দরকষাকষি নয়, বেঁচে থাকার
জন্য চাই মজুরি আইন

স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘটে জেদ বোঝালেন চা শ্রমিকরা

নিজস্ব সংবাদদাতা   ১১ই আগস্ট , ২০১৮

শিলিগুড়ি, ১০ই আগস্ট— মালিক, সরকার জোটে দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে আস্থা হারাচ্ছেন চা শ্রমিক। মজুরির জন্য তাই আইনের স্বীকৃতি জোরদার হচ্ছে চা বাগানে।

৭২ঘণ্টা ধর্মঘট শেষে এমন ধারণা ক্রমশ জোরদার হচ্ছে উত্তরবঙ্গের গোটা চা সমাজে। নিজেদের দাবি আদায়ে চা শ্রমিকদের ধর্মঘট নতুন কোনও ঘটনা নয়, কিন্তু এবারের চা ধর্মঘটে চা শ্রমিকদের জেদ অতীতের সব অভিজ্ঞতাকে ম্লান করে দিয়েছে বলে মনে করছেন জয়েন্ট ফোরাম নেতারা।

‘ন্যূনতম মজুরির জন্য চা শ্রমিকদের জেদ ধরে গেছে। এবং সেই মজুরি এখন আর পারস্পরিক দর কষাকষি করে আদায় করতে আগ্রহী হচ্ছে না চা শ্রমিকরা। মজুরি দিতে হবে আইনকে ভিত্তি করেই, এমনটাই চাইছেন তামাম বাগিচা শ্রমিকরা।’ বলছিলেন জয়েন্ট ফোরামের অন্যতম যুগ্ম আহ্বায়ক জিয়াউল আলম।

চা বাগানে এতদিন দ্বিপাক্ষিক কখনও ত্রিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমেই মজুরি নির্ধারণ হতো। কিন্তু চুক্তি শেষ পর্যন্ত অনেক বাগানেই উপেক্ষিত হতো। চুক্তির মান্যতা দিতে চাইতো না অনেক মালিকই। ফলে চুক্তি মোতাবেক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হতে চা শ্রমিকরা এখন নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝে নিয়েছেন, মজুরি দিতে হবে আইন মেনেই। কোনও দরকষাকষির সমঝোতায় আমরা নেই। চুক্তি করে সেখান থেকে সরে আসার জন্য সরকারের দায়ও কম নয়। এরাজ্যে এখন সরকারি মদতেই চা বাগানসহ সর্বত্র চলছে শ্রম আইন ভাঙার খেলা। সব দেখে শুনে এবার তাই অন্যবারের থেকে আরও মরিয়া হয়ে ধর্মঘটে শামিল হয়েছিলেন চা শ্রমিকরা। আরও জেদি মনোভাব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ধর্মঘটকে সর্বাত্মক চেহারা দিতে।

এমন মরিয়া জেদ ছিল যে, গত ৬ই আগস্ট উত্তরকন্যায় শ্রম দপ্তরের প্রধান সচিব বৈঠক ভেস্তে দেওয়ার পরপরই নিজেদের মধ্যে কয়েক মিনিটের আলোচনা করে পরদিন অর্থাৎ, ৭ই আগস্ট থেকে ৭২ঘণ্টার চা ধর্মঘটের ডাক দেয় জয়েন্ট ফোরাম। একইসঙ্গে উত্তরকন্যা অভিযানে বাগান থেকে বেরিয়ে পড়ার কথাও ঘোষণা করে দেন ধর্মঘটী ইউনিয়নগুলি।

ওই দিন নিজেরাও টানা প্রায় ৭ঘণ্টা উত্তরকন্যার গেট আটকে ধরনায় বসে পড়েছিলেন জয়েন্ট ফোরামের নেতারাও। নেতারা উত্তরকন্যায় কিন্তু তাতে কোনও সমস্যা হয়নি ধর্মঘটে। বরং ওই দিন বিকাল থেকেই তরাই ও ডুয়ার্সের বাগানে, বাগানে ছড়িয়ে পড়ে পরদিন থেকেই ধর্মঘটের ডাক। ভোর হতেই রাস্তায় নেমে পড়েন চা শ্রমিকরা। রওনা হতে শুরু করেন উত্তরকন্যার পথে।

চা বাগান এখনও বিচ্ছিন্ন জনপদ হিসাবে আছে। কিন্তু ধর্মঘটের বার্তা সেখানে পৌঁছাতে কোনও অসুবিধা না হওয়ার কারণ, ধারবাহিকভাবে চা শ্রমিকদের আন্দোলন। তাই ৬ই আগস্ট উত্তরকন্যায় সভা আছে, ওই সভায় কী আলোচনা হবে তার ভিত্তিতে তাদের কী ভাবতে পারে তার দিকে তাকিয়ে ছিল আসাম সীমান্ত থেকে শুরু করে নেপাল সীমান্তের চা বাগানের শ্রমিকরা। প্রতিদিন দাবি আদায়ের আন্দোলনে পথ হাঁটতে হাঁটতে এখন উত্তরকন্যার বৈঠকের আলোচ্য বিষয় থেকে গেট মিটিং চা শ্রমিকদের কাছে এক সুতোয় বাঁধা।

তাই ধর্মঘটের ডাক আসতেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে চা শ্রমিকরা। একইসঙ্গে বহাল থাকে নিজেদের শৃঙ্খলাবোধ। এবারের চা ধর্মঘটে এটাও একটা নজির। চটজলদি ধর্মঘট, উত্তরকন্যা অভিযানের আন্দোলনে সাড়া দিয়েছে প্রায় ৩৪টি ইউনিয়নের চা শ্রমিক। বিরোধিতাও ছিল। কিন্তু কোথাও শ্রমিকদের মধ্যে ন্যূনতম অশান্তির কোনও ঘটনা ঘটতে দেয়নি নিজেরাই। এমনকি পুলিশ যেখানে পথ আটকেছে সেখানেই বসে বিক্ষোভ দেখিয়েছে শ্রমিকরা। কিন্তু বন্ধ হয়নি সড়ক। লড়াই করার বার্তা পেয়ে ইউনিয়ন ও রাজনৈতিক দলের ঝান্ডা মাথায় না রেখে এভাবে চা শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসাকে অভূতপূর্ব ঘটনা বলে মনে করছেন চা শ্রমিক সংগঠনগুলি।

এবার পাহাড়ে ধর্মঘটের ডাক ছিল না। তবু সেই পাহাড় এবার কাজ বন্ধ করে পথে নেমেছে। ১০কিমি, ১৫কিমি চড়াই-উৎরাই পথ পার করে বাজারে এসে জড়ো হয়েছেন চা শ্রমিকরা। ধর্মঘটী ইউনিয়নের অস্তিত্ব নেই এমন বাগানেও পৌঁছে গেছে ন্যূনতম মজুরির দাবি। পরিস্থিতির ইতিবাচক উপাদান এমনই যে শুক্রবারও পাহাড়ের অনেক বাগানে গেট সভা হয়েছে। সেই সভাতে ন্যূনতম মজুরির দাবিতে সোচ্চার হতে হয়েছে শাসকদল ও গোর্খা জনমুক্তির মোর্চার শ্রমিক সংগঠনকে।

চা শ্রমিকদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া পেয়ে গত বৃহস্পতিবারই সোনাদা বাজারে পাহাড়ে জয়েন্ট ফোরাম নেতারা নিজদের বৈঠক সেরে নেন। ওই বৈঠকে ঠিক হয়েছে, আগামী কয়েক দিন পাহাড়ের সব বাগানে ন্যূনতম মজুরি নিয়ে সভা হবে। সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া ঐক্যবদ্ধ চা শ্রমিকদের দাবির কথা।

৫ই সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে জড়ো হবেন গোটা দেশের শ্রমিক কৃষক, খেতমজুররা। রাজধানীর সমাবেশে কৃষকরা যেমন দাবি তুলবেন ঋণ মকুবের তেমনই শ্রমিকরা চাইবেন ন্যূনতম মজুরির।

তার আগেই এরাজ্যের উত্তরের চা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে চা শ্রমিকদের ৭২ঘণ্টার ধর্মঘটে প্রতিধ্বনিত হলো সেই দাবির কথা।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement