প্রতারিত হওয়া শহরেই
প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ফিলিপ

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৫ই সেপ্টেম্বর , ২০১৮

কলকাতা, ১৪ই সেপ্টেম্বর — অচেনা শহর। অচেনা মানুষজন। তবু ঘানা থেকে তিনি কলকাতাতে এসেছিলেন। শুধু ফুটবলের টানে। সঙ্গী ঘানার আরেক ফুটবলার রিচার্ড। হাতে তেমন অর্থ নেই। ধার করেই চলে এসেছিলেন এতদূর। ভিসা পেয়েছিলেন দুমাসের। ট্রায়ালের ব্যবস্থা করার জন্য ঘানার এক এজেন্টকে টাকাও দিতে হয়েছিল। কিন্তু কলকাতায় এসে মারাত্মক সমস্যায় পড়েন ফিলিপ আডজা। ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে শিরোনামে উঠে আসেন মহামেডানের এই স্ট্রাইকার। কিন্তু এই কলকাতাতেই তাঁকে প্রতারিত হতে হয়েছিল। গত বছরের শেষে। অন্ধকার ভবিষ্যৎ সঙ্গী করে ঘুরতে হয়েছিল কলকাতার রাস্তায় রাস্তায়। একদিকে দল না পাওয়ার হতাশা। অন্যদিকে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসার আতঙ্ক। দেশে ফেরার টাকাও নেই।

শুরুটা হয়েছিল নভেম্বরে। ঘানায় এক এজেন্ট জানান ফিলিপকে ভারতে ট্রায়ালের ব্যবস্থা করে দেবেন। তারজন্য ১০০০০ টাকা নেন। ২ মাসের জন্য ভারতে আসার ভিসা পান ফিলিপ। আরেক ফুটবলার রিচার্ডের সঙ্গে কলকাতায় আসেন ২০১৭ সালের ১৪ই নভেম্বর। কিন্তু নতুন শহরে থাকবেন কোথায়? খাবেন কি? এরপরই এই শহরের এক জালিয়াত এজেন্টের পাল্লায় পড়েন দুজনে। খেপের মাঠে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁদের। বলা হয়, ‘এই প্রতিযোগিতা দেখতে অনেক কোচ আসে। ভালো খেললে বড় ক্লাবে সুযোগ পাওয়া যাবে।’ খেপ সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। প্রথম দিকে খেপ খেলে যে টাকা পাওয়া যায় তাও জানতেন না। দুই ফুটবলারের খেপের টাকা দিনের পর দিন আত্মস্যাৎ করে সেই এজেন্ট।

অন্যদিকে ফুরিয়ে আসছে ভিসার মেয়াদ। ঘানার এজেন্টের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেও লাভ হচ্ছে না। শেষে জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে মিনার্ভায় ট্রায়ালের ব্যবস্থা হয়। মোহনবাগানের সঙ্গে খেলার জন্য আই লিগ চ্যাম্পিয়ন দল তখন কলকাতায়। কোনোভাবে কোচের নাম্বার পেয়েছিলেন ফিলিপ। আর বলে দেওয়া হয়েছিল, যুবভারতীতে ট্রায়াল। কিন্তু যুবভারতীতে ঢুকতে গিয়ে প্রবল সমস্যায় পড়েন ঘানার দুই ফুটবলার। কোন মাঠে ট্রায়াল তাও জানেন না। যখন অনেক ঘুরে পৌঁছান ততক্ষণে অনুশীলন শেষের পথে মিনার্ভার। ঘানা ফিরে যাওয়ার অর্থও নেই। ভিসারও আর ক’দিন। শেষ পর্যন্ত দেশ থেকে টাকা চেয়ে পাঠান দুজনে। কোনোরকমে মেয়াদ শেষ হওয়ার একদিন আগে ফিরে যান ঘানায়। ‘শেষ দিনগুলো যে কিভাবে কাটিয়েছি। ভিসা ফুরিয়ে আসছিল। আর ফিরে যাওয়ায় ব্যবস্থা করতে পারছিলাম না’ আতঙ্কের দিনগুলো বলছিলেন ফিলিপ।

তারপর আবার ভারতে ফেরার অফার পান এই স্ট্রাইকার। এবার রেনবোর অফার। কিন্তু যে অফারে টাকার পরিমাণ এতোই কম, যে তা দেখিয়ে ওয়ার্কিং ভিসা পাননি ফিলিপ। শেষ অবধি কলকাতায় এক শুভানুধ্যায়ীর সাহায্যে অন্য একটি ক্লাবের অফার দেখিয়ে এক বছরের ওয়ার্কিং ভিসা নিয়ে জুলাইয়ে কলকাতা ফেরেন। যোগাযোগ করেন রেনবোর সঙ্গে। কিন্তু তারা খুব একটা উৎসাহ দেখায়নি। তারপর আবার ফিলিপ ফিরে যান খেপের মাঠে। ‘আমি কখনই খেপ খেলতে চাইনি। কিন্তু বারবার এই শহরে বেঁচে থাকার জন্য আমায় খেপ খেলতে হয়েছে’ জানালেন ফিলিপ। শেষ অবধি মহামেডানের ট্রায়ালে যান। তাঁকে পছন্দ হয় রঘু নন্দীর। প্রথমে বুটের সমস্যায় নজর কাড়তে না পারলেও ইস্টবেঙ্গল ম্যাচে জোড়া গোল করে নায়ক তিনি। ফিলিপের দুরন্ত গতি পালটে দিয়েছিল ম্যাচের রং। ফিলিপের পারফরম্যান্স দেখে তাঁকে দ্বিতীয় ডিভিসন আই লিগেও রেখে দিচ্ছে মহামেডান। যে কলকাতায় প্রতারিত হয়ে ফিরে যেতে হয়েছিল। সেই শহরেই প্রতিষ্ঠা পাওয়ার লড়াই শুরু করেছেন এই ঘানাইয়ান।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement