‘হয়‘সৌন্দর্য ফিরিয়ে
দিন নয় ভেঙে ফেলুন’

তাজমহল রষণাবেক্ষণে সুপ্রিম কোর্টের তীব্র শ্লেষ কেন্দ্রকে

সংবাদসংস্থা   ১২ই জুলাই , ২০১৮

নয়াদিল্লি, ১১ই জুলাই— ‘‘হয় তাজমহলের চিরন্তন সৌন্দর্য ফিরিয়ে দিন, অথবা এটিকে ভেঙে ফেলুন।’’ সপ্তদশ শতাব্দীতে নির্মিত এই ঐতিহাসিক স্থাপত্যের রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতির জন্য বুধবার এমনই ঝাঁঝালো ভাষায় কেন্দ্রীয় সরকার, উত্তর প্রদেশ সরকার এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থাকে তিরস্কার করল সুপ্রিম কোর্ট। এদিন শীর্ষ আদালতের দুই বিচারপতি মদন বি লোকুর এবং দীপক গুপ্তকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে এই মন্তব্য করে বলেছে, এমন একটি অতুলনীয় স্মৃতিসৌধ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে চরম উদাসীনতা ও অনীহা দেখানো হচ্ছে। তাঁরা বলেন, ‘‘আপনারা (সরকার) তাজমহল বন্ধ করে দিতে পারেন। চাইলে এটিকে ভেঙে ফেলতে পারেন। ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে ধ্বংসই করে ফেলুন এটিকে।’’

মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রী মুমতাজের স্মৃতিতে ১৬৪৩ সালে বর্তমান উত্তর প্রদেশের আগ্রায় শ্বেতপাথর দিয়ে এই বিশাল স্মৃতিসৌধ বানিয়েছিলেন। তবে আরও দশ বছর এর পরবর্তী ধাপের নির্মাণকাজ চলেছে। ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্বের ঐতিহ্যশালী জায়গাগুলির অন্যতম হলো তাজমহল। কয়েক বছর ধরেই পরিবেশ দূষণ ও অন্যান্য কারণে তাজমহলের অস্তিত্ব সংকটের মুখে। সুপ্রিম কোর্ট এর সুরক্ষার বিষয়টির তদারকি করছে। সেই সংক্রান্ত মামলার শুনানিতেই এদিন সর্বোচ্চ আদালতের প্রবল তোপের মুখে পড়ে কেন্দ্রীয় সরকার, উত্তর প্রদেশ সরকার এবং ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বা এ এস আই-র মতো সরকারি সংস্থা। শুনানিতে দুই বিচারপতির বেঞ্চ অসন্তোষ প্রকাশ করে আরও বলেছে, সংসদের একটি স্থায়ী কমিটি তাজমহলের উপর দূষণের প্রভাব নিয়ে ইতিমধ্যে রিপোর্ট দিয়েছে। তারপরেও এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে মাথা ঘামায়নি সংশ্লিষ্ট কোনও কর্তৃপক্ষই।

দুই বিচারপতির বেঞ্চ এদিন শুনানিতে তাজমহল এবং প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের মধ্যে তুলনাও টানে। বেঞ্চ বলে, সম্ভবত ভারতীয় স্মৃতিসৌধটি আইফেল টাওয়ারের থেকে বেশি সুন্দর। তা সত্ত্বেও তাজমহল ও লাগোয়া এলাকার পরিবেশের কারণে ভারত ক্রমাগত হারাচ্ছে পর্যটক এবং বিদেশি মুদ্রা। ৮ কোটি মানুষ এখন পর্যন্ত আইফেল টাওয়ার দেখেছেন। তাজমহল যত মানুষ দেখতে এসেছেন, তার আট গুন বেশি। বিচারপতিরা বলেন, এদেশে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেশি। কিন্তু অন্যান্য দেশে নানা জায়গায় উঁচু টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে পর্যটকরা সেখান থেকে গোটা শহরকে দেখতে পারেন। এদিন কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে আদালতে আইনজীবীর ভূমিকায় ছিলেন অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এ এন এস নাদকার্নি। তিনিও এসবের কোনও জবাব দিতে পারেননি।

শুনানিতে এক জন আইনজীবী বলেন, তাজমহলের জন্য পরিকল্পনার দিশা তৈরি করা হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গেই বেঞ্চ বিরক্তি প্রকাশ করে বলে, তা কি তাজমহল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরে পাওয়া যাবে? বেঞ্চ এদিন গত বছর ভারতে আগত পর্যটকদের সংখ্যাও জানতে চায়। তখন অতিরিক্ত সলিসিটির জেনারেল বলেন, সংখ্যাটি এক কোটির মতো। কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রক আরও বিশদে জানাতে পারবে। উত্তরে বেঞ্চ বলে, ‘‘তাজমহল নিয়ে অনীহার কারণে ভারত প্রতি বছর কত পর্যটক হারাচ্ছে, তা বোঝেন? এই একটি কারণে বিদেশি মুদ্রা, পরিকাঠামো, সব হারাচ্ছে দেশ। একটি স্মৃতিসৌধ দেশকে এই সবই দিতে পারে। কিন্তু অনীহার জন্য কিছু হচ্ছে না।’’ বেঞ্চ আরও বলে, সংসদীয় কমিটির রিপোর্টে তাজমহলকে জাতীয় গর্ব বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এটিকে রক্ষা করার জন্য বহুমুখী উদ্যোগ দরকার। কিন্তু কিছুই করা হয়নি।

কেন্দ্রীয় সরকার এবং উত্তর প্রদেশ সরকারের তরফে অবশ্য এদিন তাজমহলকে ঘিরে কিছু পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে শীর্ষ আদালতকে। যেমন, খুব শীঘ্রই তাজমহল দর্শনের জন্য অনলাইনে টিকিট বুকিং ব্যবস্থা চালু করা হবে। এছাড়া পর্যটকদের জন্য চালু করা হবে তাজমহল দর্শনের সময়ভিত্তিক ব্যবস্থা। কে কত সময় তাজমহলে থাকতে চান, সেই মতো হ‍‌বে টিকিটের দাম। অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল জানান, কানপুর আই আই টি-কে তাজমহল ও তার চারপাশের বাতাসে দূষণের মাত্রা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চার মাসের মধ্যে ওই প্রতিষ্ঠান রিপোর্ট জমা দেবে। প্রতিষ্ঠান সেই কাজ শুরুও করেছে। তাতেও ক্ষোভ প্রকাশ করে বেঞ্চ বলে, এখন বর্ষাকালে এই দূষণের মাত্র খতিয়ে দেখে লাভ নেই। এই সময়ে এমনিতেই বাতাসে দূষণ কম থাকে।

এদিন শুনানিতে তাজমহল ট্রাপিজিয়াম জোনের প্রসঙ্গও ওঠে। তাজমহলকে ঘিরে দশ হাজার চারশো বর্গ কিলোমিটার এলাকা এই জোনের মধ্যে পড়ে। আগ্রা ছাড়াও এই জোনের মধ্যে রয়েছে উত্তর প্রদেশের ফিরোজাবাদ, মথুরা, হাথ্রাস ও এটাহ জেলা এবং রাজস্থানের ভরতপুর জেলা। এই বিরাট এলাকার বাতাসে দূষণের মাত্রা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল জানালে বেঞ্চ ব‍‌লে, এই বিষয়ে কেন্দ্র যে হলফনামা আদালতে জমা দিয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তাজমহল রক্ষায় সরকার কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে এবং কী কী করতে চলেছে, তা বিস্তৃত আকারে জানিয়ে দুসপ্তাহের মধ্যে আদালতে নতুন হলফনামা জমা দিতে হবে কেন্দ্রকে। সেখানে প্রতিটি পদক্ষেপের বিষয়ে বিশদে জানাতে হবে। কোন দপ্তরের দায়িত্ব কী, তাও ওই হলফনামায় উল্লেখ করতে হবে। বেঞ্চ আরও বলেছে, দীর্ঘ দিন ধরে তাজমহলের সুরক্ষা নিয়ে টালবাহানা চলছে। তাই জুলাইয়ের ৩১ তারিখ থেকে এই মামলার শুনানি হবে রোজ।

Featured Posts

Advertisement