হরিয়ানায় দলবেঁধে ধর্ষণের শিকার
মেধাবী ছাত্রী, অধরা অভিযুক্তরা

সংবাদসংস্থা   ১৫ই সেপ্টেম্বর , ২০১৮

চণ্ডীগড়, ১৪ই সেপ্টেম্বর— দেশের রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিয়েছিল এক কিশোরী। সেই মেয়েটিই আবার খবরের শিরোনামে! সেবার সে ছিল সি বি এস ই পরীক্ষার স্থানাধিকারী। এবার ধর্ষিতা তরুণী! যদিও হরিয়ানার বছর ১৯-এর ওই ছাত্রীকে দলবেঁধে ধর্ষণ করার পর দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা কেটে গেলেও অভিযুক্তরা বুক ফুলিয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছে। নির্যাতিতা তরুণীর মা শুক্রবার ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন, ‘সরকার সর্বক্ষণ বেটি বাঁচাও-বেটি পড়াও নিয়ে গলা ফাটিয়ে যাচ্ছে। আমরা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা শেখাচ্ছি কী এই পুরস্কার পাওয়ার জন্য? অভিযুক্তরা চোখের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করছে না।’

রেওয়ারির কোসলি এলাকার বাসিন্দা ওই তরুণী কোচিংয়ে যাওয়ার জন্য বুধবার বিকালে বেরোয়। কানিনায় একটি বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়েছিল সে, বিকাল চারটে নাগাদ। সেই সময়ই তিন যুবক তাকে বাসস্ট্যান্ড থেকে টেনে হিঁচড়ে নিজেদের গাড়িতে তুলে পাশের একটি ফাঁকা জায়গায় নিয়ে যায়। তারপর মাদক মেশানো পানীয় খাইয়ে ওই তরুণীকে বেহুঁশ করে দিয়ে শুরু করে বর্বরোচিত অত্যাচার। ঝাজ্জরের কাছে একটি ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। নির্যাতিতা তার জবানবন্দিতে জানিয়েছে, কমপক্ষে ১২জন মিলে তাকে ধর্ষণ করেছে। প্রত্যেকেই তার গ্রামের বাসিন্দা। ফলে প্রশ্ন উঠছে, অভিযুক্তরা পরিকল্পনা করেই কি এই কাজ করেছে? অথচ পুলিশ কার্যত হাত গুটিয়েই বসে থেকেছে। এফ আই আর দায়ের করতেও রাজি হয়নি প্রথমে, এমনই অভিযোগ। নির্যাতিতার পরিজনরা অভিযোগ করেছেন, পুলিশ এলাকার অজুহাত দেখিয়ে অভিযোগ দায়ের করতে চায়নি। থানায় যাওয়া হলে বলা হয়েছে, এই এলাকায় ঘটনা ঘটেনি, তাই অভিযোগ নেওয়া যাবে না। এরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন তরুণীর বাড়ির লোক। কেন্দ্র এবং রাজ্যের বি জে পি সরকারকে তুলোধনা করেছেন তাঁরা। সোচ্চার হয়েছেন, ‘আমরা সঠিক বিচার চাই।’ ক্ষোভের মুখে পড়ে অভিযোগ দায়ের করতে বাধ্য হয়েছে। মহেন্দ্রগড়ের এস পি জানান, অভিযুক্তদের প্রত্যেকেরই বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে। রিওয়ারি থানায় তিন অভিযুক্তের নামে প্রথমে একটি ‘জিরো এফ আই আর’ দায়ের হয়। শুক্রবার সকালে সংশ্লিষ্ট থানায় সেই অভিযোগ স্থানান্তরিত করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তরা ধর্ষণের পর ওই তরুণীকে যে বাসস্ট্যান্ড থেকে অপহরণ করেছিল, সেখানেই ফেলে রেখে যায়। তারপর এক অভিযুক্ত ওই তরুণীর বাড়িতে ফোন করে জানায়, অচৈতন্য অবস্থায় তাঁদের মেয়ে বাসস্ট্যান্ডে পড়ে রয়েছে। সেই ফোন পেয়ে তরুণীর বাবা-মা সেখানে পৌঁছে মেয়েকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে মেডিক্যাল পরীক্ষায় ধর্ষণের প্রমাণ মিলেছে। শুক্রবার রাত পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, নির্যাতিতা তরুণীর চিকিৎসা চলছে। আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেনি সে। নির্যাতিতার আত্মীয়-পরিজনদের কথায়, বরাবরই পড়াশোনা নিয়ে থাকতে পছন্দ করে এই তরুণী। স্কুলেও অত্যন্ত ভালো ফল করত সে।

সংবাদসংস্থা পি টি আই’র খবর অনুযায়ী, হরিয়ানার বি জে পি সরকারকে কটাক্ষ করে কংগ্রেস নেতা রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা বলেছেন, ‘মনোহরলাল খাট্টারের রাজত্বে আরও একজন মেয়েকে ধর্ষণ করা হলো। এন সি আর বি’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এমনিতেই হরিয়ানা মেয়েদের উপর নৃশংস অত্যাচারে শীর্ষেই উঠে গিয়েছে। ‘বি জে পি-র থেকে মেয়েকে বাঁচাও’ এই স্লোগানটি গেরুয়াবাহিনী শাসিত এই রাজ্য বারবার প্রমাণ করছে। মহিলাদের নিরাপত্তায় চূড়ান্ত ব্যর্থতার অভিযোগ উঠলেও তা ঢাকতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থাই নেওয়া হবে।

নরেন্দ্র মোদী নারী নিরাপত্তা নিয়ে বড়বড় বুলি আওড়ালেও বি জে পি রাজত্বে দেশের কোণে কোণে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানির ঘটনা বেড়ে গিয়েছে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের প্রত্যক্ষভাবে প্রশ্রয় দিয়েছে বি জে পি নেতৃত্ব, কখনও পরোক্ষে। হরিয়ানাও ব্যতিক্রম নয়। একাধিকবার মেয়েদের উপর নৃশংস অত্যাচার হলেও সঠিকভাবে কোনও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়নি। সম্প্রতি একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গিয়েছে, ক্রমশ অত্যাচারের সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৪-’১৫ সালে হরিয়ানায় শ্লীলতাহানির সংখ্যা ছিল ১৮৩৩। ২০১৭-’১৮তে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩২০। গত বছর হরিয়ানায় ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের হয়েছিল ১১৯৩টি। এবছর এখনও পর্যন্ত ১৪১৩। প্রতিবছরই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নির্যাতন। তা সত্ত্বেও কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকার নিষ্ক্রিয়। উল্লেখযোগ্যভাবে বিধানসভায় পেশ করা সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ২০১৫ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত মেয়েদের উপর অত্যাচারের সংখ্যাটা ছিল ৮হাজার ১২৬। এবছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেই সংখ্যা দশ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement