কালো পতাকা

  ১৩ই জুলাই , ২০১৮

১৪টি খরিফ ফসলের ন্যূনতম সহায়কমূল্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী আর অপেক্ষা করেননি। এক সপ্তাহের মধ্যেই বেরিয়ে পড়েছেন কৃষকদের জন্য তাঁর ‘ঐতিহাসিক’ ও ‘গর্বের’ কাজের ফিরিস্তি শোনাতে রাজ্য সফরে। এ যাত্রায় তিনি পাঞ্জাব, উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ সহ বিভিন্ন রাজ্যে কৃষক কল্যাণ সমাবেশে ভাষণ দেবেন। এই পর্যায়ে তাঁর প্রথম সভা হয়েছে পাঞ্জাবে। প্রতিবেশী হরিয়ানা ও রাজস্থান থেকেও কৃষকরা তাতে যোগ দিয়েছেন। নাম যাই হোক না কেন এটা যে আসলে আগামী লোকসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি তা ভাষণ থেকে পরিষ্কার। বস্তুত ক্ষুব্ধ কৃষকদের মন পেতে পরিকল্পনা করেই ধাপের কৃষক দরদের নমুনা প্রদর্শনের আয়োজন শুরু হয়েছে। ১৪টি খরিফ শস্যের এম এস পি বৃদ্ধির ঘোষণা তারই অঙ্গ।

গত লোকসভা নির্বাচনের আগে দলীয় নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে মোদীরা ঘোষণা করেছিল ক্ষমতায় এলে ফসলের সহায়কমূল্য চাষের খরচের দেড়গুণ করা হবে। স্বয়ং মোদী বিভিন্ন জনসভায় গিয়ে একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কৃষি সংকটে জর্জরিত মানুষ মোদীদের বিশ্বাস করেছিলেন। ভেবেছিলেন বি জে পি ক্ষমতায় এলে নিশ্চয়ই কৃষকের সমস্যা কমবে। তাছাড়া ‘আচ্ছে দিন’-র হাতছানি, বেকারদের চাকরি, বিদেশ থেকে কালো টাকা এনে প্রত্যেককে ১৫ লক্ষ করে টাকা দান ইত্যা‍‌দি মিলিয়ে এমন এক মোহজাল তৈরি করা হয়েছিল যাতে সরল মানুষ বিশ্বাস করেছিলেন। গ্রামের মানুষের বিরাট সমর্থন নিয়ে মোদী প্রধানমন্ত্রী হলেও ভুলে গেলেন কৃষকের কথা। খরচের দেড়গুণ সহায়কমূল্য দূরের কথা ১০ শতাংশও বাড়েনি প্রথম তিন বছরে। উলটে বাণিজ্যনীতি শিথিল করে আমদানি সহজ করা হয়েছে। ফলে বাজারে অনেক কৃষিপণ্যের দাম কমে যাওয়ায় কৃষকরা মার খেয়েছেন। একে কম সহায়কমূল্য তার ওপর সরকারি ক্রয় অপর্যাপ্ত। ফলে কৃষকদের ফসল বেচতে হয় চাষের খরচেরও কম দামে। এর মধ্যে নোটবন্দি এবং জি এস টি — পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। কৃষকের জীবন কার্যত বিপন্ন। কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনা যেমন বেড়েছে তেমনি কৃষকদের ক্ষোভ-বিক্ষোভও তীব্র হয়েছে। ক্রমবর্ধমান কৃষক আন্দোলন স্পষ্ট করে দিচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে তাঁদের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছে। মোদীরা আঁচ পাচ্ছিলেন সেই ক্ষোভ বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে নির্বাচনে। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে কৃষকসমাজের ক্ষোভ প্রশমন না হলে আগামী নির্বাচনে বিপদ অনিবার্য। তাই গত চার বছর কৃষকদের কথা মনে না পড়লেও এখন দ্রুত কৃষক দরদি হয়ে উঠতে হচ্ছে। এবারের বাজেটে তাই কৃষকদের মন পেতে গুচ্ছ গুচ্ছ প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। বাজেটেই বলা হয়েছে সহায়কমূল্য চাষের খরচের দেড়গুণ হবে।

বাস্তবে যে বৃদ্ধি হয়েছে সেটা মোটেই দেড়গুণ নয়। আসলে চাষের খরচ ঠিক করার ক্ষেত্রেই কারচুপি রয়েছে। বলা হয়েছিল স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সহায়কমূল্য বাড়বে। কিন্তু যে ফরমুলা অনুযায়ী চাষের খরচ নির্ধারণ করতে বলা হয় কমিশনের রিপোর্টে মোদীরা তা অনুসরণ করেনি। তারা অনেক কম চাষের খরচ ধরে তার দেড়গুণ সহায়কমূল্য ঘোষণা করেছে। কৃষকদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। আর এই ভুল হিসাবকেই মোদীরা ঐতিহাসিক বলে দাবি করছেন এবং তার জন্য গর্ববোধ করছেন। যে ১৪টি ফসলে সদ্য সহায়কমূল্য ঘোষণা হয়েছে তাতে প্রকৃতপক্ষে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে। বুজরুকি দিয়ে কৃষকদের সঙ্গে বেইমানি করে মোদীরা প্রচারের ঝড়ে মিথ্যাকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা দিতে চাইছেন। মোদীর রাজ্য সফর এবং কৃষক কল্যাণ সমাবেশগুলি এমন অশুভ উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিত। অবশ্য যত চমক আর নাটকই করুন প্রধানমন্ত্রী এবার আর অত সহজে কৃষকদের ভোলানো যাবে না। শয়তানি তাঁরা ধরে ফেলবেন। পাঞ্জাবে প্রথম সমাবেশে যাবার পথে কালো পতাকা নিয়ে বিক্ষোভের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী টের পেয়েছেন।

Featured Posts

Advertisement