১০২ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে
খেলেছেন রাকিটিচ

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমকে একহাত নিলেন মড্রিচ

প্রশান্ত দাস   ১৩ই জুলাই , ২০১৮

মস্কো : ১২ই জুলাই— হাসি হাসি মুখে কথা বলছিলেন ইভান রাকিটিচ। ক্রোয়েশিয়ান ভাষাতেই বলছেন। পিছন থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ভিডা। মাথার চুলগুলি এলোমেলো করে দিয়ে ড্রেসিং রুমে চলে গেলেন। অন্যদের থেকে রাকিটিচের ভূমিকা অনেকটাই আলাদা। একশো কুড়ি মিনিট খেলেছেন। একদিন আগেও বিছানা ছেড়ে ওঠার ক্ষমতা ছিল না। ইনজেকশন নিয়ে মাঠে নেমেছেন খেলার জন্য।

মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে রাকিটিচ বললেন, ‘গতকাল রাতে আমার জ্বর এসেছিল। তাপমাত্রা ১০২ডিগ্রি ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বিছানায় শুয়েই এই বড় ম্যাচের জন্য নিজের শক্তি সঞ্চয় করেছি।’ মড্রিচ এবং ব্রজোভিচের সঙ্গে মিলে ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠ সামলেছেন। এক বিন্দু ক্লান্তি প্রকাশ পায়নি তাঁর খেলায়। তার সঙ্গেই যোগ করলেন, ‘আমার যদি একটা পা নাও থাকে, তাহলেও আমি খেলবো।’

ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল ইতিহাস তো বটেই, তুলনায় নবীন এই রাষ্ট্রের ইতিহাসেও নবজীবনের গাথা রচিত হয়েছে বুধবারের মস্কোয় লুঝনিকি স্টেডিয়ামে। ইংল্যান্ডের মতো প্রতিষ্ঠিত ফুটবল শক্তিকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে ক্রোয়েশিয়া।

ইংল্যান্ডের কাছে পিছিয়ে পড়েও আবার ফিরে এসেছে। পেরিসিচের গোলে সমতায় ফেরে। তারপরে আবার জয়ের গোল করেন মান্ডজুকিচ। কীভাবে তা সম্ভব হলো শুনিয়ে গেলেন ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক লুকা মড্রিচ। ইংল্যান্ডের সাংবাদিক থেকে ফুটবল পণ্ডিত সকলেই নাকি অবজ্ঞা করেছিল ক্রোয়েশিয়াকে। সেই অবজ্ঞা থেকেই মনোবল কুড়িয়েছেন বলেই জানিয়েছেন মড্রিচ। প্রতিপক্ষকে আরও সমীহ করা উচিত বলে ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক জানিয়েছেন, ‘ইংল্যান্ডের সাংবাদিকরা, টেলিভিশন সঞ্চালক অনেক কথা বলেছিলেন। ক্রোয়েশিয়াকে অবজ্ঞা করে খুব ভুল করেছিল ওরা। সব কথা আমরা পড়ছিলাম, দেখছিলাম। আর বলছিলাম : ঠিক আছে। এখন দেখতেই পাচ্ছি কারা বেশি ক্লান্ত। বিপক্ষ দলকে সমীহ করা উচিত।’

ব্রিটিশ ফুটবল পণ্ডিতদের মতোই, সমর্থকরাও এসেছিলেন ঔদ্ধত্য নিয়ে। এমনকি ভিডার পায়ে বল গেলেই ইংলিশ সমর্থকরা আওয়াজ তুলেছে। রাশিয়া ম্যাচে জয়ের পরে ইউক্রেনকে অভিনন্দন জানিয়ে তাঁর ভিডিও থেকেই এই বৈরিতা। নব্বই মিনিট ধরে সমর্থকদের এই আচরণ নিয়ে তদন্তও শুরু করেছে ফিফা। যদিও ম্যাচ শেষে উচ্ছ্বাসের মাঝেও ক্রোয়েশিয়ার সমর্থকরা জড়িয়ে ধরেছেন ব্রিটিশ সমর্থকদের। কান্না ভেজা চোখে স্পোর্টিভনায়া স্টেশনের দিকে হাঁটতে থাকা সমর্থকদের সান্ত্বনা দিয়েছেন। কাঁধে হাত রেখে।

ফুটবলারদের মাঠের আগ্রাসন ছড়িয়ে ছিল মাঠের বাইরেও। মিক্সড জোনে মড্রিচ বলছিলেন, ‘আমরা দেখিয়ে দিয়েছি যে আমরা ক্লান্ত নই। মানসিক এবং শারীরিকভাবে আমরা ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছি। আমাদের স্বপ্ন সত্যি হওয়ার সামনে। বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছেছি, আমাদের ফুটবল ইতিহাসের সব থেকে বড় সাফল্য।’

রবিবার ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ হওয়ার জন্য নকআউটের প্রতি ম্যাচেই ক্রোয়েশিয়াকে ১২০ মিনিট খেলতে হয়েছে। ইংল্যান্ড ম্যাচ ছাড়া বাকি দুটি ক্ষেত্রে শুটআউট পর্যন্তও গড়ায় ম্যাচ। অ্যাড্রিনালিনের সর্বোচ্চ ক্ষরণের পরও ড্যানিয়েল সুবাসিচরা হাল ছাড়েননি। ভিদা, লোভরেনরা শেষ অবধি বলের পিছনে ছুটে গেলেন। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে শেষের বাঁশি বাজতেই সেন্ট পিটার্সবার্গের ঘাসে লুটিয়ে পড়লেন। ক্লান্তিতে নয়। প্রাপ্তির তৃপ্তিতে। বিশ্ব ফুটবলের শক্তিকোষ বলে পরিচিত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, স্পেনের মতো দল রাশিয়ায় অপ্রাসঙ্গিক হয়েছে। স্বপ্নপূরণ আর মড্রিচদের মাঝে কেবল ফ্রান্স।

ইংল্যান্ড গোল পাওয়ার পর কোণঠাসা ক্রোয়েশিয়াকে হ্যারি কেনরা আক্রমণের ঝাঁঝে তছনছ করে দেওয়ার চেষ্টা করেননি। নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে। ক্রোয়েশিয়া ঠিক এখানেই বাজিমাত করেছে। ইংল্যান্ড ডিফেন্ডারদের দিশাহীন দেখে আক্রমণে আরও চাপ বাড়িয়েছে। ৬৮ মিনিটে পেরিসিচের ক্যারাটে কিকে সমতা ফেরানো। তারপর ১০৯ মিনিটে মারিও মান্ডজুকিচের ফাইনালে পৌঁছে দেওয়া গোল। অতিরিক্ত সময়ে মান্ডজুকিচের গোল ছাড়া ক্রোয়েশিয়ার ফাইনাল যাত্রা সম্ভব হতো না। এই গোলের সঙ্গেই ক্রোয়েশিয়ার নয়নের মণিতে পরিণত হয়েছেন। যদিও তারও আগে ক্রোয়েশিয়ার মন জিতেছেন জুভেন্টাস তারকা। স্লোভানস্কি ব্রড শহরে বড় হয়েছেন মান্ডজুকিচ। সেখানকার সাধারণ মানুষ যাতে আরামে বিশ্বকাপ দেখতে পারেন তার ব্যবস্থা করেছেন তিনি। শুধু তাই নয় প্রায় ২৫ হাজার কুনা খরচ করে সকলের পানীয়ের ব্যবস্থাও করেছেন। তাই সবথেকে উচ্ছ্বসিত মান্ডজুকিচ। ফাইনালে যাওয়ার বিষয়ে যেন বিস্মিত তিনি। ‘আমরা এই মাত্র কথা বলছিলাম, আমরা কী করেছি সে বিষয়ে। এটা মিরাকল... না, কোনও মিরাকল নয়। শুধুমাত্র বড় দলই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জিততে পারে। আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে খেলেছি। ভালোবাসা দিয়ে, হৃদয় দিয়ে খেলেছি।’

বৃহস্পতিবার ছিল ক্রোয়েশিয়ার বিশ্রাম। ফুটবলাররা ফুটবলের সংসর্গেও ছিলেন না। শুধু রিকভারি সেশন হয়েছে। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ফাইনাল খেলা হলেও, খুব একটা চিন্তিত নন। বাড়তি মনোবল পেয়ে গেছেন।

ফাইনালের জন্য অঙ্ক কষা শুরু করে দিয়েছেন পেরিসিচও। ম্যাচের পর জানিয়েছেন, ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে হারই বাড়তি অনুপ্রেরণা। ক্রোয়েশিয়ার গোলদাতার কথায়, ‘ফাইনালে ফ্রান্সই ফেভারিট। ওদের চমকে দিতে নিজেদের সেরা প্রয়াস তুলে ধরব। হাতে তিনদিন আছে তৈরি হওয়ার জন্য। স্বপ্ন এখন খুব কাছাকাছি। মনে আছে, ২০ বছর আগে বিশ্বকাপে নিজের শহর ওমিসে বসে দেশের সমর্থন করছিলাম। ক্রোয়েশিয়ার জার্সি পরে ম্যাচ দেখতে বসতাম। তখন শুধু স্বপ্ন দেখতাম, গোল করে দেশকে বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলব।’

ডিফেন্ডার দেজান লোভরেন বলছেন, মনের জোরে ভর করেই ক্রোয়েশিয়া ফাইনালে পৌঁছেছে। গত ৬৮ বছরের বিশ্বকাপে ক্ষুদ্রতম দেশ হিসাবে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার নজির গড়েছেন ক্রোটরা। ইংল্যান্ডকে হারানোর পর উচ্ছ্বসিত লোভরেন জানান, ‘আমার মনে হয়, মানসিক শক্তিই ক্রোয়েশিয়াকে এই অবধি এনেছে। যুদ্ধ-সহ বহু প্রতিবন্ধকতা ছিল দেশে। এমনকি এখনও খুব ভালো পরিস্থিতি নেই। ভাবতে অবাক লাগে, এত কিছুর পরেও দেশের ক্রীড়ায় কত প্রতিভা!’

ইংল্যান্ডের জন্য এই বিশ্বকাপ ছিল ট্রফি ঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার। ইংল্যান্ডের তরুণ প্রজন্মের উপর ভরসাও রেখেছিলেন সবাই। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে পেরে ওঠেনি তারা। ট্রফি ঘরে ফেরানোর বদলে, নিজেরাই ঘরে ফিরে গিয়েছেন হতাশায় মুখ ঢেকে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement