হাট-বাজারের ফতোয়ায় এখন
ওষুধও জুটছে না ভাবাদিঘির

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১১ই আগস্ট , ২০১৮

কলকাতা, ১০ই আগস্ট— বিহার, উত্তর প্রদেশ বা রাজস্থান নয়। পশ্চিমবঙ্গের ভাবাদিঘি।

নিজেদের জীবন জীবিকার ভরসা দিঘি দিতে না চাওয়ায় ভাবাদিঘির বাসিন্দাদের সামাজিক বয়কট! দোকানে দোকানে তৃণমূল ঢ্যাড়া পিটিয়ে বলে আসছে কোনও মতেই ভাবাদিঘির মানুষকে কোনও কিছুই বিক্রি করা যাবে না।

সরকারের ‘উন্নয়ন ক্যাম্পে’ ভাবাদিঘি যোগ না দেওয়াতেই প্রতিশোধ নিচ্ছে তৃণমূল, অভিযোগ গ্রামবাসীদের। গত ২০শে জুলাই ভাবাদিঘি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘উন্নয়ন ক্যাম্প’ করে জেলা প্রশাসন। সেদিন সকাল থেকে খোদ মহকুমাশাসক গ্রামে গিয়ে হ্যান্ডমাইক নিয়ে ঘোষণা করতে থাকেন। তফসিলি জাতি শংসাপত্র, কন্যাশ্রী বা শিক্ষাশ্রীর মতো সরকারি সুবিধা পেতে চাইলে স্কুলে এসে ক্যাম্পে নাম লেখান গ্রামের বাসিন্দারা। দফায় দফায় সকাল থেকে মাইকে করে প্রচার চালানো হলেও ভাবাদিঘির একজন বাসিন্দাও হাজির হননি ‘উন্নয়ন’ ক্যাম্পে।

জীবনদায়ী ওষুধ, মুদিখানা থেকে জমির সার, কীটনাশক কোন কিছুই বিক্রি করা যাবে না ভাবাদিঘির বাসিন্দাদের। ভাবাদিঘির মানুষের অভিযোগ, গত ৩রা আগস্টের পর থেকেই গোঘাট ব্লকের একের পর এক হাট, বাজারে সমাজিক বয়কটের ফতোয়া জারি করেছে তৃণমূল। গোঘাটে বিশেষ করে কামারপুকুর চটি ও অমরপুর অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি দোকানেই জারি হয়েছে বয়কটের ফতোয়া। দোকানদার জিনিস দেওয়ার আগে জিজ্ঞাসা করছেন ক্রেতা ভাবাদিঘির মানুষ কি না, ভাবাদিঘির নাম শুনলেই হাত উলটে জানিয়ে দিচ্ছেন নিরূপায়! কোনও জিনিস বিক্রি করা যাবে না।

গোঘাটে সার কিনতে গিয়েছিলেন ভাবাদিঘির বাসিন্দা বাসুদেব পোড়েল। অভিযোগ, দোকানদার স্বপন চৌধুরি ভাবাদিঘি শুনেই সার বিক্রি করতে অস্বীকার করেন। অভিযোগ গ্রামের বাসিন্দারা আবেদন করলেও তিনি বলতে থাকেন ‘আমি নিরুপায়, আমি সার বিক্রি করতে পারবো না। সার দিলে আমার দোকানে তালা দিয়ে দেবে। আমাকে যদি রাস্তায় মারধর করে তাহলে কে বাঁচাবে? দিঘির পশ্চিমপাড়ের বাসিন্দাদের মাল দেওয়া যাবে, কিন্তু উত্তরপাড়ের লোকেদের মাল বিক্রি করা যাবে না বলে কড়া নির্দেশ আছে। এ পাড়া ও পাড়া চিনি না, আমি ভাবাদিঘির কাউকেই মাল দেব না।’ সংবাদ মাধ্যমের ক্যামেরাতেও ধরা পড়েছে অসহায় বৃদ্ধ দোকানদারের বক্তব্য।

কারা আপনাকে হুমকি দিচ্ছে ভাবাদিঘির বাসিন্দাদের জিনিস বিক্রি না করার? উত্তরে তিনি জানিয়েছেন ‘এখানকার তৃণমূলের নেতা বাপি দাস, তার সঙ্গে আরও দুজন দোকানে এসেছিল’।

ভাবাদিঘির মানুষকে সামাজিক বয়কট যে শাসকদলের নির্দেশেই হচ্ছে তা কার্যত মেনে নিয়ে বয়কটকেই বৈধতা দিয়েছেন গোঘাটের তৃণমূল বিধায়ক মানস মজুমদার। বয়কট সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য ‘সমগ্র গোঘাট বিধানসভার সব মানুষের দায়িত্ব নেওয়ার অধিকার বা ক্ষমতা আমার নেই। মানুষ এই মুহূর্তে রাগে ফুঁসছে এটুকু বলতে পারি’।

বিধায়ক বেমালুম বলছেন বিধানসভার সব মানুষের দায়িত্ব তাঁর নেই! বিধায়কের মুখে এহেন কথা শুনে ক্ষোভে ফুঁসছেন ভাবাদিঘির বাসিন্দারা। ইতিমধ্যেই সামাজিক বয়কটের গোটা ঘটনা তাঁরা জেলা প্রশাসনের শীর্ষ প্রশাসকদের চিঠি লিখে জানিয়েছেন।

ভাবাদিঘির সমস্যা সমাধানের বদলে শাসকদল কার্যত দুমুখো নীতি নিয়ে চলছে, এমনই অভিযোগ গ্রামবাসীদের। ‘ভাবাদিঘি বাঁচাও কমিটি’-র নেতা রাজকুমার পণ্ডিতের অভিযোগ ‘সেদিন ওদের ক্যাম্পে না যাওয়ার জন্যই ওরা এখন দোকানে দোকানে বলে আসছে আমাদের কোনও জিনিস বিক্রি না করতে। ওষুধের দোকান থেকে পর্যন্ত আমাদের ফিরিয়ে দিচ্ছে। বয়কট করেও ওরা দিঘি নিতে পারবে না। আমরা একমাত্র আদালতের নির্দেশ মেনে চলবো’।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement