বিষাক্ত মিশেলে আক্রান্ত
শিক্ষাক্ষেত্র একজোটে
বাড়াতে হবে প্রতিরোধ

সম্পাদকীয় ‘পিপলস ডেমোক্র্যাসি’

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৩ই জুলাই , ২০১৮

নয়াদিল্লি, ১২ই জুলাই- বিষাক্ত মিশেলে আক্রান্ত শিক্ষা। নয়া উদারবাদের সঙ্গে উগ্র হিন্দুত্ব মিশিয়ে চালানো হচ্ছে শিক্ষানীতি। দুমুখো আক্রমণের প্রতিবাদও জোরালো হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষ, বিজ্ঞানসম্মত, জনশিক্ষার নীতি রক্ষার দাবিতেই গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধের লড়াই। শিক্ষক, ছাত্র এবং নাগরিকদের একত্রিত করতে হবে এই লড়াইয়ে।

বি জে পি জোট সরকারের শিক্ষানীতির কড়া সমালোচনা করে এই মর্মে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছে সি পি আই (এম)। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাপ্তাহিক মুখপত্র ‘পিপলস ডেমোক্র্যাসি’-র প্রকাশিতব্য সংখ্যার সম্পাদকীয়তে দেওয়া হয়েছে জিও বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ। ইউ জি সি তুলে দেওয়ার প্রস্তাবেরও ব্যাখ্যা দিয়ে সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, ইউ পি এ সরকারের সময় চালু শিক্ষানীতি আরও জোর কদমে প্রয়োগ করছে বি জে পি জোট সরকার। যে শিক্ষানীতির মূল কথা কেন্দ্রীকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ এবং বেসরকারিকরণ।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউ জি সি) তুলে দিতে চায় কেন্দ্র। তার বদলে হায়ার এডুকেশন কমিশন অব ইন্ডিয়া (এইচ ই সি আই) তৈরির জন্য আইনের প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, শিক্ষার ওপর, বিশেষত উচ্চশিক্ষায় আক্রমণের চরিত্র স্পষ্ট হয়েছে কেন্দ্রের সক্রিয়তায়। দুটি লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন রদবদল চলছে শিক্ষানীতিতে। এক, নয়া উদারবাদ এবং দুই, উগ্র হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ। শিক্ষার বেসরকারিকরণ এবং বাণিজ্যিকীকরণে গতি বাড়ানো হয়েছে। সমানে কমছে শিক্ষায় সরকারি বরাদ্দ। পাশাপাশি, উগ্র হিন্দুত্ববাদী বক্তব্য এবং দৃষ্টিভঙ্গি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ছক কষে। যে প্রতিষ্ঠানগুলিতে শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীরা আপত্তি জানাচ্ছে সেখানে দমন এবং জোর খাটাতেও দ্বিধা করছে না কেন্দ্রের বি জে পি সরকার।

প্রস্তাবিত শিক্ষা কমিশন সম্পর্কে সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষাক্ষেত্রের উন্নতি এবং পরিচর্যায় ইউ জি সি খুব কাজের ভূমিকা নিয়ে চলছিল একথা কেউ বলছে না। কিন্তু তার বদলে শিক্ষা কমিশন করা হলে চিকিৎসা পদ্ধতিটি ‌আগের চেয়েও নিম্নমানের হবে। প্রস্তাবিত শিক্ষা কমিশনে শিক্ষাবিদদের প্রায় বাদই দিতে চাইছে কেন্দ্র। তার ওপর উপদেষ্টা কমিটির মাথায় থাকবেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী নিজে। তার ফলে এই কমিশন এবং গোটা উচ্চশিক্ষার ওপর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নিরঙ্কুশ করে তোলা হবে।

কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থ বরাদ্দের দায়িত্ব ছিল ইউ জি সি-র। নিয়ম বদলের পর সেই ক্ষমতা নিয়ে নেবে কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক। সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্র এবং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ওপর সরাসরি খবরদারি চালাবে কেন্দ্র। ইউ জি সি আইনে স্বাধিকারের যেটুকু সুযোগ রাখা হয়েছিল এবার তা-ও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। নীতি বদলে তৈরি হচ্ছে আলাদা উচ্চশিক্ষা অর্থবরাদ্দ সংস্থা (এইচ ই এফ এ)। মতলব হলো, সরকারি বরাদ্দ তুলে দিয়ে এই সংস্থার হাত দিয়ে ঋণ দেওয়া হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে। প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর বোঝা বাড়বে যার জেরে তা বইতে হবে ছাত্রছাত্রীদের।

রিলায়েন্স গোষ্ঠীর ‘জিও ফাউন্ডশন’ জন্মের আগেই ‘বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠানের’ স্বীকৃতি পেয়েছে কেন্দ্রের কাছে। তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে মন্ত্রক স্বীকৃতিকে শর্তাধীন বলে সাফাই দিয়েছে। সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষায় কর্পোরেটমুখী নীতির জ্বলন্ত নজির এই সিদ্ধান্ত। নতুন শিক্ষা কাঠামোয় কর্পোরেটের মাথাদের নিয়ন্ত্রক করে তোলার নির্লজ্জ উদাহরণ। বেসরকারিকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ এবং কেন্দ্রীকরণে সজ্জিত নয়া উদারনীতি সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেবে। সঙ্ঘ পরিবারের দুচোখের বিষ জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের ওপর ধারাবাহিক আঘাত চলছে। ফলে আরও তাড়াতাড়ি সরকার পরিচালিত শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করা যাবে।

শিক্ষায় উগ্র হিন্দুত্ববাদী আক্রমণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাথায় বসানো হচ্ছে এমন লোকজনকে যাদের একমাত্র যোগ্যতা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রতি দায়বদ্ধতা। বিভিন্ন রাজ্যে বি জে পি-র সরকার স্কুলের পাঠ্যবইয়ে সাম্প্রদায়িকতা মাথায় ঢোকান হচ্ছে। মন্ত্রক বৈদিক শিক্ষা পর্ষদ গড়ার কথা ঘোষণা করেছে। ‘গো-বিজ্ঞান’ এবং বিজ্ঞানের নামে ভুল চিন্তার ওপর গবেষণা এবং প্রকল্পে সরকারি অর্থ দেওয়া হচ্ছে। নয়া উদারবাদ এবং উগ্র হিন্দুত্বের বিষাক্ত মিশেল বানানো হচ্ছে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement