দুনিয়া মাতালেন
উনিশের বিস্ময়

প্রশান্ত দাস   ১২ই জুলাই , ২০১৮

সেন্ট পিটার্সবার্গ : ১১ই জুলাই— খেলা শেষ। লম্বা বাঁশির পরেই ফ্রান্স ফাইনালে। মাঠে হাঁটু মুড়ে, মাথা মাঠে রেখে বসে পড়লেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। সতীর্থরা জড়িয়ে ধরেছেন তাঁকে। এমনকি গোলদাতা স্যামুয়েল উমতিতিও বারবার আদরে ভরিয়ে দিচ্ছেন এই তরুণকে। বেঞ্চ থেকে ছুটে এসে একজনের পরে আরেকজন তাঁকে জড়িয়ে ধরছেন। এমবাপ্পে গোল পাননি, কিন্তু নজর কেড়ে নিয়েছেন। গ্যালারিকে টেনে নিয়েছেন। আরও একবার বার্তা দিয়েছেন, মেসি-রোনাল্ডোর পথে চলে এসেছেন ফুটবল বিশ্বের পরবর্তী মহাতারকা।

ম্যাচের শুরুর মিনিটেই ফরাসি রক্ষণ চিরে দিয়েছিলেন এমবাপ্পে। বেলজিয়ামের ভেরতোনগেন, ডেমবেলেকে ৩০ মিটারের দৌড়ে ছিটকে দিয়ে সেন্টার রেখেছিলেন। সেই বল নেবার কেউ ছিল না কিন্তু বেলজিয়াম রক্ষণকে সন্ত্রস্ত করার পক্ষে তা যথেষ্ট ছিল। তাঁকে পাহারার দায়িত্বে থাকা লেফট ফুলব্যাক বুঝে নেন ৯০মিনিট তাঁর দুঃস্বপ্নেই কাটবে। ফরাসি ডানপ্রান্ত ধরেই বেশির ভাগ সময়ে এদিন তাঁর তীব্র গতির দৌড় দিয়েছেন এমবাপ্পে। পার্শ্বরেখা প্রায় ছুঁয়ে তাঁর সেই দৌড় বেলজিয়ামের উইং প্লের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। তবে, অন্যদিনের এমবাপ্পের থেকে এদিনের পার্থক্য ছিল সর্বত্র তাঁর উপস্থিতি। নিচে নেমে বল নিয়েছেন, হ্যাজার্ডকে ঠেকাতে তাঁর পায়ে পায়ে ঘুরেছেন, ছোঁ মেরে বল কেড়েও নিয়েছেন। ৩৯মিনিটে দুই বেলজিয়ানের মাঝখান থেকে পাভার্ডকে বাড়ানো তাঁর পাস থেকে নেওয়া শট কোনোক্রমে আটকান কুর্তোয়া। দ্বিতীয়ার্ধের ৫৬ থেকে ৫৮ তিন মিনিটে তিনটি ঝলকে এদিন গ্যালারি মাতিয়ে দিয়েছেন ১৯ বছরের এই ফরওয়ার্ড। ৫৬মিনিটে মাতুইদির জন্য রাখা সেন্টার, ৫৭ মিনিটে অসাধারণ হিলে জিরুর জন্য গোলমুখ খুলে দেওয়া, পরের মিনিটেই ফেলাইনিকে কার্যত দিশাহারা করে দেওয়া। উমতিতির গোলের পরে প্রতি আক্রমণে ওঠার মুখেই এমন ধাক্কায় বেলজিয়াম রক্ষণকে পিছনেই পড়ে থাকতে হয়েছে।

ওই হিল নিয়ে চর্চা তুঙ্গে উঠেছে। এমবাপ্পে নিজে বলেছেন, ‘আপনা থেকেই’ করেছেন, ভেবেচিন্তে নয়। তেমন বাড়তি গুরুত্ব দেননি তিনি। কিন্তু পৃথিবী দিয়েছে। স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিল গ্রিজম্যান, জিরু, মাতুইদি তাঁকে বল বাড়াচ্ছেন প্ররোচনার জন্য— আরও কিছু চমক, প্রতিপক্ষকে আরও একটু ভেঙে দাও।

পেলে টিন-এজার ছিলেন। এখনই এত বড় তুলনা না করলেও এমবাপ্পে যে এক ব্যতিক্রমী প্রতিভা, স্বীকার করছে ইউরোপ থেকে লাতিন আমেরিকা। ইংল্যান্ডের প্রাক্তন ডিফেন্ডার রিও ফার্নান্ডেজ যেমন এদিন বলেছেন, এমবাপ্পের গতি প্রায় ‘বেআইনি’— এত গতিতে ফুটবল খেললে বিপক্ষের কিছুই করার থাকবে না! মাঠ ছেড়ে যাবার সময়ে ফরাসি কোচ দেশঁ বলেছেন, ‘ব্যতিক্রমী প্রতিভার খেলোয়াড় ও’। দেশঁ খুবই সাবধানে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, কেননা তিনি জানেন এক বিরাট নক্ষত্রের বিকাশ হচ্ছে তাঁর হাতে।

এমবাপ্পের খেলায় এখনও বাধাহীন নদীর স্রোত। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, বয়স এত কম যে ফুটবল এখনও ওর কাছে খেলাই মাত্র। প্যারিস স্য জাঁ-র মতো ক্লাব, ফ্রান্সের বিশ্বকাপ দলের একাদশে ঠাঁই যেন কোনোই পার্থক্য করছে না। সাংবাদিকরা ছাড়বেন কেন? স্বভাবসিদ্ধ প্রশ্ন এসেছে, ব্যালন ডি’অর পাবেন নাকি? এমবাপ্পে পরিণত উত্তর দিয়েছেন, ‘এসবের দিকে আমার মন নেই। আমি বিশ্বকাপ জিততে চাই। বিশ্বকাপ নিয়ে ঘুমোতে চাই।’ স্বীকার করেছেন, তাঁর সবচেয়ে দুরন্ত স্বপ্নেও ফ্রান্সকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলছেন এমন দৃশ্য দেখেননি।

রবিবার বিশ্বকাপ ফাইনাল। এত অল্প সময়ের ফুটবল জীবনেই সর্বোচ্চ মঞ্চে, ফুটবলের শিখরশীর্ষের ম্যাচে নামবেন এমবাপ্পে। বালক বীরের বেশে বিশ্বজয়ের বিস্ময় হয়তো অপেক্ষা করছে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement