দেশজুড়ে বামপন্থীদের আন্দোলনের
চাপেই কি ‘কৃষক দরদি’ সেজে
কেন্দ্রকে চিঠি মমতার?

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১২ই জুলাই , ২০১৮

কলকাতা, ১১ই জুলাই— তাঁর শাসনে কিষান ক্রেডিট কার্ডে কৃষক গড়ে ঋণ পেয়েছেন ৪১,৭৮২ টাকা। তিনি, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ‘ন্যূনতম ২লক্ষ টাকা’ ঋণ কৃষককে দেওয়ার ‘পরামর্শ’ দিয়েছেন!

কৃষককে ভুল বোঝানোর চেষ্টার এখানেই শেষ নয়।

রাজ্যের কৃষকদের আরও একবার বিভ্রান্ত করার জন্য আরও কিছু ‘পরামর্শ’ বুধবার মমতা ব্যানার্জি লিখে পাঠিয়েছেন নয়াদিল্লিতে। বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে নীতি আয়োগের কৃষি এবং একশো দিনের প্রকল্পের কাজের নীতি অভিমুখ সংক্রান্ত মুখ্যমন্ত্রীদের সাব কমিটির বৈঠক আছে। সেই বৈঠকে তিনি থাকতে পারবেন না বলে বুধবার ওই সাব কমিটির আহ্বায়ক মধ্য প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানকে চিঠি লিখে মমতা ব্যানার্জি জানিয়েছেন। আর সেই চিঠিতে জুড়ে দিয়েছেন ৮দফা ‘কৃষক দরদ’। প্রসঙ্গত, নরেন্দ্র মোদীর সরকার কৃষকদের ছড়িয়ে পড়া ক্ষোভ প্রশমিত করতে মাত্র কিছুদিন আগে ফসলের ন্যূনতম দাম ২০০ টাকা বেশি ঘোষণা করেছেন। পিছিয়ে থাকতে চান না মমতা ব্যানার্জি। তাই তাঁর বুধবারের চিঠি।

মুখ্যমন্ত্রীর ৮টি ‘সাজেশনস’ বা পরামর্শগুলি বিচার করলে দেখা যাচ্ছে, নিজে যেখানে যেখানে ব্যর্থ, সেই বিষয়ে ‘জ্ঞান’ দিয়েছেন চিঠিতে।

যেমন, মমতা ব্যানার্জি লিখেছেন যে, রেগা প্রকল্পে ১০০ দিন তো বটেই, আরও বাড়তি ১০০ দিন কাজের বন্দোবস্ত হওয়া উচিত কৃষি ও ফুলচাষের সঙ্গে রেগার মেলবন্ধন ঘটিয়ে। প্রসঙ্গত, একশো দিনের প্রকল্পে ২০০ দিনের দাবিতে ইতিমধ্যেই রাজ্যে আন্দোলন চালাচ্ছেন বামপন্থীরা।

কিন্তু নিজের শাসন যেখানে, সেই পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জি এই প্রশ্নে কী করেছেন? গত সাত বছরে রাজ্যে একশো দিনের প্রকল্পে গড় কাজ কখনও ৬০দিন পেরোয়নি। চলতি আর্থিক বছরে সেই গড় ২৬ দিন। জঙ্গলমহলে, যেখানে মমতা ব্যানার্জি বারবার যান, ভাষণ দেন— সেখানে সিংহভাগ এলাকায় গড় কাজ ২০দিনের আশেপাশে।

চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন যে, সম্পদ এবং শ্রমশক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের জন্য সরকারের অধিকাংশ প্রকল্পকে রেগার সঙ্গে যুক্ত করা উচিত। রাজ্যে কেমন ‘শ্রমশক্তি’ ব্যবহৃত হয়েছে? চলতি আর্থিক বছরে এখনও পর্যন্ত কাজ চেয়েছেন কিন্তু এক ঘণ্টার জন্যও রেগার কাজ পায়নি এমন পরিবারের সংখ্যা ৭লক্ষের বেশি। গত আর্থিক বছরে পুরো বছর কাজ চেয়েও জোটেনি ৪লক্ষের বেশি পরিবারের। তার আগের বছরও ছিল ৪লক্ষের বেশি।

মুখ্যমন্ত্রী আরও পরামর্শ দিয়েছেন, ফসলের ন্যূনতম সহায়কমূল্য যাতে কৃষকরা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের আয় বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। প্রসঙ্গত, রাজ্যে ধানের সহায়কমূল্য ১৫৫০ টাকা প্রতি কুইন্টাল। রাজ্যে সিংহভাগ কৃষক তা পাননি। রাজ্যের ব্যাঙ্কগুলিই ইতিমধ্যে রিপোর্ট দিয়ে জানিয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গে কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম পান না। নথিতে লেখা হয়েছে— ‘‘উৎপাদন স্বাভাবিকের তুলনায় সামান্য বেশি হলে কৃষকদের জন্য ফসলের দাম পড়ে যায়। আবার উৎপাদন স্বাভাবিকের থেকে কম হলে ফসলের দাম হু হু করে বেড়ে যায় (স্কাইরকেটিং প্রাইসেস)। কিন্তু তাতে কৃষকের প্রায় কোনও লাভই হয় না।’’

মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন যে, ভূমিহীন কৃষক, খেতমজুরদেরও কিষান ক্রেডিট কার্ডের আওতায় আনতে হবে। এবং সবাইকে ন্যূনতম ২লক্ষ টাকা ঋণের বন্দোবস্ত করতে হবে। অথচ তাঁর শাসনে কিষান ক্রেডিট কার্ড পিছু ঋণ পাওয়া গিয়েছে গড়ে ৪১,৭৮২ টাকা।

কেন এমন চিঠি ভর্তি ‘পরামর্শ’ দিয়ে কৃষকের প্রতি দরদ বোঝাতে তৎপর হলেন মমতা ব্যানার্জি।

কারণ, কৃষক, খেতমজুরদের দাবি দেশজুড়ে বামপন্থীরাসহ নানা সংগঠনের আন্দোলন ক্রমশ জোরদার হচ্ছে। মহারাষ্ট্রে কৃষকরা ‘লঙ মার্চ’ করেছেন। রাজস্থানসহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ফসলের ন্যায্যমূল্য, কৃষি ঋণ মকুবের মতো দাবি নিয়ে কৃষকদের উত্তাল আন্দোলন চলছে। এমনকি পশ্চিমবঙ্গেও বামপন্থীদেরই উদ্যোগে আগস্ট জুড়ে কৃষক-খেতমজুর সংগ্রামের আয়োজন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এমন সময়ে মমতা ব্যানার্জির কৃষকদের কথা মনে পড়েছে।

এদিন মুখ্যমন্ত্রী সেচের বিকাশের পরামর্শ দিয়েছেন। নিজের ‘জল ধরো জল ভরো’ কর্মসূচির কথা চিঠিতে লিখেছেন। বলেছেন, কৃষি ঋণ মকুবের কথা। কৃষকদের সামান্য অংশই ব্যাঙ্কগুলি থেকে ঋণ পান। বাকি বিরাট অংশের কৃষক ধার করতে বাধ্য হন মহাজনদের থেকে চড়া সুদে। রাজ্যে যে কৃষকরা আত্মহত্যা করেছেন, তাঁদেরও অনেকেই মহাজনের থেকে চড়া সুদে ধার নিয়ে বিপর্যস্ত ছিলেন। ফসলের দাম না পেয়ে, চাষে লোকসান হওয়ার পর তাঁরা ভেঙে পড়েন— আত্মঘাতী হন। সেই মহাজনী ঋণ আটকানোর জন্য ফসলের ন্যায্যমূল্য খুব জরুরি। সেই কাজের পশ্চিমবঙ্গ সরকার ব্যর্থ। মুখ্যমন্ত্রীর চিঠিতে কৃষকের মহাজনী ঋণ নিয়ে কোনও কথা নেই। রাজ্যের কৃষকসভার সম্পাদক অমল হালদার বলেন,‘‘আমরা ফসলের ন্যায্য দাম চাই। খেতমজুরের কাজ, যথেষ্ট মজুরি চাই। চাই রেগায় ২০০ দিনের কাজ। আরও দাবি আমাদের আছে। কেন্দ্র এবং রাজ্য, দুই সরকারই কৃষকদের বঞ্চনা করছে। দেশজোড়া আন্দোলনের চাপে এখন ভুল বোঝাতে নেমেছে।’’

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement