দেশজুড়ে মোদী সরকারের
বিরুদ্ধে মানুষের ঐক্য
তৈরি হচ্ছে: ইয়েচুরি

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৩ই জুলাই , ২০১৮

কলকাতা, ১২ই জুলাই— দেশের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সংবিধানকে রক্ষা করা এবং জনগণের জীবন-জীবিকার উন্নতির সবকিছুই নির্ভর করছে মোদী সরকারকে উৎখাত করতে পারার ওপর। বৃহস্পতিবার কলকাতায় সি পি আই (এম)-র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি একটি সাংবাদিক বৈঠকে একথা উল্লেখ করে বলেছেন, মোদী সরকার থাকলে দেশকে রক্ষা করা যাবে না এটা ক্রমশ সবাই বুঝতে পারছেন। সব রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতৃত্বের ওপরে জনমতের চাপ বাড়ছে মোদী সরকারকে উৎখাতের জন্য। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ লক্ষণ যে দেশজুড়ে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ঐক্য গড়ে উঠছে এবং সব বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির নেতৃত্বও জনমতের চাপ বুঝতে পারছেন।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে মমতা ব্যানার্জি যে ধরনের ‘মহাগটবন্ধন’ তৈরির কথা বলছেন তাকে অবাস্তব আখ্যা দিয়ে সীতারাম ইয়েচুরি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ভারতে নির্বাচনের আগে জাতীয় স্তরের এমন কোনও ‘মহাগটবন্ধন’ কখনো হয়নি, দেশের বৈচিত্র্যের কারণে তা সম্ভবও নয়। যেটা হতে পারে সেটা হলো ১৯৮৯ সালে, ১৯৯৬ সালে কিংবা ২০০৪ সালে নির্বাচনে যেভাবে ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল সেইরকম কিছুর পুনরাবৃত্তি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্বাচনের পরে বিকল্প ধর্মনিরপেক্ষ সরকার গঠনে দলগুলি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। আমার মনে হয় ২০১৯ সালেও তাই ঘটতে পারে, তবে সেটা নির্বাচনের পরে। নির্বাচনের আগে রাজ্যে রাজ্যে বি জে পি বিরোধী দলগুলির মধ্যে সমঝোতা যতটা সম্ভব বাড়াতে হবে যাতে সামগ্রিকভাবে বিরোধী ঐক্যের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, তামিলনাডুতে মূল শক্তি ডি এম কে, তারা স্লোগান দিয়েছে ‘এ আই এ ডি এম কে হঠাও তামিলনাড়ু বাঁচাও, বি জে পি হঠাও দেশ বাঁচাও’। যেমন বাংলায় আমাদের স্লোগান ‘তৃণমূল হঠাও বাংলা বাঁচাও, বি জে পি হঠাও দেশ বাঁচাও’।

তৃণমূলনেত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি গণতন্ত্র বাঁচাতে সব আঞ্চলিক দলগুলিকে যে ডাক দিচ্ছে তা কার্যকরী হবে কিনা সাংবাদিকদের এই প্রশ্ন শুনে ইয়েচুরি বলেন, এই রসিকতার কী মানে আছে! পশ্চিমবঙ্গে উনি পঞ্চায়েত নির্বাচনে কী করেছেন? যিনি নিজেই গণতন্ত্র ধংস করছেন, তিনি গণতন্ত্র বাঁচানোর জন্য ডাক দিলে কে আসবে? সবাই জানে পশ্চিমবঙ্গে কী ঘটছে, সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত বলেছে পঞ্চায়েত নির্বাচনে এরাজ্যে সংবিধানপ্রদত্ত স্থানীয় স্বায়ত্বশাসনের গণতন্ত্রকে রক্ষা করা হয়নি।

তৃণমূলকে আদৌ বি জে পি-বিরোধী হিসাবে মানতে অস্বীকার করে ইয়েচুরি বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের সহযোগিতাতেই বি জে পি প্রসারিত হচ্ছে। সংসদে বি জে পি-র কঠিন পরিস্থিতি এলেই তৃণমূলকে সক্রিয় হতে দেখা যায় না। আবার সারদা-নারদ নিয়ে বি জে পি-কে সক্রিয় হতে দেখা যায় না। এই জন্যই হয়তো সব রাজ্যের আগে পশ্চিমবঙ্গে ‘কিষানবন্ধু’ হিসাবে পা রাখতে আসছেন প্রধানমন্ত্রী। অন্য রাজ্যে এই সাজে যেতে পারছেন না।

এদিন মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ ভবনে সি পি আই (এম)-র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির বৈঠকের প্রথম দিনে উপস্থিত ছিলেন সীতারাম ইয়েচুরি। সভায় ২২তম পার্টি কংগ্রেসের পরবর্তী সময়ে ঘটনাবলীর মূল প্রবণতা ব্যাখ্যা করেন তিনি। সামনের দিনের আন্দোলন-সংগ্রামের কর্মসূচি এবং সাংগঠনিক কর্তব্য সম্পর্কেও বলেন ইয়েচুরি। রাজ্য কমিটির সভায় পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর্যালোচনা ও আগামী আন্দোলনের কর্মসূচি সম্পর্কে রিপোর্ট পেশ করেন রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র। বৈঠক শুক্রবার পর্যন্ত চলবে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করছেন বিমান বসু। এদিন বৈঠকের মাঝেই সি পি আই (এম)-র পলিট ব্যুরো সদস্য মহম্মদ সেলিমকে সঙ্গে নিয়ে ইয়েচুরি সাংবাদিক বৈঠক করেছেন।

সাংবাদিকদের কাছে ইয়েচুরি বলেছেন, দেশের পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর। মোদী সরকারের নীতিতে মানুষের জীবনযন্ত্রণা বাড়ছে, কৃষি সংকট গভীরতর হচ্ছে, কৃষক আত্মহত্যা বাড়ছে। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দেওয়ার নামে কৃষকদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে মোদী সরকার। স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশমাফিক ‘সি ২’ পদ্ধতিতে গণনা না করে উৎপাদন খরচের থেকেও কম দেওয়া হচ্ছে বেশিরভাগ ফসলে। সরকার ১১.৫ লক্ষ কোটি টাকা কর্পোরেট ঋণ মকুব করে দিতে পারছে কিন্তু কৃষকদের ঋণ মকুব করতে পারছে না। পেট্রল ডিজেলের দাম বাড়িয়ে জনগণের ওপরে বোঝা চাপাচ্ছে। বছরে ২কোটি বেকারের কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে কর্মসংস্থান কমে গেছে। বেকারি সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশও বন্ধ করে দিয়েছে। গোরক্ষা, নীতিপুলিশি, ইত্যাদি চলছিলোই। এখন শিশুচুরির গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে হত্যাও করা হচ্ছে। বি জে পি-র বিধায়ক শিশু ধর্ষণে গ্রেপ্তার হয়েছে। সারাদেশে ঘৃণা ও হিংসার বাতাবরণ তৈরি করছে আর এস এস-বি জে পি। জম্মু ও কাশ্মীরের সমস্যার কোনও স্থায়ী সমাধান তারা করতে চাইছে না। বরং কাশ্মীরের পরিস্থিতিকে অশান্ত রেখে তার মাধ্যমে সারা দেশে মেরুকরণ করতে চাইছে নির্বাচনের আগে। আর এস এস গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলির পাশাপাশি আমলাতন্ত্রেও দখলদারিত্ব কায়েম করতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছেন ইয়েচুরি।

এই পরিপ্রেক্ষিতে দেশজুড়ে গণআন্দোলনের কর্মসূচিকে সফল করার লক্ষ্যে সি পি আই (এম)-র ভূমিকা নির্দিষ্ট করে দিয়ে ইয়েচুরি বলেছেন, মোদী সরকারের নীতির বিরুদ্ধে ৯ই আগস্ট শ্রমিক শ্রেণি ও কিষান সংগঠনের ডাকা জেল ভরো আন্দোলন এবং তারপরে ৫ই সেপ্টেম্বর দিল্লিতে সংসদের সামনে মহাসমাবেশ হবে। এই কর্মসূচি সফল করতে আমাদের পার্টি সার্বিক সাহায্য করবে। জনগণের কাছে মূল বিষয়গুলি পৌঁছে দিতে হবে। মোদী সরকার যেভাবে আইন পরিবর্তন করে নির্বাচনে কর্পোরেট ফান্ডিংয়ের আগল খুলে দিতে চাইছে তার বিরুদ্ধে সি পি আই (এম) দেশজুড়ে প্রচার করবে। সংবিধান অনুসারে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক রক্ষার ও রাজ্যগুলির অধিকার রক্ষার দাবিতেও সি পি আই (এম) সরব। কোন রাজ্যে কোন দল সরকারে আছে তা না দেখেই রাজ্যের অধিকার রক্ষার দাবিতে লড়াই করবে সি পি আই (এম)। প্রয়োজনে বি জে পি বিরোধী সব ধর্মনিরপেক্ষ রাজ্য সরকারগুলির মুখ্যমন্ত্রীদের নিয়ে বৈঠক করা হবে। দলিতদের অধিকারের দাবিতেও লড়াই করা হবে।

ইয়েচুরি বলেছেন, বি জে পি-র আক্রমণের মূল লক্ষ্য বামপন্থীরা, বিশেষত সি পি আই (এম)। আমরাই বি জে পি-র মূল মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক বিরোধী, কারণ আমরাই নিরবচ্ছিন্নভাবে বি জে পি-র নীতি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। এই কারণে সি পি আই (এম)-র ওপর আক্রমণ চলছে, ত্রিপুরায় এখনও সি পি আই (এম)-র অফিসগুলিতে ভাঙচুর করা হচ্ছে। আর বাংলায় পঞ্চায়েত নির্বাচনে নগ্নভাবে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে। বাংলা ও ত্রিপুরায় এই আক্রমণের প্রতিবাদে আগামী ২৪শে জুলাই দেশজুড়ে জাতীয় প্রতিবাদ দিবস পালন করা হবে। সি পি আই (এম), সি পি আই, ফরওয়ার্ড ব্লক, আর এস পি এবং সি পি আই (এম এল) লিবারেশন এই পাঁচটি বামপন্থী দল দেশজুড়ে এই কর্মসূচি পালন করবে। এছাড়াও দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য সব ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শক্তিকে আহবান করা হচ্ছে। ১৭টি দলের মঞ্চ ‘সাঁঝা বিরাসৎ’-কে আবার পুনরুজ্জীবিত করা হবে।

কেরালায় সি পি আই (এম)-র উদ্যোগে রামায়ণ পাঠের আয়োজন করার অপপ্রচার নিয়ে একটি প্রশ্নের জবাবে ইয়েচুরি বলেছেন, কেরালায় সি পি আই (এম) এমন কোনও কর্মসূচি নেয়নি। ওখানে পরম্পরা অনুসারে ‘ওনাম’ উৎসবের সময় রামায়ণ পাঠ ও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। কিন্তু তার সঙ্গে পার্টির কোনও সম্পর্ক নেই।

মিশনারিজ অব চ্যারিটির বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীরা শিশু পাচারের যে অভিযোগ তুলেছে সেই সম্পর্কে একটি প্রশ্নের উত্তরে ইয়েচুরি বলেছেন, কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হতেই পারে। কিন্তু সারা বিশ্বে শ্রদ্ধেয় মাদার টেরিজার সংস্থাটিকে এই অজুহাতে হেনস্তা করা উচিত নয়। আর এস এস – বি জে পি সেই চেষ্টাই করছে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement