নির্লজ্জ

  ১২ই জুলাই , ২০১৮

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অনেক ‘মহান বাণীর’ একটি হলো ‘আমি পরবর্তী ভোটের কথা ভাবি না, ভাবি পরবর্তী প্রজন্মের কথা’। সম্ভবত এই ভাবনা থেকেই কেন্দ্রীয় সরকার ভূমিষ্ঠ হবার আগেই এক‍‌টি ইনস্টিটিউটকে উৎকৃষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দিয়েছে। দীর্ঘ দুই বছর ধরে সমীক্ষা চালিয়ে কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ মন্ত্রক ৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ‘উৎকৃষ্ট’ শিরোপা অর্পণ করেছে। এরমধ্যে ৩টি সরকারি আর তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে ২টি বর্তমানে চালু প্রতিষ্ঠান হলেও তৃতীয় প্রতিষ্ঠানটি চালু হওয়া দূরের কথা, এখনও তৈরিই হয়নি। অভাবনীয় এবং অবিশ্বাস্য হলেও মোদী সরকার এমন একটি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানকে ‘উৎকৃষ্ট’ ঘোষণা করতে দ্বিধা করেননি। ধান্দার ধনতন্ত্রের নগ্নতা কোন স্তরে পৌঁছালে এমন নির্লজ্জতা প্রকাশ পেতে পারে তা মোদী সরকার না থাকলে টের পাওয়া যেত না।

ভাবনার স্তরে প্রস্তাবিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির মালিক আর কেউ নন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর অতি ঘনিষ্ঠ কর্পোরেট বন্ধু রিলায়েন্সের মুকেশ আম্বানি। জিও ইনস্টিটিউট অব রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন নামক যে প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে কোনদিন জন্ম নেবে তার সম্পর্কে প্রথম মানুষ জানতে পারেন গত মার্চ মাসে। মুকেশ পত্নী নীতা বলেছিলেন তাঁরা বিশ্বমানের একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে চলেছেন। তবে কবে সেই বিশ্ববিদ্যালয় দিনের আলো দেখবে তা মালিকপক্ষ জানাতে পারেনি। তবে এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা ন্যূনতম তিন বছরে সম্ভব না হলেও উৎকৃষ্ট তালিকায় তার নাম খোদাই করে দিয়েছে মোদী সরকার। বিনা পয়সায় এতবড় বিজ্ঞাপন মোদীর বন্ধু ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়।

৬টি উৎকৃষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করেছে কারা সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। যে ইউ জি সি-কে তুলে দেবার উদ্যোগ নিয়েছে সরকারই সেই ইউ জি সি-কে দিয়ে গঠন করা হয় এক কমিটি যার প্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হয় এন গোপালস্বামীকে। ইনি বর্তমানে আর এস এস অনুমোদিত বিবেকানন্দ এডুকেশন সোসাইটির প্রধান। বোঝাই যাচ্ছে আম্বানিদের অস্তিত্বহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে উৎকৃষ্ট ঘোষণার মোদীর উদ্যোগে নাগপুরেরও সায় আছে। প্রসঙ্গত, আম্বানিদের আরও দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু থাকলেও উৎকৃষ্টের তালিকায় তাদের জায়গা দেওয়া হয়নি। জায়গা দেওয়া হয়েছে সেটি যেটা এখনও তৈরিই হয়নি। উভয়পক্ষের বোঝাপড়া না থাকলে এমনটা হওয়া সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় কথা যার কোনও অস্তিত্বই নেই তার উৎকৃষ্টতা যাচাই হয় কি করে। আসলে মোদীর পূর্ণাঙ্গ সহায়তায় আম্বানিরা তাদের হবু প্রতিষ্ঠানের নাম বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে চাইছেন। সরকারি ব্যবস্থাপনায় যে প্রচার সম্ভব হয়েছে সেটা ১০০ কোটি টাকা খরচ করলেও সম্ভব হতো না।

কিছুদিন আগে সরকার ২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে উৎকৃষ্ট শিরোপা দেবার কথা ঘোষণা করেছিল। উৎকৃষ্টদের পরবর্তী ৫ বছরে সরকার এক হাজার কোটি টাকা অনুদান দেবে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য মাত্র ৬টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশে বিদেশে পরিচিত এবং জাতীয় ব্যাঙ্কিংয়ে সামনে থাকা ডজন ডজন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য প্রতিষ্ঠান উৎকৃষ্টতার বিচারে ফেল করলেও তুলনায় অনামী দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জায়গা পেয়ে গেছে। নির্লজ্জ বেসরকারি তোষামোদের এমন নিকৃষ্ট নজির বিরল। যেখানে জে এন ইউ, খড়্গপুর আই আই টি-র জায়গা নেই সেখানে মুকেশের হবু প্রতিষ্ঠান উজ্জ্বল আসন নেবে এটাই সার কথা। মনে রাখতে হবে সামনে ভোট। নির্বাচনী তহবিলে বিপুল টাকা দরকার। সেই সীমাহীন টাকার জোগান আসবে কর্পোরেট মহল থেকে। আম্বানিরা তারই অগ্রণী সেনা। অতএব আম্বানি, আদানি, টাটাদের জন্য মোদী সরকার পারে না এমন কোনও কাজ নেই। তাদের জন্য কোটি কোটি টাকার ঋণ মকুব হতে পারে, লক্ষ কোটি টাকার কর ছাড় হতে পারে, কম সুদে ঋণ মিলতে পারে, এমনকি জন্মের আগে সেরার সার্টিফিকেটও মিলতে পারে। কিন্তু কৃষককে ঋণ মকুব বা গরিব শ্রমজীবীর মজুরি বৃদ্ধি কখনোই নয়।

Featured Posts

Advertisement