় হাসপাতালে গেলে কোনও খারাপ কথা শুনতে হয়নি। অন্য জায়গায় শুনতে হয়। তবে আমাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ার কথা কোনদিন ভাবতে পারেনি। আমরাও সেটা ভাবাইনি। এখন এই বানজারাদের পরিবারের ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করার ভাবছে। না, কেউ এসে আমাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে নিয়ে যায়নি। আমরা পথচলার সময় রোজ দেখছি যে, কচিকাঁচা ছেলেমেয়েরা সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত স্কুলে আনন্দের সঙ্গে দিন কাটাচ্ছে। আমরাও আমাদের ছেলে মেয়েদের স্কুলে পাঠাচ্ছি। মাস্টারমশাইদের গিয়ে বললাম আমাদের ছেলেরা পড়াশোনা করবে। তাদের স্কুলে ভর্তি করতে হবে। তাঁরা রাজি হলেন। এই হাড়মাসড়া স্কুলেই তারা ভর্তি হয়েছে। বই পেয়েছে। আমাদের ছেলেরাও গ্রামের অন্যান্য পরিবারের ছেলেমেয়েদের সাথে একই সঙ্গে ক্লাসে বসে পড়াশোনা করছে। স্কুলের শিক্ষক ক্ষুদিরাম বাস্কে জানান, এই ছেলেরা লেখাপড়ার ব্যাপারে খুবই মনোযোগী। ব্যবহারও খুবই ভাল। এদের বাবা মা-রা জানান, ‘আমরা বাইরে চলে গেলেও ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া ছাড়াবো না। যে আনন্দ ওরা পেয়েছে সেটা কোনমতেই হারিয়ে যেতে দেব না। আমাদের যাযাবরের ছেলে মেয়েরাও লেখাপড়া শিখুক। চাই না তারা বড় হয়ে বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করার মতো শেকড় বাকড় বিক্রি করুক।’

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement