উচ্চশিক্ষা কমিশনের খসড়া—এক অন্ধ রাজত্বের পূর্বাভাস

শ্যামল চক্রবর্তী   ১২ই জুলাই , ২০১৮

স্বাধীনতার এক বছর পর ১৯৪৮ সালে ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণকে সভাপতি করে একটি কমিশন তৈরি হয়েছিল। দশজনের কমিটি ছিল। আমেরিকার দুজন সাহেব ও ব্রিটেনের একজন সাহেব ছিলেন। এছাড়া ছিলেন ভারত সরকারের শিক্ষাসচিব ও উপদেষ্টা ড. তারাচাঁদ, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার উপাচার্য ড. জাকির হুসেন, মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. লক্ষ্মণস্বামী মুদালিয়ার, লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যার অধ্যাপক ড. কে এন বহ্‌ল, লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক নির্মলকুমার সিদ্ধান্ত ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মেঘনাদ সাহা। কেমন শিক্ষাবিদদের নিয়ে কমিশন তৈরি হয়েছিল আমরা সহজেই বুঝতে পারি। ১৯৪৯ সালে এই কমিশন রিপোর্ট জমা দেয়। রিপোর্টে ওঁরা ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন’ জাতীয় একটি প্রতিষ্ঠান তৈরির সুপারিশ করেছিলেন। এই সুপারিশ কার্যকর হতে সময় লাগে। ভারতের সংসদে প্রায় দেড়বছর ধরে আলোচনা হয়। মেঘনাদ সাহা তখন সংসদে গিয়েছেন। তিনি বারবার বিষয়টি উত্থাপন করেন।

শেষপর্যন্ত আলাপ আলোচনার পর ১৯৫৬ সালে সংসদের আইনবলে ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন’ তৈরি হলো।

১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজে প্রথম ইংরেজি উচ্চশিক্ষা শুরু হয়। ১৮৫৫ সালে নাম বদলে প্রেসিডেন্সি কলেজ হয়েছে। দুবছর পর ১৮৫৭ সালে ভারতে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হলো। কলকাতা, মুম্বাই ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়। সত্যি বলতে কী, ভারতের প্রথম তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ পরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের জন্ম। অনেককে তাই বলতেও শোনা যায়. কারও কারও লেখালেখিতে দেখা যায়, তারা বলেন, কী প্রয়োজন এসব কমিশনের? দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সে সময় চলেনি? মেধাবী ছাত্রের জন্ম দেয়নি?

ব্রিটিশ আমলে সরকার যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয় চাইছিল, অনেকের পছন্দ হয়নি। অনেকে তখন প্রতিষ্ঠানগতভাবে এমনকি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলেন। গান্ধীজী, মদনমোহন মালব্য এমনকি রবীন্দ্রনাথও ভিন্নপথে হাঁটতে চেয়েছেন। মনে রাখতেই হবে আমাদের, এই ব্যক্তি উদ্যোগ বাণিজ্যিকীকরণের উদ্যোগ ছিল না। স্বদেশিরা অনেক জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়েছেন। যাদবপুরের ইতিহাসতো তেমনই। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অর্থ ছাড়া কেমন করে সম্ভব? শুধু ছাত্রদের মাইনেতে উন্নয়নের কাজ চলে না। তাহলে সেই অর্থ কে দেবে?

১৯৩৬ সালে ইন্টার ইউনিভার্সিটি বোর্ডের এক সভায় অমরনাথ ঝা নামে একজন সদস্য সরকারকে অর্থ মঞ্জুরের প্রস্তাব করেন। জাতীয় সংস্থা গড়ার প্রস্তাব দেননি তিনি। প্রতিটি প্রদেশে ভিন্নভাবে অর্থ মঞ্জুর করার প্রস্তাব দেন। এই নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দেখা গেল। তাই কোনও সিদ্ধান্ত হলো না। ১৯৪৩ সালে কেন্দ্রীয় শিক্ষা উপদেষ্টা পরিষদ আবার ওই প্রস্তাবটি নিয়ে এল। একে ‘সারজেন্ট পরিকল্পনা’ বলা হয়। তবে উপদেষ্টা পরিষদ স্পষ্ট বলে দিয়েছিল সরকার টাকা দেবে বলে ‘কন্ট্রোল অ্যান্ড ইনস্পেকশন’-এর চেষ্টা যেন না করে। ‘টাকা দিচ্ছি তাই নিয়ন্ত্রণ করব, নজরদারি রাখব’—এসব চলবে না।

বছর চারেক পর স্বাধীনতা এসে গেল।

১৯৫৬ সালে ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন’ গড়ার প্রস্তাব সংসদে পাশ হলেও কাজ শুরু হয়েছে তার বছর তিন আগে থেকে। দেশের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে এই কমিশনের উদ্বোধন করেন। সভাপতি হলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী শান্তিস্বরূপ ভাটনগর। সঙ্গে আটজন সদস্য।

১৯৫৩ সালের ২৮শে ডিসেম্বর ইউ জি সি-র প্রথম সভায় মৌলানা আজাদ বলেছিলেন, ইউ জি সি যা সুপারিশ করবে, সরকার তা ‘অবশ্যগ্রহণীয়’ (Binding) বলে মনে করবে। সরকার বরাদ্দকৃত অর্থ সরাসরি ইউ জি সি-কে দেবে। ইউ জি সি তা নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে বণ্টন করবে। কোথায় কত দিতে হবে, সরকার ঠিক করবে না। ইউ জি সি ঠিক করবে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় যে দাবি তুলছে আজকাল, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসন চাই, বিজ্ঞানী ভাটনগর কমিশনের প্রথম সভায় মন্ত্রীমশাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, কমিশন কতটা স্বশাসন পাবে ও কমিশনের পরামর্শ সরকার কতটা গ্রহণ করবে, তার উপর দাঁড়িয়ে থাকবে কমিশনের সাফল্য বা ব্যর্থতা। উচ্চশিক্ষা জগতের এক চরম বিপর্যয় ঘটেছিল এই দুই বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদের মৃত্যুতে। ১৯৫৫ সালের শুরুতে প্রয়াত হলেন বিজ্ঞানী শান্তিস্বরূপ ভাটনগর। ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রয়াত হলেন বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় তাঁদের চিরপ্রস্থান গভীর ছাপ ফেলেছে বই কি।

প্রথমে যে কমিশন তৈরি হয় তাতে দুজন সচিব পর্যায়ের আধিকারিক ছিলেন। এর বাইরে ছিলেন মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য লক্ষ্মণস্বামী মুদালিয়ার, বারাণসী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আচার্য নরেন্দ্র দেব, বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নেভ্রজি ওয়াদিয়া, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জাকির হুসেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ। সাংসদ এইচ এন কুঞ্জরু ছিলেন।

কমিশনের প্রথম সভায় স্বয়ং সভাপতি ভাটনগর প্রস্তাব পেশ করেন, সারা দেশে অধ্যাপকদের মাইনা অবিলম্বে শতকরা পঁচিশভাগ বাড়ানো হোক। অর্থমন্ত্রী সি ভি দেশমুখ সেই প্রস্তাব মানেননি। অত মাইনা দিতে গেলে ‘সরকারের আর্থিক সংকট’ দেখা দেবে। তবে কমিশন একটা অধিকার আদায় করে নিয়েছিল। নির্দিষ্ট সময় পরপর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনক্রমের সুপারিশ পেশ করবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। কমিশনের ইতিহাসে সুসংবাদ কী দুঃসংবাদ জানি না। ভাটনগরের মৃত্যুর পর কে হবেন সভাপতি? দেশমুখ সেসময় বোম্বাই প্রদেশের ভাগাভাগির প্রশ্নে সরকারের সিদ্ধান্তে প্রতিবাদ জানিয়ে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তিনিই ১৯৫৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সভাপতি পদ গ্রহণ করেন ও ১৯৬১ সাল পর্যন্ত সেই পদে থেকে যান।

খ্যাতি অখ্যাতি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ছটি দশক পার করেছে। কমিশনের অনেক প্রশ্নে দেশজুড়ে বিতর্ক হয়েছে। তবু তার মূল কাঠামোতে কোনও হাত পড়েনি। আজ নতুন ভাবনা এসেছে দেশের সরকারের। প্রথমে এসেছিল যে ভাবনা, দেশে কোনও পরিকল্পনা কমিশন থাকবে না। শিক্ষা‍‌বিদেরা স্বাধীন চিন্তা নিয়ে কাজ করবেন কেন? মন্ত্রকের অঙ্গুলিহেলনে চলবে দেশ গড়ার (অথবা ভাঙার) পরিকল্পনা। তাই পরিকল্পনা কমিশন ভেঙে দেওয়া হলো।

২০১৪ সালের পর হাতে তালিকা নিয়েই হয়ত বা একের পর এক সারস্বত প্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। জোর কদমে চলছে ‘নতুন’ ইতিহাস লেখার ‘হিংস্র’ সাধনা। চারপাশে এত প্রতিবাদ তবু এদের চলার পথ দিক বদল করছে না। এবার হাত পড়েছে উচ্চশিক্ষায়। হাত পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পরিকাঠামোয়। নতুন কমিশন গড়া হবে। হায়ার এডুকেশন কমিশন অব ইন্ডিয়া। একটা খসড়া ওয়েবসাইটে বের করে দিয়ে বলা হলো, সময় বেশি দিতে পারছি না আমরা। যা বলবার, ৭ই জুলাইয়ের ভেতর জানিয়ে দাও। বেশিদিন সময় দিতে নেই। ‘দুরভিসন্ধিরা’ জড়ো হয়ে যেতে পারে।

প্রথম কথা, কেন এই বদল তার সপক্ষে কোনও জোর সওয়াল নেই। শিক্ষার মান রক্ষা থেকে শুরু করে সব কথাইতো বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বিধিতে লেখা ছিল। সময়ক্রম ধরে তাদের নির্দেশিকাগুলোকে নিয়ে কেউ যদি চর্চা করেন, দেখবেন, শিক্ষার মান রক্ষার অভিপ্রায়েই এরা সচেষ্ট থেকেছে। অধ্যাপক যশপাল একসময় ‘বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসা’র বিরুদ্ধে মামলা লড়েছিলেন। যে শ্রেণি দেশ পরিচালনা করে, তাদের চোখে হয়ত পুরো প্রতিষ্ঠানটিই ‘চক্ষুশূল’ হয়ে গিয়েছে। শিক্ষা পরিকাঠামোর ছোট ছোট সংশোধনে আর মন গলছে না। পুরো পরিকাঠামোর বিনাশ প্রয়োজন। কী ছিল আর কী করতে চাওয়া হচ্ছে একবার দেখা যাক। ইউ জি সি-র ছিল একজন চেয়ারম্যান বা সভাপতি, একজন ভাইস চেয়ারম্যান, একজন সচিব, দশজন সদস্য। সব মিলিয়ে তেরোজন। উচ্চশিক্ষা কমিশনে থাকবে বারোজন সদস্য। সব মিলিয়ে পনেরো জন। এতকাল ইউ জি সি-র চেয়ারম্যান বা ভাইস চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়ার কোনও ক্ষমতা সরকারের ছিল না। মুখে যাঁরা ‘মুক্ত’ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার কথা বলছেন, তাঁরা প্রস্তাব করেছেন, সরকার চাইলে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান দুজনকেই সরিয়ে দিতে পারবে। এমন খড়্গ যখন প্রলম্বিত থাকে চোখের সামনে, কোন ঋজু মেরুদণ্ডের মানুষ সেই চেয়ারে বসে অকুতোভয়ে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেবেন? নিয়ন্ত্রণের জন্য সাজানো রয়েছে আরও অভূতপূর্ব প্রস্তাবনা। এখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থ মঞ্জুরের দায়িত্ব মঞ্জুরি কমিশনের হাতে ন্যস্ত। নতুন সংস্থা তৈরি হলে সে ভার তাদের থাকবে না, মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক তাদের সুপারিশ বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। যদি চাইলে চেয়ারম্যানকে সরানো যায়, যদি টাকা বণ্টনের দায়িত্ব নিজের হাতে নেওয়া যায়, তবে সংস্থার প্রাণ বলতে আর রইলটা কি? বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রমুখের অবসরের বয়স ছিল ৬৫ বছর। এরা বাড়িয়ে তা ৭০ করতে চাইছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের আগে কোনও উপদেষ্টা পরিষদ ছিল না। এবার উচ্চশিক্ষা কমিশনের একটি উপদেষ্টা পরিষদ থাকবে। আপত্তি কেন? তার মাথার উপরে যিনি সর্বোচ্চ উপদেশক তিনি মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগের মাননীয় মন্ত্রীমশাই। দেশ বিদেশ উভয় জায়গা থেকেই যদি কমিশ‍‌নের সদস্য করা যায় (যা প্রস্তাবে রয়েছে), তবে তেমন একজন সর্বজনমান্য শিক্ষাবিদকে কি সভাপতি পদে বসানোর কথা ভাবা যেত না?

উচ্চশিক্ষার হাল হকিকত নিয়ে যাঁরা ভাবেন, তাঁরা উচ্চশিক্ষা কমিশন তৈরির খসড়াটি পড়ুন। প্রতিবাদ জানান। স্বশাসনের বদলে ভয়ভীতির দুর্ভাবনায় কণ্টকিত এই খসড়া প্রস্তাব, বাণিজ্যে হাতছানিতে কলুষিত এই আয়োজন, সমূলে বিনষ্ট করা ভিন্ন কোনও গত্যন্তর নেই।

লেখক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

Featured Posts

Advertisement