পার্টি সংগঠন ও
আমাদের কর্তব্য

প্রমোদ দাশগুপ্ত   ১৩ই জুলাই , ২০১৮

আজ কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্তের ১০৯তম জন্মদিবস। কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্তের লেখা এই প্রবন্ধটি ১৯৮০ সালে দেশহিতৈষীর শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধ‍‌টি সেই সময়ের রাজনৈতিক-সাংগঠনিক পরিস্থিতিতে লেখা হলেও আজও তা অনেকাংশে প্রাসঙ্গিক। তাই প্রবন্ধটির অংশবিশেষ পুনঃপ্রকাশ করা হলো কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্তের জন্মদিনে।

একটি প্রকৃত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠনের গুরুত্ব বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয় ১৯২১ সালের কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের তৃতীয় কংগ্রেসে গৃহীত কমিউনিস্ট পার্টিসমূহের সংগঠন ও কাঠামো সম্পর্কে প্রস্তাবে। লেনিন নিজে এই প্রস্তাবের খসড়া রচনা করেন। এই খসড়া প্রস্তাব গৃহীত হবার পর প্রায় ষাট বছর অতিক্রান্ত হতে চলল। এই ষাট বছরে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের অনেক অগ্রগতি ঘটেছে। বর্তমান বিশ্বে খুব কম সংখ্যক দেশই রয়েছে যে সমস্ত দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়নি। খুব কম দেশই রয়েছে যে সমস্ত দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পুরোভাগে শ্রমিকশ্রেণির পার্টি কমিউনিস্ট পার্টি নেই। ষাট বছর পূর্বে কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠন সম্পর্কে যে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল সেই প্রস্তাবের বহু ধারাই আজও বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠনের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। এই প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয় : কমিউনিস্ট পার্টির জীবনে এরকম কোনও যুগ হতে পারে না যখন তার পার্টি সংগঠনকে কোনও রাজনৈতিক কাজ করতে হয় না। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে এবং এইসব পরিস্থিতিতে যে সব পরিবর্তন আসে সেগুলি ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে সাংগঠনিক রণনীতি ও রণকৌশল বিকশিত করতে হবে। পার্টি যতই দুর্বল হোক না কেন, তবু পার্টিই সুসংবদ্ধভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে সংগঠিত প্রগতিশীল প্রচার কার্যের মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর রাজনৈতিক ঘটনাবলির বা সমগ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আলোড়ন সৃষ্টিকারী ব্যাপক ধর্মঘটগুলির সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করতে পারে। একটি বিশেষ পরিস্থিতিকে এভাবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত পার্টি কর্তৃক একবার গৃহীত হবার পর এই অভিযানেই পার্টিকে তার সকল সভ্যের এবং পার্টির কর্মশক্তি কেন্দ্রীভূত করতে হবে।

পার্টি সংগঠন যাতে যে কোন পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন করে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পার্টির সর্বস্তরের কর্মীদের সমবেত করতে সক্ষম হয় সেজন্য কমিউনিস্ট কার্যকলাপের মূল কর্তব্যগুলি হলো :

১) কমিউনিস্ট পার্টিকে হতে হবে বিপ্লবী মার্কসবাদের ট্রেনিং স্কুল। পার্টি কার্যকলাপের নিত্যকর্মের মধ্য দিয়েই সংগঠনের বিভিন্ন অংশ আর পার্টি সদস্যদের মধ্যে সাংগঠনিক যোগসূত্র স্থাপিত হয়।

২) কমিউনিস্টরা কর্মসূচি গ্রহণ করে, পার্টির প্রচারে পুরানো মতবাদের জায়গায় কমিউনিস্ট শিক্ষাকে প্রতিস্থাপিত করে এবং শত্রু শিবিরের অন্তর্ভুক্ত কর্মকর্তাদের হটিয়ে তাদের জায়গায় কমিউনিস্ট কর্মকর্তা নিয়োগ করে। আত্মসন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকার বিপদ প্রত্যেকটি শ্রমিকশ্রেণির পার্টির জীবনেই তার কমিউনিস্ট রূপান্তরের প্রথম স্তরগুলিতে দেখা দেয়। কমিউনিস্ট কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে কমিউনিস্ট হবার অভিলাষের অভিব্যক্তি মাত্র। কমিউনিস্ট কাজকর্ম যদি না হয় এবং সাধারণ সভ্যদের নিষ্ক্রিয়তা যদি বিরাজ করতে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে যে কমিউনিস্ট কর্মসূচি গ্রহণের সময় পার্টি যে শপথ গ্রহণ করেছিল তার সামান্যতম অংশও পার্টি পূরণ কর‍‌ছে না। কেন না পার্টির বিরামহীন দৈনন্দিন কাজে সকল সভ্যের অংশগ্রহণই হচ্ছে কর্মসূচি আন্তরিকভাবে কার্যকর করার প্রথম শর্ত।

৩) প্রলেতারীয় শ্রেণি সংগ্রামের জন্য প্রত্যেককে কাজে লাগাবার, পার্টির সকল সভ্যের মধ্যে পার্টির কাজ ভাগ করে দেবার এবং পার্টি সভ্যদের মাধ্যমে প্রলেতারিয়েতের ব্যাপক জনগণকে বিপ্লবী আন্দোলনের দিকে অনবরত আকর্ষণ করে আনার যোগ্যতার মধ্যেই নিহিত রয়েছে কমিউনিস্ট সংগঠনের কলা‍‌কৌশল। অধিকন্তু পার্টিকেই তার নিজের হাতে সমগ্র আন্দোলনের হাল ধরতে হবে নিজের ক্ষমতার দৌলতে নয়, নিজের কর্তৃত্ব, শক্তি, বৃহত্তর অভিজ্ঞতা, সর্ব বিষয়ে বৃহত্তর জ্ঞান ও কর্মক্ষমতার দৌলতেই পার্টিকে এ হাল ধরতে হবে।

৪) পার্টিতে কেবল প্রকৃত সক্রিয় সদস্যরাই থাকবে এই চেষ্টাই কমিউনিস্ট পার্টিকে করতে হবে। প্রত্যেকটি সাধারণ পার্টিকর্মীর কাছে এই দাবিই করতে হবে যে, বর্তমান অবস্থায় তার সাধ্যানুযায়ী তাকে তার সমস্ত শক্তি ও সময় পার্টির হাতে তুলে দিতে হবে এবং পার্টির কাজে তার সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিগুলি নিয়োগ করতে হবে।

৫) পার্টির কাজের বিভিন্ন শাখার দৈনন্দিন কাজের জন্য, ঠিক সময়ে যথাযথভাবে প্রচারকার্য পরিচালনার জন্য, পার্টি অধ্যয়নের জন্য, পার্টি পত্রিকার কাজের জন্য, পার্টির পত্র-পত্রিকা, ইশ্‌তেহার, পুঁথিপত্র বিলি করার জন্য, পার্টির তথ্য বিভাগের জন্য, পার্টির নিত্যকার্যের জন্য কমিউনিস্টদের বিশেষ উদ্যোগী হতে হবে।

৬) পার্টিতে সাধারণ বাধ্যতামূলক কাজ প্রবর্তন করা এবং এইসব ছোট ছোট কাজের গ্রুপ সংগঠিত করা কমিউনিস্ট গণপার্টিগুলির পক্ষে এক বিশেষ ধরনের কঠিন কাজ। এক সঙ্গে এক মুহূর্তে এ কাজ কার্যকর করা যেতে পারে না। এরজন্য চাই অবিচলিত অধ্যবসায়। পরিণত বিচার বিবেচনা আর প্রচুর কর্মশক্তি।



কমিউনিস্ট পার্টিকে দৃ‌ঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে, কমিউনিস্ট পার্টি যাতে প্রতিটি রাজনৈতিক বাঁকের মুখে দাঁ‍‌ড়িয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, যাতে শ্রেণি সংগ্রামগুলির সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারে সেজন্য ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র সংগঠনকে শক্তিশালী করে তুলতে পার্টির হাওড়া প্লেনাম থেকে কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। হাওড়া প্লেনামের এই সমস্ত সিদ্ধান্তের মূল কথা হলো, ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাষ্ট্র কাঠামো ইত্যাদির সঠিক মূল্যায়ন করে জন-গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করে তোলার জন্য পার্টি কর্মসূচির বাস্তব রূপায়ণের উপযোগী পার্টি সংগঠন গড়ে তোলা। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র দশম কংগ্রেসেই বিষয়‍‌টি বিশেষ প্রাধান্য পায়। দশম কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রস্তাব পার্টির সর্বাধিক গুরুত্ব কর্তব্য তুলে ধরে। সে কর্তব্য হলো, দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলির একটা আমূল পুনর্বিন্যাস ঘটানো, যে পুনর্বিন্যাসের ফলে বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি আজকের দিনে যা দুটো বুর্জোয়া জমিদার জোট — কংগ্রেস ও জনতার একমাত্র প্রগতিশীল বিকল্প, দেশব্যাপী তাদের একটা যুক্তফ্রন্ট বাস্তব রূপ পায়। প্রস্তাবে বলা হয়েছে : ‘‘বর্তমান রাজনৈতিক সম্পর্ক বদলে জনগণকে পরিচালিত করতে পারে, এমন একটি সম্ভাব্য বিকল্প শক্তির রূপ দেওয়াই হবে পার্টির রাজনৈতিক কর্মতৎপরতার নিরন্তর লক্ষ্য। এই রূপ একটি ব্যাপক ভিত্তিক বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক শক্তির ফ্রন্টের অভ্যুদয় বিপ্লবী শক্তিসমূহের শক্তিবৃদ্ধি করবে, আর এই বিপ্লবী শক্তিই একমাত্র পারে ক্রমশ ঘনায়মান দীর্ঘদিনের চলে আসা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে।’’

দশম কংগ্রেসের এই রাজনৈতিক প্রস্তাবের সূত্র ধরেই পার্টি হাওড়া প্লেনাম জরুরি কর্তব্য সম্পর্কে এই নির্দেশ দেয় যে, ‘‘এই ধরনের বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠনে যে সময়ই লাগুক এবং একে বাস্তবায়িত করতে যত বড় বাধাই আমাদের সামনে আসুক না কেন আর কোনও বিকল্প পথ নেই, কোনও শর্ট-কাটও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কংগ্রেস দলের ত্রিশ বছর বুর্জোয়া-জমিদার-শ্রেণি শাসন...নিঃসন্দেহে প্রমাণ করছে যে, এই শ্রেণি শাসন দেশের কোনও মূল অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারবে না, নিশ্চিত করতে পারে না আমাদের দেশে কোনও স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাও।

‘‘এই বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে তুলতে অবশ্য প্রয়োজন সংগঠনের অভূতপূর্ব বৃদ্ধি, শ্রমজীবী জনগণের সমস্ত অংশের সংগ্রাম এবং দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় আগ্রহী সবারই আন্দোলনের প্রসার। শ্রমিকশ্রেণি, কৃষক ও শ্রমজীবী জনগণের অন্যান্য সমস্ত অংশ তথা সমস্ত শ্রেণির, সমাজের সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলির সংগ্রামী সংগঠনের সংখ্যা ও ঐক্যের দ্রুত বৃদ্ধি হলো অন্য কথায় বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের মূল ও সারবস্তু।

‘‘এরজন্য আবার প্রয়োজন শ্রমিকশ্রেণির পার্টির প্রচুর শক্তিবৃদ্ধি, বিভিন্ন রাজ্যে তার সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি, যে কাজে তারা রত সেই জঙ্গি কর্মতৎপরতা অন্যান্য সব সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, সামন্ততন্ত্রবিরোধী, একচেটিয়া বিরোধী এবং গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের সাথে তাদের ঐক্য বন্ধন। ট্রেড ইউনিয়ন, কিষানসভা ও শ্রমজীবী জনগণের অন্যান্য সংগঠনে লক্ষ লক্ষ নতুন সদস্য টেনে আনা, এইসব সংগ্রামী সংগঠনে কর্মরত হাজারে হাজারে সক্রিয় কর্মীকে শ্রমিকশ্রেণির পার্টির সদস্য করে নেওয়া, নতুন সদস্যদের শিক্ষিত করে তোলা ও পুরানোদের আবার শিক্ষাদানের প্রক্রিয়া অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়া, গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার বিপ্লবী নীতির ভিত্তিতে, পার্টির উচ্চতর ও নিম্নতর ইউনিটগুলির মধ্যে এবং প্রতিটি ইউনিটের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখার একটা ব্যবস্থা করা — শ্রমিকশ্রেণির পার্টিকে যে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে হবে, এগুলি হলো তারজন্য অত্যাবশ্যকীয় পূর্ব শর্ত। বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির কোনও খাঁটি ফ্রন্টের জন্য শ্রমিকশ্রেণির পার্টির এই ভূমিকা প্রয়োজন। দশম কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রস্তাব তাই পার্টির বড় রকমের প্রসারের ডাক দিয়েছে।

পার্টি প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে পার্টিকর্মীদের শিক্ষিত করে তোলা এবং পার্টি সংগঠনকে দৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সংগঠন সংক্রান্ত প্রস্তাবে কতকগুলি বিষয়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। পার্টি সংগঠন সম্পর্কে ৮৬ দফা প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে রয়েছে :

১) লেনিনবাদী পার্টির কাছাকাছি আসার জন্য প্রয়োজন হচ্ছে পার্টির রাজনৈতিক ও কাজের সংগ্রামের সঙ্গে দেশের সর্বপ্রকারের মার্কসবাদ বিরোধী ও অ-মার্কসীয় আদর্শগুলির বিরুদ্ধে বিরামহীন মতাদর্শগত সংগ্রাম যুক্ত করা। এই ধরনের সংগ্রাম ছাড়া মার্কসবাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। পার্টির প্রভাব, পার্টি পরিচালিত গণসংগ্রামগুলির শক্তি এবং পার্টিসদস্য সংগ্রহের কাজের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন ঘাটতির অন্যতম কারণ এই সর্বমুখী সংগ্রাম পরিচালনায় ব্যর্থতা।

২) এটা ছাড়া অর্থনৈতিক সংগ্রামগুলির মধ্য দিয়ে সৃষ্ট প্রাথমিক অর্থনৈতিক চেতনাকে সমাজতান্ত্রিক চেতনায় রূপান্তরিত করা যায় না। সদস্যের বসে যাওয়ার এবং শক্তিশালী মতাদর্শগত কেন্দ্র গড়ে তোলার ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হলো মতাদর্শগত সংগ্রামের অভাব। আমাদের প্রভাবে যে বিরাট শ্রমিক, কৃষকবাহিনী প্রভৃতি আছেন তাঁদের অবশ্যই জনগণের রাজনৈতিক সংগ্রামে ক্রমবর্ধমান ভূমিকা গ্রহণ প্রয়োজন। তাঁদের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক কর্মতৎপরতাগুলিকে পার্টির মতাদর্শগত সংগ্রামের দ্বারা সাহায্য ও উন্নীত করতে হবে।

৩) পার্টির সম্প্রসারণ এবং পার্টি সদস্যদের শিক্ষা পার্টি গঠনের একই প্রক্রিয়ার অঙ্গ। পার্টি সদস্যদের চেতনা ও গুণগতমানের উন্নয়নের প্রতি জরুরি নজর দেওয়া প্রয়োজন। পার্টির সদস্য এবং নতুন যোগদানকারীদের মানোন্নয়নের জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা না চালালে বৈপ্লবিক গণপার্টি গঠনের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হবে না।

৪) এই প্রসঙ্গে পার্টিসদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ১৯৬৪ সালের পর পার্টিতে যোগদানের ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৫) এই সহস্র সহস্র পার্টিসদস্য অসংখ্য সংগ্রাম দেখেছেন, পুলিশি অত্যাচারের সম্মুখীন হয়েছেন এবং অত্যন্ত কঠিন অবস্থার মধ্যে পার্টির পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। এঁরা সদস্য পদের সম্পূর্ণ যোগ্য। কিন্তু পার্টি এঁদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে পারেনি। আগেকার বছরগুলির দক্ষিণ ও বাম বিচ্যুতি সমূহের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত এঁদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন, বিশেষ করে মার্কসবাদের মৌলিক নীতিগুলি সম্পর্কে শিক্ষাদান। এই ত্রুটি যদি কাটিয়ে না ওঠা যায় তাহলে মতাদর্শে বিভ্রান্তি ও দলীয়পনা আসতে বাধ্য।

৬) পার্টির সারাক্ষণের কর্মী ও ক্যাডার হলেও আত্মত্যাগ ও পার্টির আদর্শের প্রতি নিষ্ঠার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বহু সংখ্যক শ্রমিক ও খেতমজুর ও পার্টি ক্যাডারকে সারাক্ষণের কর্মী হিসাবে নিয়োগ করার উপর গুরুত্ব দিতে হবে।

৭) সাধারণ অভিজ্ঞতা হলো, সংগ্রামী যুব ক্যাডাররা রুটিনমাফিক কাজ করে যান। তাঁরা দৈনন্দিন কাজের মধ্যে ডুবে থাকেন। তাঁরা এটা বুঝতে পারেন না যে, শুধু এই কাজ তাঁদের চেতনার উন্নতির সহায়ক হবে না। সঠিক মতাদর্শগত শিক্ষালাভ এবং বিশেষ দৃষ্টিলাভ থেকে বঞ্চিত এঁরা জবরদস্ত অথবা সংগঠনের কর্তাব্যক্তি হন, এবং পার্টি নেতৃত্বের মানে উঠতে সক্ষম হন না। সম্ভাবনাপূর্ণ যুব পার্টিকর্মীদের যদি মতাদর্শগত শিক্ষালাভের বিশেষ সুযোগ করে দেওয়া যায় এবং আত্মবিকাশের জন্য তাঁদের যদি প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ করা যায় তাহলে পার্টিকর্মীদের এই প্রচণ্ড অপচয় এড়ানো সম্ভব।

৮) পার্টি গঠনের কাজের ক্ষেত্রে কয়েকটি সাংগঠনিক শিথিলতা ও অবহেলা ছাড়া, মূলত সমস্যাটি হলো দৈনন্দিন সংগ্রামের প্রাথমিক চেতনাকে রাজনৈতিক ও সমাজতান্ত্রিক চেতনার স্তরে রূপান্তরিত করার সমস্যা। এরজন্য প্রয়োজন জনগণের ম‍‌ধ্যে পার্টির নিবিড় ও বর্তমান রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা এবং সর্বোপরি সর্বপ্রকারের সামন্তবাদী, আধা-সামন্তবাদী, মার্কসবাদ বিরোধী বুর্জেয়া মতাদর্শের বিরুদ্ধে লাগাতার মতাদর্শগত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া — এই কাজটির দায়িত্ব কেন্দ্রীয় কমিটি ও রাজ্য কমিটি উভয়কেই করতে হবে।

Featured Posts

Advertisement