ভূমিহীনদের বাড়ির জন্য গ্রামীণ
এলাকায় মাত্র ২১৬ একর
জমি খুঁজে পায়নি রাজ্য!

নিজস্ব প্রতিনিধি   ২০শে আগস্ট , ২০১৮

কলকাতা, ১৯শে আগস্ট— ভাবাদিঘিতে জমি জোগাড়ে নিদারুণ তৎপর তৃণমূল কংগ্রেস। ‘রেলের জন্য জমি চাই-ই চাই’, তাই সেখানে সি পি আই (এম) নেতার বাড়ি ঘিরে চলছে হামলা। কিন্তু সেই একই দলের সরকার জমি খুঁজে পাচ্ছে না ভূমিহীন পরিবারগুলির ঘর বানানোর প্রয়োজনে।

রাজ্যের গ্রামোন্নয়ন দপ্তরসূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্যের ৩৪,৮৮৪টি পরিবার চিহ্নিত হয়েছিল, যাদের জমি নেই নিজস্ব। তাদের বাড়িও নেই। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার নাম দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বাংলা আবাস যোজনা। সেই প্রকল্পে ওই গরিব গ্রামীণ পরিবারগুলির বাড়ি বানানোর কথা ছিল গত ৩১শে জুলাইয়ের মধ্যে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৬-র এপ্রিলে।

কিন্তু রাজ্যের সরকার জমি পায়নি গত আড়াই বছরে। তাই একটিও ভূমিহীন পরিবারকে বাড়ি বানানোর জন্য সাহায্য করতে পারেনি মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার। কত জমির দরকার ছিল? ২১৬ একরের কম। অর্থাৎ সিঙ্গুরে কারখানার জন্য অধিগৃহীত জমির চার ভাগের এক ভাগেরও কম জমির প্রয়োজন ছিল। সরকার সেই জমি জোগাড় করতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার নিয়ম অনুযায়ী, একেকটি বাড়ি, সংলগ্ন শৌচাগার, স্বাস্থ্যসম্মত রান্নাঘরের জন্য সর্বনিম্ন ২৫ বর্গমিটার জমি লাগবে। তার বেশি হলে অসুবিধা নেই। পশ্চিমবঙ্গে এখনও পর্যন্ত চিহ্নিত প্রায় ৩৫ হাজার ভূমিহীন ও গৃহহীন প্রতিটি পরিবারকে সর্বনিম্ন ২৫ বর্গমিটার জমিতে বাড়ি বানিয়ে দিতে গেলে প্রায় ২১৬ একর জমিরই দরকার হয়। স্বভাবতই এই জমি একলপ্তে দরকার নেই। কারণ, ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলি বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে আছে। সরকার সেই জমিও জোগাড় করতে পারেনি। এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রাজ্যের গ্রামোন্নয়ন সচিব সৌরভ দাস শনিবার কোনও মন্তব্য করতে চাননি।

প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় সমতলের বাসিন্দাদের ১ লক্ষ ২০ হাজার এবং পার্বত্য এলাকার গ্রামবাসীদের ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। সমতলের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ এবং দুর্গম কিংবা পার্বত্য এলাকার জন্য ৯০ ভাগ টাকা কেন্দ্রীয় সরকার দেয়। বাড়ি বানানোর কাজের মজুরি একশো দিনের প্রকল্প থেকে দেওয়া যায়। যিনি বাড়ি পাচ্ছেন, তিনি ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন ব্যাঙ্ক থেকে। গ্রামসভায় আলোচনার মাধ্যমে কে বাড়ির জন্য টাকা পাবেন, তা চিহ্নিত করার কথা। কিন্তু রাজ্যের প্রায় কোনও এলাকাতেই এই পদ্ধতি মেনে চলা হয়নি। অনেক গ্রামে বি ডি ও-রা বিক্ষোভের সামনেও পড়েছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-কর্মীদের বেছে বেছে ঘর পাইয়ে দেওয়া হয়েছে, এমন অভিযোগ অনেক। এই প্রকল্পে বাড়ি বানানোর টাকা পেতে হলে গ্রামবাসীদের নিজের জমি থাকতে হবে। যাঁদের নেই, তাঁরাও পেতে পারেন। তাঁদের জমির ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে। ভূমিহীনরা সিংহভাগই গ্রামের সবচেয়ে গরিব অংশ। কোনও পর্যায়েই তাঁদের নিয়ে সরকার কোনও পরিকল্পনা করেনি।

প্রসঙ্গত, শুক্রবারই গৃহহীনদের মাথায় এক টুকরো ছাদের ব্যবস্থা করা নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টে এক জনস্বার্থবাহী মামলার শুনানি ছিল। তবে তা ছিল মূলত শহরের গৃহহীনদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলা। তাতে জানানো হয়েছিল, গৃহহীনদের জন্য আস্তানা তৈরির কাজে সরকার উদাসীন। এই অভিযোগ শোনার পর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি মদন বি লোকুর মন্তব্য করেন, ‘‘আমাদের বলা হয়েছে, সরকার রয়েছে সরকারের কাজ করার জন্য। আমাদের কিছুই করার নেই। কিন্তু যেখানে সরকারের কাজই হচ্ছে না, সেখানে আমরা কী করব?’’

সুপ্রিম কোর্টে ভর্ৎসিত হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। পশ্চিমবঙ্গের সরকারও যে কেন্দ্রীয় সরকারের পথেই হাঁটছে, গ্রামের গরিবদের বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে সরকারি ভূমিকাই তার প্রমাণ।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement