মাঝেরহাট ভাঙবে, দুবছর আগেই
জানত রাজ্য পূর্তদপ্তরই দায়ী,
মানলেন মুখ্যমন্ত্রী

মন্ত্রী সরবেন না কেন, উঠল প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৫ই সেপ্টেম্বর , ২০১৮

কলকাতা, ১৪ই সেপ্টেম্বর— মাঝেরহাট সেতু ভেঙে পড়বে, দুবছর আগেই জানত সরকার!

৪ঠা সেপ্টেম্বর হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে মাঝেরহাট সেতু। মুখ্যসচিবকে মাথায় রেখে কমিটি গড়ে নবান্ন। মলয় দে প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দেন মমতা ব্যানার্জির কাছে। সেই রিপোর্ট হাতে নিয়েই এদিন নবান্নে সাংবাদিক সম্মেলন করেন মমতা ব্যানার্জি। মুখ্যসচিবের রিপোর্টে সেতু ভেঙে পড়ার জন্য দায়ী করা হয়েছে পূর্তদপ্তরকেই।

সেতু ভাঙার ১০দিনের মাথায় মুখ্যসচিবের রিপোর্ট জানাচ্ছে, ২০১৬সাল থেকেই সেতুর হাল খারাপের খবর পূর্তদপ্তর জানত। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন,‘পি ডব্লিউ ডি আমাদের দপ্তর হলেও তাদের অবহেলা আমরা ক্ষমা করব না। ২০১৬সাল থেকেই জানতে পারল সেতুর হাল। যখন দেখছি, ব্রিজটা এমন কন্ডিশান হয়ে আসছে, তখন আস্তে গাড়ি চালানো বা কিছু একটা করা উচিত ছিল। তা সত্ত্বেও সেতুর জন্য আগাম কোনও সতর্কতা নেয়নি দপ্তর।’

সরকারের প্রাথমিক রিপোর্ট গেছে পূর্তদপ্তরের বিরুদ্ধেই। মুখ্যসচিবের রিপোর্টের ভিত্তিতেও মমতা ব্যানার্জি এদিন জানিয়েছেন,‘পূর্তদপ্তর তাদের দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে না।’ ভাঙার দায় যদি দপ্তর অস্বীকার করতে না পারে, তাহলে দপ্তরের মন্ত্রীর দায় থাকবে না কেন? উঠেছে সঙ্গত প্রশ্ন।

মাঝেরহাট সেতু ভাঙার দায় পূর্তদপ্তরের। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগে কাঠগড়ায় দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ার ও আধিকারিকরা। তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রসঙ্গে মমতা ব্যানার্জি বলেছেন,‘ আইনের পথে সরকার ব্যবস্থা নেবে। কাউকে রেয়াত করা হবে না।’

সাংবাদিক বৈঠকের পরই মমতা ব্যানার্জি ১৪তলার কনফারেন্স রুম থেকে নিজের ঘরে চলে যান। সাংবাদিকরা তখনও হল ছাড়েননি। তার মধ্যেই ফের ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন মুখ্যমন্ত্রী। উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান,‘ পূর্ত মন্ত্রীর কাছে কোনও ফাইল পাঠানো হতো না।’

সাংবাদিক সম্মেলন শেষ হওয়ার পর কেন মুখ্যমন্ত্রী উপযাচক হয়ে পূর্তমন্ত্রীর কথা জানাতে এলেন, এই প্রশ্ন উঠছে। সরকার শুধু ইঞ্জিনিয়ার, আধিকারিকদের কাঠগড়ায় তুলে পূর্তমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে বাঁচাতে চাইছে। সরকারের প্রাথমিক রিপোর্টেই সেতু ভাঙার জন্য পূর্তদপ্তরকেই দায়ী করা হয়েছে। যেখানে খোদ মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, ‘পূর্তদপ্তর আমাদের দপ্তর হলেও তাদের নেগলিজেন্স আমরা ক্ষমা করব না’, সেখানে প্রশ্ন উঠেছে কেন পূর্তমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস পদত্যাগ করবেন না?

মাঝেরহাট সেতু ভাঙার ঘটনায় সিট তৈরি করে কলকাতা পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। অরূপ বিশ্বাস নিয়ে সাংবাদিক বৈঠকে একটি কথা খরচ না করলেও পুলিশের তদন্ত প্রসঙ্গে এদিন মুখ খোলেন মমতা ব্যানার্জি। ‘ সরকারের একটা সিস্টেম আছে। পুলিশ তদন্ত করছে। তাদের আগে তদন্ত করে নাম খুঁজে বার করুক। আমরা সব ফাইল সিজ করেছি।’ নবান্ন সূত্রের খবর, পূর্তদপ্তরের আলিপুর ডিভিসনের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার-২, অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার, সুপারিন্টন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার ও চিফ ইঞ্জিনিয়ারসহ অর্থদপ্তরের বেশ কিছু আধিকারিকের ঘাড়ে মাঝেরহাট সেতু ভাঙার দায় পড়তে চলেছে।

সেতু মেরামতের ফাইল চালাচালি করতে গিয়ে সময় নষ্টের কথা বলা হয়েছে মুখ্যসচিবের রিপোর্টে। সেই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান,‘সময় নষ্ট না করে তাদের উচিত ছিল সতর্কতামূলক কিছু ব্যবস্থা নেওয়া।’ প্রশ্ন উঠেছে, মন্ত্রীর উপস্থিতিতে পূর্তদপ্তরের পর্যালোচনা বৈঠকে তাহলে কী হয়? খোদ কলকাতা শহরের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে এমন একটি সেতুর মেরামতির ফাইল পূর্তদপ্তর থেকে অর্থদপ্তরে মাসের পর মাস পড়ে ছিল কীভাবে? পূর্তমন্ত্রী কী করছিলেন? অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে কেন ফাইলের জট ছাড়ানোর উদ্যোগ নিলেন না? এমনকি ঘটা করে টাউন হলে, কখনও আবার নবান্ন সভাঘরে সব দপ্তরের মন্ত্রী ও প্রধানসচিব, যুগ্মসচিব পর্যায়ের আধিকারিকদের ডেকে এনে প্রশাসনিক পর্যালোচনা বৈঠকের কার্যকারিতা নিয়েও এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সেতু ভাঙার প্রাথমিক দায়ে পূর্তদপ্তরকে দোষী সাব্যস্ত করে মুখ্যসচিব তাঁর রিপোর্টে সরকারের কাছে আরও একটি প্রস্তাব রেখেছেন। তা হলো, অংশত ভেঙে পড়া মাঝেরহাট সেতুকে পুরোপুরিভাবে ভেঙে দেওয়ার। এই সেতু ভেঙে নতুন একটি সেতু তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। নয়া সেতু তৈরির জন্য এদিন মমতা ব্যানার্জি এক বছর সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। নয়া সেতু গড়ার দায়িত্বেও থাকবেন মুখ্যসচিব।

সরকারের এই সিদ্ধান্তে বেহালাবাসীসহ গোটা দক্ষিণ ২৪পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের পথের যন্ত্রণা কমার কোনও লক্ষণ নেই। মাঝেরহাট রেলপথের ওপর দিয়ে একটা রাস্তার মাধ্যমে ছোট গাড়ি চলাচলের জন্য রেল প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করেছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন,‘আমি পূর্ব রেলের জি এম-কে ফোন করেছিলাম। মুখ্যসচিব ৩দিন ধরে কথা বলছেন। আমরা রেলের কাছে অনুরোধ করেছি, একটা লেভেল ক্রসিং তৈরি করে দেওয়ার জন্য। লেভেল ক্রসিং নির্মাণ ও ওখানে কর্মরত যিনি থাকবেন তাঁর বেতনের টাকা রাজ্য সরকার দেবে।’ যৌথভাবে মাঝেরহাট সেতু এলাকার ওই রাস্তা এদিনই সমীক্ষার কাজ করেছে রেল ও রাজ্য প্রশাসন।

কোনও তদন্তের আগেই মাঝেরহাটে এসে সেতু ভাঙার জন্য মেট্রো রেলকে দায়ী করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সুতরাং মুখ্যসচিবের রিপোর্ট সেই প্রসঙ্গ এড়াতে পারেনি। মেট্রোর কাজকেও দায়ী করা হয়েছে রিপোর্টে। তবে এদিন সুর নরম করে মেট্রো প্রসঙ্গে মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, ‘মেট্রো রেলের যে কম্পন হয়েছে, পিলারের কাজ হয়েছে তাতেও কিছুটা সেতুর ওপর চাপ পড়েছে। মুখ্যসচিবের রিপোর্টে তেমনই সন্দেহ করা হয়েছে। সেটা আরও তদন্ত করে দেখা হবে।’

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement