সিতাইয়ে মমতার ‘দুষ্টুদের’ গুলিতে রক্তাক্ত পুলিশ

নিজস্ব সংবাদদাতা   ১২ই জুলাই , ২০১৮

কোচবিহার ও শিলিগুড়ি, ১১ই জুলাই— মঙ্গলবার চ্যাংড়াবান্ধায় ‘দুষ্টু ছেলেদের দেখে নিতে’ বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। চব্বিশ ঘণ্টা পেরল না। বুধবার সিতাইয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সেই ‘দুষ্টু’-দে সামলাতে গিয়ে পুলিশকে গুলিবিদ্ধ হতে হলো।

এ’ যদি কোচবিহারের ঘটনা হয়, পিছিয়ে নেই শিলিগুড়িও।

শিলিগুড়ি সংলগ্ন ফুলবাড়ির উত্তরকন্যাতে গত সোমবার জলপাইগুড়ির প্রশাসনিক বৈঠকে জমি মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির পরই, সোমবার রাতে কিছু জমি মাফিয়া ভক্তিনগর থানার অন্তর্গত হাতিয়াডাঙ্গার কমলা মণ্ডল নামে এক মহিলার বাড়িতে হামলা চালায়। তাঁকে ব্যাপক মারধর করে ঘর থেকে বের করে দেয়। ওই মহিলার অভিযোগ, ন’বছর আগে তিনি ওই জমি কিনেছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি বাড়ি তৈরির কাজ শুরু করেছেন। এই অবস্থায় ওই মহিলা থানায় গিয়ে অভিযোগ জানান। মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন জমি নিয়ে হাঙ্গামা হলে তাদের অসুবিধা হবে বুঝে পুলিশ ওই মহিলাকে নিজের বাড়িতে ঢুকিয়ে দেয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। অভিযোগ পুলিশের সামনে হামলাকারীরা ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ তবু গ্রেপ্তার হয়নি।

তারপর আটচল্লিশ ঘণ্টা পার। বুধবার উত্তরবঙ্গের শাখা সচিবালয়ে আলিপুরদুয়ার জেলার প্রশাসনিক বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন যে, বৈঠকে দার্জিলিঙ, জলপাইগুড়ি বিভিন্ন জমির পাশাপাশি শিলিগুড়ির বাইপাশ সংলগ্ন জমি থেকে ডুয়ার্সের ভুটান সীমান্তের জয়গাঁ পর্যন্ত সরকারি বেসরকারি সমস্ত জমি দলের একাংশ নিজেদের ‘পৈতৃক সম্পত্তি’ বলে ভাবতে শুরু করেছে।

তাঁর বক্তব্য, ‘‘জমি বিক্রির টাকা সরকারের কোষাগারেও পৌঁছায় না। কোন ভালো কাজেও লাগে না। দলে এই টাকার কোন প্রয়োজন নেই। তাই জমি মাফিয়া চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশ প্রশাসনকে কড়া ব্যবস্থা নিতে বলছি।’’ তার পরই তাঁর সংযোজন,‘‘পুলিশের বিরুদ্ধেও এই ধরনের অভিযোগ আছে। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে বিএলআরও, ডিএলআরও, এসডিএলআরও-রাও জমি মাফিয়া চক্রের কাজে যুক্ত হয়ে পড়ছেন।’’

এদিন জমি মাফিয়া চক্র নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য রীতিমতো অস্বস্থিতে ফেলে তৃণমূলের দার্জিলিঙ জেলা সভাপতি তথা রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রীকেও। মুখ্যমন্ত্রী নির্দিষ্ট করে বলেন শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়ি বাইপাশ সংলগ্ন এলাকাতেই এই ধরনের জমি মাফিয়ারা সক্রিয়। শিলিগুড়ি শহর লাগোয়া বাইপাশ ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি বিধানসভা এলাকার অন্তর্গত। যেখানকার বিধায়ক রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী গৌতম দেব। আলিপুরদুয়ার জেলার ভুটান সীমান্তে অবস্থিত জয়গাঁতেও বেহাত হয়ে যাচ্ছে একের পর এক সরকারি জমি। যে এদিনের বৈঠকে স্বীকার করে নেন জেলা তৃণমূল সভাপতি মোহন শর্মা।

বুধবার দিনহাটার সিতাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে তৃণমূল কংগ্রেসের গোষ্ঠীসংঘর্ষে। আগামী ২১শে জুলাইয়ের সমাবেশকে ঘিরে যুব তৃণমূল শিবির ডেকেছিল। সেখানেই বিপক্ষ গোষ্ঠী হামলা চালায় বলে অভিযোগ যুব তৃণমূলের। উভয় পক্ষই বোমা,গুলি ছোঁড়ে। পুলিশ পৌঁছায়। লাঠিচার্জ করলে পুলিশকে লক্ষ্য করেও গুলিবোমা ছোঁড়া হয়। এসডিপিও-র দেহরক্ষীর গায়ে গুলি লেগেছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। এলাকার যুব তৃণমূল নেতা পরিমল রায় দাবি করেন, এই ঘটনার সঙ্গে দলের বিপক্ষ গোষ্ঠী জড়িত। দলের জেলা সভাপতি তথা উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষের দাবি, পরিমল রায় তাদের দলের কেউ নয়। এটা চোরাকারবারিদের কাজ। তারাই পুলিশের উপর হামলা করেছে। ঘোষের দাবি, চোরাকারবারিরা এক জায়গায় জড়ো হয়েছে জেনে পুলিশ সেখানে গেলে দুষ্কৃতীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। যদিও এলাকায় পরিমল রায় যুব তৃণমূলের নেতা হিসাবেই পরিচিত।

এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। হামলার আশঙ্কায় গ্রাম ছাড়ছেন সাধারণ মানুষ। মুখ্যমন্ত্রী কোচবিহারের মাটি ছেড়ে চলে যাবার ২৪ ঘণ্টা না পার হতেই তৃণমূলের গোষ্ঠী কাজিয়া চরমে উঠল। মুখ্যমন্ত্রী মঙ্গলবার চ্যাংরাবান্ধায় প্রশাসনিক বৈঠকে যুব তৃণমূল কংগ্রেসকে সতর্ক করেন। বলেন, যুব তৃণমূল আলাদা নয়। সব তৃণমূল। পুলিশ সুপার ভোলানাথ পান্ডেকে সভায় তিনি বলেছিলেন,‘‘কিছু লোক ওখানে সুযোগ পেলেই দুষ্টুমি করে। কড়া হাতে সব ধরনের দুষ্টুমি ও অশান্তির মোকাবিলা করতে হবে।’’

সেই মোকাবিলা করতে গিয়ে ‘দুষ্টুদের’ গুলিতে রক্তাক্ত পুলিশ।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement