আদালতে জানিয়েও ক্ষতিপূরণের
নামে ফের প্রতারণা
তৃণমূলী সাংসদের সংস্থার

পৈলান চিট ফান্ড সংস্থায় সি বি আই হানা

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৩ই জুলাই , ২০১৮

কলকাতা, ১২ই জুলাই— অ্যালকেমিস্টের বিরুদ্ধে গোটা রাজ্যে গত দুবছরে পঞ্চাশটিরও বেশি অভিযোগ জমা পড়েছিল একাধিক থানায়। দুবছর ধরে যদিও কার্যত তা উপেক্ষা করেই চলছিল রাজ্যের পুলিশ প্রশাসন। গত ১৭ই মার্চ নারদ কাণ্ডে কলকাতা হাইকোর্ট রায় দেওয়ার পরেই তড়িঘড়ি মামলা দায়ের হয়ে তৃণমূলের এই ব্যবসায়ী সাংসদের বিরুদ্ধে ময়দানে নামে ই ও ডব্লিউ। সাংবাদিক বৈঠক করে তা জানানোও হয় মহাসমারোহে। যদিও এক বছর ধরে লালবাজারের সেই তদন্ত শীতঘুমে।

কে ডি সিং খাতায় কলমে তৃণমূলী সাংসদ হলেও দলের সঙ্গে যোগাযোগ নেই প্রায় দুবছর। দিল্লিতে তাঁর বি জে পি ঘনিষ্ঠতা সকলেই জানে। এই পরিস্থিতিতে নারদ কাণ্ডে পালটা চাপ দেওয়ার কৌশল হিসাবে রাজ্য সরকার কে ডি সিং-র বিরুদ্ধে তদন্তের ঘোষণা করলেও রাজনৈতিক সমীকরণে যেহেতু সি বি আই এখনও হাত দেয়নি অভিযুক্ত তৃণমূলী মন্ত্রী, সাংসদের বিরুদ্ধে তাই অ্যালকেমিস্টের বিরুদ্ধে রাজ্যের তদন্তও থমকে গিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতেই এবার ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া নিয়েও রীতিমত প্রতারণার কৌশল নিয়েছে তৃণমূলী সাংসদের মালিকানাধীন এই সংস্থা। সি বি আই তদন্ত ঠেকাতে আদালতে অ্যালকেমিস্ট সংস্থার তরফে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে দাবি করা হয় ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। আদালত সেই দাবির মান্যতা দেয়। অ্যালকেমিস্টের তরফে জানানো হয় ২০১৭’র ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত যাঁদের লগ্নি মেয়াদ পূর্ণ করেছে তাঁদের টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রাথমিক ভাবে ৭৪ হাজার আমানতকারীর তালিকাও তৈরি হয়। কিন্তু আদালতে জানালেও টাকা প্রক্রিয়া ফেরতের প্রক্রিয়ায় ফের প্রতারণা। মাত্র দশ হাজার টাকা পর্যন্ত যাঁরা বিনিয়োগ করেছিলেন তাঁদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে বলে এরপর জানানো হয়। নির্দিষ্ট দিন অন্তর তা ফেরত দেওয়া হবে, যদিও তাও মানা হচ্ছে না। আইনজীবী শুভাশিস চক্রবর্তীর কথায়, আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করছে অ্যালকেমিস্ট, সি বি আই তদন্ত থেকে বাঁচার জন্য টাকা ফেরতের কথা বললেও তা মানা হচ্ছে না। আমরা ফের তা আদালতে জানাবো। কার্যত রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতেই তৃণমূলী সাংসদের সংস্থার এই প্রতারণার কারবার বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। সারদা থেকে নারদ কেলেঙ্কারির পালটা চাপে কলকাতা পুলিশকে দিয়ে অ্যালকেমিস্টের বিরুদ্ধে তদন্তের ঘোষণা করা হলেও তদন্ত তাই কার্যত স্তব্ধ।

এদিকে এর মধ্যেই এদিন পৈলান গ্রুপের বিরুদ্ধে চিট ফান্ড কাণ্ডে তদন্ত জোরদার করল সি বি আই। সম্প্রতি কলকাতায় সি বি আই-র স্পেশাল ডিরেক্টরের উপস্থিতিতে বৈঠকের পরে ফের এই তদন্তে গতি বাড়ছে। সারদা, রোজভ্যালির মত বড় আকারের না হলেও পৈলান গ্রুপ পনজি স্কিমে এরাজ্যের বাজার থেকে প্রায় ২০০কোটি টাকা তুলেছিল। তবে সারদা, রোজভ্যালির মত এই সংস্থার সঙ্গেও শাসক দলের দুই দাপুটে মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল। তার মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে নারদ কাণ্ডেও সি বি আই এবং ইডি এফ আই আর দায়ের করে। জেরার মুখেও পড়তে হয় সেই দাপুটে মন্ত্রীকে।

সি বি আই-র এক তদন্তকারী আধিকারিকের কথায়, পশ্চিমবঙ্গে কোন চিট ফান্ড সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্তই রাজনৈতিক প্রভাব নিরপেক্ষ নয়। প্রতিটি সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্তের বাঁকেই সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন রাজনৈতিক নেতারা। এটা আমাদের পক্ষেও মাথাব্যথার কারণ। সি বি আই-র সূত্রেই জানা গিয়েছে পৈলান গোষ্ঠীর সঙ্গে শাসক তৃণমূলের যোগাযোগের একাধিক নথি মিলেছে। বিভিন্ন সময়ে টাকা গিয়েছে শাসক তৃণমূলের তহবিলেও। তার বিনিময়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সম্পত্তি ও ব্যবসা বাড়াতে শাসকের প্রভাবও কাজ করেছে। তাহলে ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্রে’ কী সারদা, রোজভ্যালির মত পৈলান কাণ্ডেও শাসক দলের প্রভাবশালীদের জেরা করা হবে? এক গোয়েন্দা আধিকারিকের কথায়, আমরা সমস্ত নথি খতিয়ে দেখছি। তদন্তের প্রয়োজন হলে সবাইকেই ডাকা হবে।

ইতিমধ্যে পৈলান গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রায় দুশো কোটি টাকা আর্থিক তছরূপের মামলা রুজু হয়। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সেই পৈলান গ্রুপের একাধিক অফিসে তল্লাশি চালান গোয়েন্দারা। মামলা রুজু হওয়ার পর থেকেই ফেরার সংস্থার কর্ণধার অপূর্ব সাহা। এদিন সকালে সি বি আই-র একটি তদন্তকারী দল দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জে অপূর্ব সাহার বাড়িতে যায়। অন্য একটি দল সোনারপুর, সন্তোষপুর এবং পৈলানের একাধিক অফিসে তল্লাশি শুরু করে। আর একটি দল পৌঁছে যায় সংস্থার বাঁকুড়ার অফিসে। একযোগে চলে তল্লাশি অভিযান, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত। তদন্তকারী আধিকারিকদের কথায়, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার হয়েছে যা তদন্তে সাহায্য করবে। সারদা গোষ্ঠীর মতোই আমানতকারীদের কাছ থেকে টাকা তুলে ছিল পৈলান গ্রুপ পার্ক ডেভলপমেন্ট অথরিটি। সি বি আই-র দাবি, আর্থিক তছরুপের পরিমাণ ২০০কোটি টাকারও বেশি। আমানতকারীদের থেকে টাকা তুলতে ডিবেঞ্চারও ইস্যু করেছিল এই সংস্থা। সেবি-র নিয়মের তোয়াক্কা না করেই অবৈধ কারবার ফেঁদে বসেছিল সংস্থা। এছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বেনামে জমিও কেনা রয়েছে বলে অভিযোগ।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement